১৪ জুন ২০১২, শুক্রবার, ০৫:২৯:৫৯ অপরাহ্ন


সিটিতে বিএনপির ‘না’
দুশ্চিন্তা বাড়ছে জাতীয় নির্বাচনে
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০৫-২০২৩
দুশ্চিন্তা বাড়ছে জাতীয় নির্বাচনে


দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই দেখা দিচ্ছে অনিশ্চয়তা। অনেকেই ভেবে রেখেছিলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ইস্যুতে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশসমূহ যেভাবে নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফরের মাধ্যমে আগামী জাতীয় নির্বাচনটা সুষ্ঠু ও সুন্দর হওয়ার একটা ইঙ্গিত হয়তো মিলবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করেছেন। এরপর যুক্তরাজ্য হয়ে দেশে ফিরবেন।

বিষয়টা আরো স্পষ্ট করেছে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে স্রেফ ‘না’ ঘোষণা হওয়ার পর। ঈদুল ফিতরের আগেও বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপিকে নিয়ে একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা নিয়ে দৃষ্টি ছিল সবার। অনেকেই আগাম মন্তব্য করেছিলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ ও অংশগ্রহণমূলক হওয়ার ইঙ্গিতটা মিলবে এ পাঁচ সিটিতে বিএনপির ডাইরেক্ট অথবা ইনডাইরেক্ট অংশ নেওয়ার মাধ্যমে। ফলে বিএনপির ফাইনাল সিদ্ধান্তের জন্য ঈদের পর মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়। বিশেষ করে ঈদের পূর্বে সিলেটের মেয়র আরিফের দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেবেন কি নেবেন না, সেটা ঈদের পর জানাবেন বলে যে বক্তব্য তিনি রাখেন, তাতে একটা রহস্যের সৃষ্টি হয়েছিলেন। কারণ আরিফ চিকিৎসার জন্য লন্ডনে ছিলেন বেশ কিছুদিন। যেখানে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব রয়েছেন। খবর বেড়িয়েছিল বিএপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা। ফলে হয়তো বিএনপির ঐ শীর্ষনেতার দিকনির্দেশনা নিয়েই তিনি এসেছেনÑএমনটাই ছিল দেখার বিষয়। কিন্তু ঐসব জল্পনাকল্পনা সব শেষ।

বিএনপি যে সেই আগের অবস্থানেই সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ২৯ এপ্রিল স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিএনপি মহাসচিব গণমাধ্যমকর্মীর প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা খুব পরিষ্কার করে বলে দিয়েছি, কোনো রকমের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা যাচ্ছি না। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা পরিষ্কার বলে দিয়েছি যে, এখানে মেয়র নির্বাচনই বলেন বা কমিশনার নির্বাচনই বলেন, এখানে আমাদের দলের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না।’

এ সময় বিএনপির মহাসচিব অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিশ্বাস করে না, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ বিশেষ করে এই সরকার অত্যন্ত সচেতনভাবে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে তাদের যে পুরোনো লক্ষ্য, সেই একদলীয় শাসনব্যবস্থা, বাকশালের মতো একটা শাসনব্যবস্থা এখানে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এমনকি আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোয় জনগণ অংশগ্রহণ করছে না, ভোটাররা কেন্দ্রে যাচ্ছে না। সম্প্রতি যে ভোট হয়ে গেল (চট্টগ্রামে উপনির্বাচন), সেই ভোটে মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে গেছে। সুতরাং জনগণ বোঝে, মানুষ বোঝে, গোটা বিশ্ব বোঝে, এ সরকার ক্ষমতায় থাকলে কোনো দিনই কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, জনগণ সেই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে না। সে কারণেই আজ আওয়ামী লীগ এসব কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়।’

শুধু এ কথাতেই নয়, দলের ভেতরগত সংবাদ হলো এ সরকারের অধীনে দলের যে-ই অংশ নেবে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলার ভঙ্গের শস্তির মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে। এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বলেছিলেন, বিএনপি ঘোমটা পরে অংশ নেবে। আবার আরেক বক্তব্যে বলেন, বিএনপির অনেকেই তাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করছে। একইভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগও ওঠে যে, এ নির্বাচনে তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উপনির্বাচনে উকিল আব্দুস সাত্তার মার্কা লোকও খুঁজছে। সব মিলিয়ে সিটি নির্বাচনে বিএনপির বিগত সময়ে ব্যাপক প্রধান্য থাকলেও এবার সেটাতে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা নতুন নির্দেশনা বহন করছে।  বিএনপি সিটি নির্বাচনে তাদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়ার পর এবার দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যে কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের বা ইসির অধীনে অংশ নেবে না এটা অনেকাংশে ক্লিয়ার হয়ে গেছে। 

যদিও রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। তবু বর্তমান প্রেক্ষাপটে যার অর্থ হতে পারে দুটি। প্রথমত. বিএনপি জাতীয় সংসদ থেকে গণপদত্যাগ করে চলে আসার পর স্থানীয় নির্বাচনে সর্বশেষ অংশ নেওয়ার (পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন) যে সুযোগ সৃষ্টি করে জাতীয় নির্বাচনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান করার যে স্বপ্ন দেখছিলেন অনেকেই এ সরকারের অধীনে সেটা শেষ হয়ে গেল। এবার বিএনপি হয়তো কঠোর আন্দোলনের দিকে ঝুঁকবে। তারা সরকারকে বাধ্য করার চেষ্টা করবে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের।  দ্বিতীয়ত. দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপির পুরোনো দাবিতে একট্টা থাকার কারণে ক্ষমতাসীন সরকার আবারও ২০১৪ ও ২০১৮ সনের মতো নির্বাচনের প্রক্রিয়ার দিকে ক্রমশ অগ্রসর হবে। কারণ বিএনপি নির্বাচনে না এলে আওয়ামী লীগের কিছু করার থাকছে না। ফলে বিগত দুই টার্মের ন্যায় একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। 

কিন্তু এখন প্রশ্ন সেটা কি সম্ভব হবে? দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখার জন্য বিশেষভাবে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন। এক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পর্যাপ্ত গণতন্ত্র নেই উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের গণতান্ত্রিক সম্মেলনে বাংলাদেশকে বাইরে রাখছে তারা। শুধু এখানেই শেষ নয়, মার্কিনিরা যারা এমন গণতন্ত্রে পিছিয়ে, তাদের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যও তাদের বিশেষ কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের বেলায়ও তারা একট্টা। 

বিএনপির জন্য এটা একটা প্লাস পয়েন্ট 

সব দিক বিবেচনা করলে, কোন পথে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নেতৃত্ব এগোচ্ছে সেটা নির্ধারিত হবে এ বছরের অবশিষ্ট সময়টুকুতে। তাই প্রতিটা মুহূর্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষেরও দৃষ্টি কী হতে যাচ্ছে দেশের ভবিষ্যতের সময়গুলোতে সেদিকে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

শেয়ার করুন