২২ জুন ২০১২, শনিবার, ০২:২৭:০৯ অপরাহ্ন


আমেরিকার বাসের শুরুর কাল
ইশতিয়াক রুপু
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৮-০৭-২০২২
আমেরিকার বাসের শুরুর কাল



২০১০ সালের শেষ দিকে। নিউইয়র্কের চাকুরীর বাজারে স্মরণকালের মন্দা। অনেক খোঁজাখুজির পর এক স্বজনের সহায়তায় নিরাপত্তা কর্মীর কাজ পেলাম। দুনিয়া খ্যাত ক্লাব কাম রেষ্টুরেন্ট চিপরিয়ানীতে। নিউইয়র্কে ওদের দুটো শাখা। একটি গ্রান্ড সেন্ট্রাল রেল স্টেশনের উল্টোদিকে। অন্যটি ডাউন টাউনের বিখ্যাত ৪৪, ওয়াল স্ট্রিটে। কাজে যোগ দেবার পূর্বে সপ্তাহব্যাপী ট্রেনিং কোর্স যা ওরিয়েন্টশন কোর্স বলে সবাই জানে। তা শেষ করতে হয়। যেখানে অভিজ্ঞ একজন প্রশিক্ষক নতুন নিয়েগপ্রাপ্ত ও  দায়িত্ব নিতে যাওয়া কর্মীদের তৈরী করে দেন। স্বল্প সময় নিরাপত্তা কর্মীর কাজ করবার সুবাধে অনেকেই নিজের অথবা স্বজনদের জন্য কাজ পাওয়া সম্পর্কিত তথ্য জানতে চান। যা এই নগরীর সামাজিক সম্পর্কের একটি চলমান চর্চা। বিশেষ করে নুতন আসা অভিবাসীদের জন্য সত্যি তা সহায়ক। তবে বিরক্তিকর বিষয় অন্য স্থানে। খোঁজ নেয়া কুঁজো বুদ্ধিজীবী বা দেশে ব্যাঙ্কের টাকা মেরে আসা অভিবাসীদের খোঁজ নেবার রকম দেখে মনে হয় ছুটে গিয়ে ওদের দুটো কথা বলে আসি।ওরা মনে করে আমেরিকায় কর্মরত নিরাপত্তা কর্মীরা দেশের বাসা বাড়িতে কর্মরত দারোয়ান বা পাড়া পাহারা দেয়া প্রহরীর মত। যদিও কাজের মুল দায়িত্ব সমান তবে কিছু বিষয়ে বিরাট পার্থক্য আছে তা মনে রাখতে হবে। আমেরিকায় নিরাপত্তা কর্মী হিসাবে ভালো জব পেতে হলে এদেশে বাসকালীন সময় আপনার সকল কর্মকান্ড থাকতে হবে ক্রিষ্টাল ক্লিয়ার। ছোট বড় কোন অপরাধে জড়িত থাকার প্রমান পেলে জীবনে কিয়ামত নেমে আসবে। ভাল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ চাইলে সংক্ষিপ্ত কয়টি কোর্সও করতে হয় এবং সনদ দেখাতে হয়।তবে ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কালে নিয়ম কানুন কিছুটা শিথিল থাকে।নিউইয়র্ক নগরীর আইকন বলে পরিচিত ক্লাব কাম রেষ্টুরেন্ট চিপরিয়ানীতে কাজের আহ্বান পেয়ে সকল নিয়ম কানুন মেনে কাজে যোগদান করতে সময় লেগেছে ৩০ দিনের বেশি।কাজে শারিরীক অংশ গ্রহন না থাকলেও মানসিক দৃঢ়তা ও চারদিকে নজর রাখতে হয় মনোযোগ দিয়ে। প্রতিদিন কাজে যোগদানের কমপক্ষে এক ঘন্টা পূর্বে ক্লাবের বেইজমেন্টে রিপোর্ট করতে হতো।প্রথমে আই ডি টেষ্ট করতো দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারভাইজার। এর পর চলতো ড্রেস পরীক্ষা। তবে আমেরিকা বা বিদেশের কোন বিশেষ ভি আই পি ব্যাক্তিত্ব কেউ অংশগ্রহন করলে আই ডি টেষ্ট করতেন এফ বি আই এর চৌকশ ও কালো চশমা পরিহিত কর্মকর্তারা। প্রশ্ন করতেন বিবিধ বিষয় নিয়ে।যেমন আমেরিকায় এসে প্রথম কোন ঠিকানায় উঠেছিলাম।তবে তা সবার জন্য নিয়মিত ছিলো না। আমার বেলা সব সময় ব্যাতিক্রমি এক্যশন। সারিবদ্ধ দাঁড়ানো আনুমানিক ১০/১২ জন সিকিউরিটি অফিসারদের সামনে স্মার্টলি দাড়িয়ে এফ বি আই অফিসার নাম ডেকে যেতেন। যেমন জন, লুইস, নিকোলাস নামের সবাইকে ডেকে হাতে ধরা আই প্যাডে চোখ বুলিয়ে চিবানো স্বরে উচ্চারন *গো। আমার সামনে আসা মাত্র খেয়াল করতাম কারো কারো চোয়াল শক্ত হয়ে যেতো। প্রশ্ন ছুড়ে দিতো ঘধসব চষবধংব! উত্তরে ইশতিয়াক আহমদ বলা মাত্র পরের বাক্য ছিলো  Come Forward please .পরের প্রশ্ন একেক বার একেক রকম। আমেরিকায় প্রথম চাকুরী কোথায়?  ক্রাইম করেছি কিনা! তারপর কমপক্ষে মিনিট দুই চশমার ভিতর থেকে তাকিয়ে একসময় কাঙ্খিত শব্দ কানে আসতো *গো। বাস্তব একটি  ঘটনা বলি। ভ্যানিলা আইস আমেরিকার জনপ্রিয় একজন জধঢ়ঢ়বৎ.যার আসল নাম রবার্ট ভ্যান মেথ্যু উইংকল। দুনিয়া কাপানো গায়ক ভ্যানিলা আইসের ক্রিসমাস প্রোগ্রাম। বিকালে শুরু হবে। আমরা রিপোর্ট করলাম দুপুরে লাঞ্চের পর। সুপারভাইজার আমাকে পছন্দ করতো। অন্যরা লুকিয়ে লুকিয়ে টেলিফোন করতো, অন্যের সঙ্গে কথা বলতো সহ আরো কত অনিয়ম। আমি সারাক্ষন অন্যান্য দেশি কর্মচারীদের ন্যায় বরখাস্তের ভয়ে স্টান্ডবাই থাকতাম। আদেশ নিষেধ মানতাম বিনয়ের সঙ্গে। বস দায়িত্ব দিলেন মঞ্চের পাশে দাড়াতে।

কাজ হলো  অনুমতিপ্রাপ্ত ছাড়া কেউ যেনো এদিকে না আসে। সেদিকে চোখ রাখতে। হঠাৎ দেখি পুরা মাথা সেইভ করা চক চকে টাক মাথা পরনে ক্যাজুয়াল পোষাক পরা এক আমেরিকান মঞ্চের পিছনে দাড়িয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেন দেখছেন। আমি ধীরে ধীরে উনার পাশে দাড়িয়ে আরো গম্ভীর স্বরে বললাম, জ্যান্টলম্যান আপনি এখানে দাড়াতে পারবেন না! উনি জানতে চাইলেন কেনো? উত্তরে একটু ভাব নিয়ে বললাম, আমার দায়িত্ব এই মঞ্চ এবং আজ রাতে এই মঞ্চে যিনি গান গাইবেন সেই শিল্পীর নিরাপত্তার দেখভাল করা। মুচকি হেসে আমাকে উল্টো প্রশ্ন, ইয়াং ম্যান তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছে? আমি বলালাম, না তো। ঠিক তখন সুপারভাইজার নিক ছুটে এলো একরকম দৌড়তে দৌড়তে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে, আহমদ তুমি কি দুনিয়া খ্যাত শিল্পী ভ্যানিলা আইসের নিকট অটোগ্রাফ চাইছো। এটি কিন্তু নিয়ম বিরুদ্ধ। আমি চাকুরী হারানোর ভয়ে দুহাত উপরে তুলে জোরে জোরে না না করে বলছি, নিক সরি আমি তো উনাকে চিনতেই পারি নি। আমি ভীষন দুঃখিত,আমি ভীষন দুঃখিত।

নগরীতে অনেক এশিয়ান অভিবাসীরা কর্পোরেট বা বড় বড় রাজনৈতিক নেতার নিজস্ব গাড়ি বহরে চালকের কাজ করেন। যারা কোন অবস্থায় বিশাল বিশাল কোম্পানীর কর্মকর্তাদের আদেশ নির্দেশ সরাসরি শুনেন না বা শুনার সুযোগ ও নেই। কমপক্ষে এক সপ্তাহ পূর্বে কোম্পানির এইচ আর বিভাগ থেকে কাজের শিডিউল বা সময়সূচী চালকের মেইলে চলে আসে। তাদের দেয়া সময় তালিকা দেখে কর্তব্য পালন করতে হয়। দেশের ন্যায় অফিসের গাড়ি দিয়ে ছেলে বা মেয়েকে স্কুল থেকে আনা কিম্বা বেগম সাহেবা কে নিয়ে কাঁচা বাজার করতে কাওরান বাজার যেতে হয় না। আর অফিসের গাড়ি দিয়ে বিদেশ থেকে আসা শালী  ও ভায়রা ভাইকে পাশের জেলাতে পাঠাতে কর্পোরেশন কর্মচারী চালক কে হুকুম দেয়া যায় না। এতো সবের পরও নাক উঁচু ও কুঁজো বুদ্ধিজীবীর দল এমনকি দেশের তৃতীয় শ্রেণীর বিশ্ববিদ্যালয পাশ সন্তানদের মা ও বাবাদের ধারনা যারা এসব জব করে তারা কুলীন কিম্বা সোসাইটির আপ টাইপের কেউ না। অথচ সরকার কে ঠকিয়ে মিলিয়ন ডলার এনে বুক ফুলিয়ে ভি আই পি পদ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় তাদের সঙ্গে সেল্ফি তুলে কত শান্তি। মনে হবে এই মাত্র জান্নাতুল ফেরদৌসে ঢুকার চাবি হাতে পেলেন।  


শেয়ার করুন