০৮ জুন ২০২৬, সোমবার, ০৪:৬:৩৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
মাত্র এক ডোজেই কমতে পারে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত খারাপ কোলেস্টেরল নিউ ইয়র্কের ফোনমুক্ত স্কুলে কমেছে বুলিং আরবি ভাষা ও শিক্ষা যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হচ্ছে গ্রিনকার্ডের আবেদন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অপব্যাখ্যার পর পুনঃব্যাখ্যা, মামলার প্রস্তুতি বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে আবারো বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ভিসা : দুইবারের বেশি দূতাবাসে যেতে হবে না অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বড়রা এ প্রজন্মকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে খালেদা জিয়ার নামে নামকরণ : তারেক রহমানের ‘না’ সাক্ষাৎকার ছাড়াই দ্রুত আশ্রয় আবেদন বাতিলের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের


দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
জাপানি পরিবারে ডিনার
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৪-০২-২০২৬
জাপানি পরিবারে ডিনার কোয়োটোর সোনার মন্দিরের সামনে ও টোকিওর নাকামিসে স্ট্রিটে লেখক


টোকিওতে আজকের এই রাতটা যেন অন্য সব দিনের থেকে আলাদা। অদ্ভুত মায়াময়, রোমাঞ্চ, উষ্ণ। আমার জাপানি ট্যুর গাইড নিকিতা আমাকে তার বাসায় ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। গিয়ে বুঝলাম জাপান ভ্রমণের সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া অধ্যায়টা তখনো বাকি ছিল। সেখানে না গেলে আমার জাপান ভ্রমণটা অপূর্ণ থেকে যেতো। গাড়ি থামতেই দেখি বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছে নিকিতার পুরো পরিবার-বাবা, মা, ছোট ভাই-বোনেরা। অবাক হলাম। স্বল্প সময়ের পরিচয়, কিন্তু তারা যে আমাকে এত উষ্ণভাবে গ্রহণ করবে তা ভাবিনি। দরজা খুলে ভিতরে ঢ়ুকতেই উষ্ণ আলো আর ছোট্ট জাপানি ঘরের নিস্তব্ধতা আমাকে ঘিরে ধরলো। 

নিকিতা গলা উঁচু করে বললো- Welcome to my home… tonight, you are my family. আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। টাটামির নরম ঘ্রাণ, কাঠের দেয়ালে ঝুলে থাকা পরিবারের পুরোনো ছবি, আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সুস্বাদু খাবারের গন্ধ-সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিল এক কথায় অপূর্ব।

নিকিতা এপ্রোণ পরা অবস্থায় হেসে বললো, Tonight… I cook for you. ট্রেডিশনাল ইমাবাড়ি স্টাইলের খাবার আমি তোমার জন‍্য রান্না করবো।

রান্নাঘরে নিকিতা যখন ব্যস্ত, আমি তাকে তাকিয়ে দেখছিলাম। রান্না করতে করতে মাঝে মাঝে চুল ঠিক করা, গাল লাল হয়ে যাওয়া, হঠাৎ আমাকে তাকিয়ে দেখা-সব মিলিয়ে সে যেন অন্য এক রূপে ফুটে উঠছিল।

খাবার সাজানো হলো নিচু কাঠের টেবিলে-শোয়ু রামেন, তেরিয়াকি চিকেন, ঘরে তৈরি গিয়োজা, আর তার হাতে বানানো ম্যাচা ডেজার্ট। নিকিতার বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই এসে টেবিলে বসলেন। খাবারের স্বাদের চেয়েও বেশি আমাকে ছুঁয়ে গেল নিকিতা ও তার পরিবারের যত্ন, তাদের মমতা, আর তাদের নিখাদ ভালোবাসা।

খেতে খেতে নিকিতা তার পরিবারের দিকে তাকিয়ে বললো- You travelled almost whole Japan… But tonight, you see my Japan… my small world. -আমি হাসলাম। নিকিতার পরিবার আমাকে যে উষ্ণতায় গ্রহণ করলো-তা এতটাই নিখাদ, এতটাই আন্তরিক, যেন আমি তাদের পরিবারের পুরোনো কোনো আত্মীয়। তার মা চা বানিয়ে আনলেন। বাবা জিজ্ঞেস করলেন জাপানের কোন অংশ আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। ছোট ভাই-বোনেরা আমার কাছে নিউইয়র্কের গল্প শুনতে চাইলো। এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোতেই বুঝলাম, ভালোবাসা সবসময় রোমান্টিক হতে হয় না।

নিকিতার বাবা-মা ছোট ভাইবোনরা এসে আমাদের সঙ্গে বসল। তাদের চোখে, হাসিতে, ছোট ছোট আচরণে যে উষ্ণতা-তা কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মন ছুঁয়ে গেল। বাবা মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, তুমি আজ আমাদের অতিথি, কিন্তু মনে রাখবে-তুমি আমাদের পরিবারেরই অংশ।

নিকিতার মা চায়ের কাপ হাতে দিয়ে বললেন, জাপান এমন জায়গা, যেখানে মানুষ অল্পদিনের পরিচয়েও হৃদয়ের দরজা খুলতে জানে। আমি অভিভূত হলাম। বুঝলাম-এই ছোট্ট মুহূর্তেই আমি পেয়েছি অপরিচিত মানুষের নিখাদ ভালোবাসা, যা সময় বা দূরত্বের বাঁধা মানে না।

খাবার টেবিলে বসে নিকিতার বাবা- মার সঙ্গে অনেক গল্প করছিলাম। হঠাৎ করেই নিকিতার বাবা টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়ে আলমারি থেকে একটি ছোট কাঠের বাক্স বের করে আনলেন। বাক্সটা আমার হাতে তুলে দিয়ে তিনি মৃদু হাসলেন-সেই হাসিতে ছিল জাপানের পুরোনো প্রথা, পরিবারের সৌজন্য, আর অচেনা একজন ভ্রমণকারীর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা।

আমি বাক্সটা খুলতেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। অভ্যন্তরে ছিল এক সূক্ষ্ম জাপানি শিল্পকর্ম-হাতে তৈরি এক ক্ষুদ্র কোকেশি পুতুল, পাশে লেখা ছোট্ট বার্তা- For the traveler who became family. আমি খুব অভিভূত হয়ে গেলাম। এই মানুষগুলো-যাদের আমি চিনি মাত্র কয়েক ঘণ্টা-তারা এমন এক আন্তরিকতা দিয়ে আমাকে ঘিরে রাখল, যা পৃথিবীর কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। অচেনা শহর, অচেনা পরিবার, তাদের ঘরের উষ্ণ আলোতে আমি যেন এক আশ্চর্য সত্য অনুভব করলাম আর তা হলো ভালোবাসা সময় চায় না, সম্পর্ক দীর্ঘ পরিচয় চায় না। কখনো কখনো অপরিচিত মানুষই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আপন, জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়।

নিকিতার বাবা-মায়ের চোখে আমি দেখেছিলাম অশেষ শুভ কামনা, তার ভাইবোনদের হাসিতে ছিল নির্ভেজাল আনন্দ। আর সেই উপহারের ভেতর লুকিয়ে ছিল-তাদের পরিবারের অমূল্য স্নেহ, আর এক ধরনের নিঃশব্দ আশীর্বাদ। আমি বাক্সটা বুকে চেপে ধরলাম। মনে হচ্ছিলো এই উপহার শুধু কাঠের পুতুল নয়, এ যেন জাপানের মাটির উপহার, নিকিতার পরিবারের হৃদয়ের অংশ, যা কোনোদিন ভুলে থাকার নয়। স্বল্প সময়ের পরিচয়ে এতটা ভালোবাসা-এটা শুধু মহানুভবতা নয়, বরং সেই অদৃশ্য মানবিক বন্ধন, যা পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

আমার বিদায়ের সময় হলো। বাইরে নীরব টোকিও, জানালায় ঝুলে থাকা শহরের আলো। আমি নিকিতার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। সে অনুচ্চ কণ্ঠে বললো, গত চারটি সপ্তাহ তোমার সঙ্গে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কাটালাম।

আমি নরম স্বরে উত্তর দিলাম-তোমার পরিবার, তোমার ঘর, আর তুমি-সবই আমাকে এমন এক অনুভূতি দিল, যা আমি কোনোদিন ভুলব না। সেদিন রাতের সেই উষ্ণ ভালোবাসার নিমন্ত্রণ, খাবারের গন্ধ, নিকিতার লাজুক হাসি, জানালার আলো-সব মিলিয়ে যে ভালোবাসা আমাকে ঘিরে ধরেছিল, তা ছিল নিখাদ, গভীর, আর অবিস্মরণীয়।

জাপান আমাকে ইতিহাস দেখিয়েছে, প্রকৃতি দেখিয়েছে, শহর দেখিয়েছে, কিন্তু নিকিতা আমাকে দেখিয়েছে মানুষের হৃদয়। তার পরিবার আমাকে দেখিয়েছে ভালোবাসার উষ্ণতা যা কোনোদিন ভোলার নয়।

টোকিওর নাকামিসে স্ট্রিট

আসাকুসার বিখ্যাত সেনসো-জি মন্দিরের প্রবেশদ্বার ‘কামিনারিমন’ (Kaminari-mon) থেকে শুরু হয়ে মন্দিরের মূল প্রাঙ্গণ পর্যন্ত বিস্তৃত ২৫০ মিটারের রাস্তাটির নাম-নাকামিসে। এটি জাপানের অন্যতম প্রাচীন শপিং স্ট্রিট।

বিস্তারিত দেখুন ই-পেপারে...

https://deshusa.com/m/48203/6983461c7c762

শেয়ার করুন