২২ জুলাই ২০১২, সোমবার, ০৭:২৬:৪২ অপরাহ্ন


বিএনপির নতুন কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগে টেনশন
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০৭-২০২৪
বিএনপির নতুন কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগে টেনশন


বিএনপির মুখে আন্দোলনের কথা শুনেই দুশ্চিন্তায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিএনপি যে খুব বড় এক আন্দোলনের কথা বলছে তা কিন্তু নয়। দলটি জানাচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যাবে। যা প্রথমত পল্টন থেকে শুরু হয়ে জেলা পর্যায়েও। গত শনিবার ২৯ জুন সমাবেশ করে বিএনপি। যাতে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে বিএনপিপন্থি পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরাও এতে অংশ নেয়। ওই দিন ছাড়া ১ জুলাই ঢাকা ছাড়া সব মহানগর ও ৩ জুলাই জেলায়ও সমাবেশের কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়। এবং সভাও অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রতীক, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক নিরবচ্ছিন্ন অঙ্গীকারাবদ্ধ নেত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে এই সমাবেশ। পল্টনের ওই সমাবেশে ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি ঘটে। মহানগর ও জেলা পর্যায়েও আশানুরুপ মানুষ সমাগম হয়। 

আওয়ামী লীগে টেনশন 

বিএনপির এ সমাবেশ মোটেও ভাল চোখে দেখছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সহ বিরোধী দল কার্যত ঘরবন্দি। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে যে বিএনপি ও বিরোধী দল মাঠে নামার উপলক্ষ্য করছে সেটা তাদের বুঝতে বাকি নেই। মাঠের কর্মসূচিগুলো এমনই হয়। একটা সফল হলে অন্য আরেকটির প্রস্তুতি চলে। বিগত সময়ে (দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন) বিএনপি মাঠে নেমেছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সূত্র ধরে। একের পর এক সমাবেশে মানুষের ঢল নামে। একই সঙ্গে পুলিশি বাধা গুলি, নিহত হওয়ার ঘটনার মধ্যদিয়ে ক্রমশ বড় আন্দোলনে রূপ নেয় সেটা। এবারও তেমন কিছু যাতে না যায় সে জন্য ক্ষমতাসীনরা টেনশনে। যেহেতু ইস্যুটা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে। তাই আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা এ ব্যাপারে বক্তব্য দিচ্ছেন। 

এডভোকেট কামরুল ইসলাম 

বিএনপির খালেদা জিয়ার মুক্তির কর্মসূচিদানের পর ২৭ জুন প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে সাবেক আইনপ্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায় হয়েছে কত সালে, কিন্তু এখনো তারা (বিএনপি) আন্দোলন করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পারেনি। এটা হচ্ছে তাদের একটা ভেলকিবাজি, মিথ্যা, ধোঁকা। তারা খালেদা জিয়াকে জেলখানায় রেখে তারেক রহমানকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। খালেদা জিয়াকে তারা মুক্ত করতে চায় না। তার মুক্তি সম্ভব একমাত্র আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু তারা (বিএনপি) আদালতে যায় না।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ঢাকা সমাবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, আজকে তিনি (খালেদা জিয়া) প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় বাসায় বসবাস করছেন মুক্ত মানুষ হিসেবে। চিকিৎসা পাচ্ছেন, নেতাকর্মীরা দেখা করতে পারছেন। সবই করতে পারছেন। কিন্তু তারা (বিএনপি) খালেদা জিয়াকে আবার মুক্ত মানুষ হিসেবে রাজনীতিতে আনতে কোনো আইনি লড়াই করে না, করার মতো কোনো মানসিকতাও তাদের নেই। কারণ তারা চায়, তারেককে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে। এ কারণেই তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি চায় না। এখনো তারা বলে যে আন্দোলন করবে। আন্দোলন করে তারা কী করবে? কোনো লাভ নেই। আইনি লড়াই ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি কোনো অবস্থাতেই সম্ভব না। 

ওবায়দুল কাদের 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির মুক্তভাবে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের কোনো নজির নেই। কিন্তু বিএনপি গত কয়েক বছর ধরে আইনগত পদ্ধতি ছাড়াই খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি করছে। এমনকি খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গুজব ছড়িয়ে জনগণকে উসকানি দিচ্ছে এবং আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে জনগণের কাছ থেকে করুণা আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে।

রোববার (৩০ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিবৃতিতে এসব কথা বলেন তিনি। ওবায়দুল কাদের বলেন, আন্দোলনের নামে বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি জনগণ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দলটি একটি ব্যর্থ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। এখন তাদের তথাকথিত আন্দোলনের বিষয় দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত অসুস্থ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়ার পরও শেখ হাসিনা তাকে নিজ বাসায় থেকে দেশের সর্বাধুনিক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছেন। সেখানে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, সংবিধান অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি। সংবিধান ও আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামির মুক্তি দাবি ধৃষ্টতা ছাড়া কিছু নয়। আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কোনো সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির দেশত্যাগের কোনো বিধান নেই। মানবিক কারণে শেখ হাসিনা নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে সাজা স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছেন। 

বিএনপি আন্দোলন না আইনী পথে লড়বে 

বিএনপিকে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে যে আইনি লড়াইয়ের জন্য উচ্চ আদালতে যাবার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে এটাতে কী বিএনপির নীতি নির্ধারকের মন গলবে? এ প্রশ্ন এখন সর্বত্র। কারন আদালতে বহুবার যেয়েও খালেদা জিয়ার মুক্তির সুরাহা হয়নি। বরং খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারের কাছে বারবার ধর্না দিয়েও ব্যর্থ হয়েছে খালেদা জিয়ার পরিবার ও বিএনপি। এ ব্যাপারেও আইনমন্ত্রীসহ সংশিলিষ্টতে চালাকি দেখেছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবণতিতে যখন প্রচন্ডভাবে বিদেশে নেয়ার দাবি ওঠে তখন ওই ইস্যু দুর্বল করতে আইন মন্ত্রণালয়ের আশ্রয়ের কথা বলা হয়। বিএনপিও উপায়ন্ত না দেখে সেটা করে। কিন্ত ফাইল এক স্থান স্বরাষ্ট্র বা অন্যান্য থেকে অন্যস্থানে ঘুরতে ঘুরতে যখন বিষয়টা দুর্বল হয়ে যায় ঠিক তখন আইনমন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয় এটা সম্ভব না। তখন বিএনপি বুঝতে পারে যে এসব নির্দেশনা বা পরামর্শ শুধু কালক্ষেপণ ও পরিস্থিতি ঠান্ডা করে দেয়ার জন্যই। 

গত শনিবার (২৯ জুন) ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেন, বিএনপি এ বিষয়ে (খালেদা জিয়ার মুক্তি) আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, উচ্চ আদালতে না গিয়ে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এর জবাবে সোমবার জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘সরকার কী পরামর্শ দেবে। আমি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছি। এটা আইনজীবীদের বৃহৎ একটি সংগঠন। আমাকে এটার সভাপতি করা হয়েছে। বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সঙ্গে কোনও মিল নেই।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১)-এর ধারার ক্ষমতাবলে শর্তযুক্তভাবে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত রেখে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ফলে খালেদা জিয়াকে আগে যে শর্তযুক্ত মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, সেটি বাতিল করতে হবে। বাতিল করে স্ব-অবস্থানে (আগের অবস্থায়) যাওয়ার পর আবার অন্য বিবেচনা করা যাবে।’

আওয়ামী লীগে উদ্বেগ 

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনেক কর্মসূচি থাকলেও বঙ্গবন্ধু এ্যাভিউনিউতে কোনো কর্মসূচি ছিল না। কিন্তু বিএনপির পল্টনে সমাবেশ কর্মসূচির পর অনেকটা হঠাৎ করেই ৭৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ একই দিন (শনিবার) বিকালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আলোচনা সভা করবে বলে ঘোষণা করে, এবং করেও। মহানগর আওয়ামী লীগ (দক্ষিন) আগের দিন (২৮ জুন বিকেলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়) জানান দেয় এমন আলোচনা সভার কথা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এতে প্রধান অতিথি বক্তব্য দেন। সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ওই আলোচনা সভায় বলেন, লন্ডনে বসে কর্মসূচি দেয় মেইড ইন লন্ডন। নতুন নেতৃত্ব পাঠায় ফরমান আকারে। লন্ডনে বসে নেতা বানায়। এই মেইড ইন লন্ডন কর্মসূচি মানে কী? খেলা কিন্তু হবে, ছেড়ে দেওয়া হবে না। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা বলেছিলাম বছরব্যাপী উদযাপন (প্লাটিনাম জুবিলি) করব। সেখানে খবর হয় আমরা নাকি পাল্টাপাল্টি করছি। গতকাল (২৮ জুন) আমরা সাইকেল র‌্যালি করেছি, বিএনপির কি কিছু ছিল? তাহলে কেন এই অপবাদ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দিচ্ছেন? আমরা সারা বছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করব। আমাদের কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালন করা হবে। আগস্ট মাসের পরে জেলা পর্যায়ে সমাবেশ হবে। সে সমাবেশে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখবেন।

শেয়ার করুন