১৪ জুন ২০১২, শুক্রবার, ০৬:৪৯:১১ অপরাহ্ন


সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য পরিষদ নেতৃবৃন্দ
আওয়ামী লীগ-বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০৫-২০২৩
আওয়ামী লীগ-বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য পরিষদ নেতৃবৃন্দ


বাংলাদেশ সব সরকারের আমলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতনের শিকার। কোনো সরকারই সংখ্যালঘুদের রক্ষায় এগিয়ে আসছে না, সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান এক এবং অভিন্ন। বিএনপি-জামাতের আমলেও সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হয়েছিল, এখন আওয়ামী লীগের আমলেও সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার। সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির অবস্থান মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ। বরং ক্ষেত্রবিশেষে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান শাসনামলে সংখ্যালঘুরা বেশি নির্যাতনের শিকার। বর্তমান সরকার নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের রক্ষায় বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তারা এখন সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না। বাংলাদেশে সাংবাদিকরা যেমন ডিজিটাল আইনের কারণে লেখতে পারছে না, ঠিক তেমনি রাজনৈতিক নেতা এবং সংখ্যালঘু নেতারা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারছেন না। এটাই বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি। আমরা বাংলাদেশে ইসলামি ফাউন্ডেশনের মতো হিন্দু ফাউন্ডেশন চাই, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন চাই, জাতীয় হিন্দু কমিশন গঠন করা চাই এবং বাতিলকৃত শত্রু সম্পত্তি আইনে অধিগৃহীত সব সম্পত্তি প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। গত ২৮ এপ্রিল বিকালে জ্যাকসন হাইটসের একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলনে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন।

ঐক্য পরিষদের সভাপতি নবেন্দ্র বিকাশ দত্তের সভাপতিত্বে এবং দ্বিজেন ভট্টাচার্যের পরিচালনায় সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঐক্য পরিষদের সহসাধারণ সম্পাদক বিষ্ণু গোপ। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন ডা. টমাস দুলু রায়, শিতাশু গুহ, সুশীল সাহা, রূপকুমার ভৌমিক, বিদ্যুৎ দাস, রণবীর বড়–য়া, শিতাশু গুহ, প্রদীপ মালাকার প্রমুখ।

লিখিত বক্তব্যে বিষ্ণু গোপ বলেন, বাংলাদেশে যখনই সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছে তখনই আপনারা ঐসব বীভৎস ঘটনার সচিত্র বিবরণী ছেপে দেশের জনগণকে অবহিত করেছেন, আমাদের পাশে থেকেছেন, এজন্যে যুক্তরাষ্ট্র ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশ্য দেশে চলমান সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ করতে আপনাদের সাহায্য চাওয়া। আপনাদের মাধ্যমে দেশের প্রগতিশীল মানুষজন, সাংসদবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ প্রধানদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাতে চাই যে, তারা যেন দেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস বন্ধ করতে সচেষ্ট হন। 

তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালে এরশাদ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার ভিত্তিতে রচিত ১৯৭২ সালের শাসনতন্ত্রের অন্যতম মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিসর্জন দিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার অব্যবহিত পর দাউদকান্দি ঋষিপাড়ায় আক্রমণকারী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা ঘোষণা করেছিল- ‘এই দেশ আবার পাকিস্তান হয়ে গেছে, কাফেরদের এ দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে।’ তখন থেকে নিয়মিতভাবে  সংখ্যালঘুবিরোধী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের কার্যক্রমটি অব্যাহত রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ২০১২ সালে রামু, ২০১৩ সালে নন্দীরহাট, ২০১৬তে নাসিরনগর, ২০১৭ সালে রংপুরের গঙ্গাছড়া, ২০১৯ সালে ভোলার বোরহানুদ্দীন, ২০২১ সালের পুজোয় কুমিল্লা, চট্টগাম ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এবং সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে সংঘটিত ঘটনাবলি সম্পর্কে  আপনারা সম্যক আবগত  আছেন, তাই সেগুলোর বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন মনে করি না। বাংলাদেশ থেকে সংখ্যালঘু নাগরিকদের বিতাড়নের উদ্দেশ্য ও কলাকৌশল  অভিন্ন, তাই সেই বিবরণও দিচ্ছি না।  

তিনি বলেন, আমারা আজ যা বলতে চাই সেটা হলো, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন চলছে। কারণ ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো সরকারই সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচার করেনি। ধর্মীয় মৌলবাদী এবং উগ্রপন্থী ঐসব নির্যাতনকারীরা জানে যে, সংখ্যালঘু নারী ধর্ষণ, খুন, বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাদের পুরো গ্রাম উৎখাত করে ফেললেও (যেমন-১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামের লোগাং ম্যসাকার) বিচার হবে না। তাই তারা তাদের ঘোষিত লক্ষ্য দেশকে আফগানিস্তানের মতো একটি শরিয়াশাসিত ইসলামিক অমিরাতে রূপান্তরিত করতে নির্ভয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনাবলির হোতাদের তদন্ত করে কোনো তালিকা এখনো করা হয়নি; তবে ২০০১ সালের অক্টোবরে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত বর্বর আক্রমণের ৫৮ হাজার কেস লিপিবদ্ধ আছে মানবাধিকারকর্মী শাহরিয়ার কবিরের বই এবং জজ সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত প্রোব কমিশন রিপোর্টে। তৎপরবর্তীকালের হাজার হাজার ঘটনা বিশদভাবে খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলোর অপরাধীদের তালিকা সরকারের কাছে রয়েছে। অথচ আপনারা জানেন যে, ব্যতিক্রম হিসেবে হাতেগোনা যায় এমন কয়েকটি কেসে অভিযুক্তদের ছাড়া সরকার সচরাচর সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার করে না। অবিরাম এই বর্বর নির্যাতনে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ায় সংখ্যালঘুরা ১৯৭১ সালে যে স্থলে মোট জনসংখ্যার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল আজ ২০২৩ সালে সেটা নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশে আর পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটা ১৯৪৭ সালে যে স্থলে ছিল ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ আজ ২০২৩ সালে সেটা নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে।  

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার হয় না, সেখানে সংখ্যালঘু সুরক্ষার জন্য কোনো বিশেষ আইন নেই, এমনকি প্রচলিত আইনেও তাদের বিচার করা হয় না, দুয়েকটি লোক দেখানো ব্যতিক্রম ছাড়া। বন্ধুগণ, আওয়ামী লীগ ও তার জোটভুক্ত দলসমূহ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে, ওনার জোটভুক্ত দলের সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং সরকারি কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে দাবি করে এসেছেন যে, তারা সেক্যুলার ডেমোক্রেসি এবং দেশের সব নাগরিকের সমঅধিকারে বিশ্বাসী। তবে কেন তাদের শাসনামলে নির্যাতিত হয়ে সংখ্যালঘু নাগরিকদের দেশত্যাগ করতে হচ্ছে? সরকার চাইলে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। ২০২২ সালের পুজোয় অঘটন ঘটেনি। কারণ সরকার কঠোর ছিল। আইন করে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অবলম্বন করলেই সেটা বন্ধ করা সম্ভব। বিচার এবং শাস্তির ভয় থাকলে মৌলবাদী ও উগ্রপন্থীরা দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসীদের  টার্গেট করে সন্ত্রাস চালাতে সাহস করবে না। তাই প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদের কাছে আমাদের দাবি এবং সনির্বন্ধ অনুরোধ এই যে, তারা যেন আগামী নির্বাচনের আগেই সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়নপূর্বক, চিহ্নিত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে দেশের বিপন্ন সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব সুরক্ষার টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।  

আমরা মনে করি  যে, নিম্নোল্লিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নিরন্তর চলমান, অমানবিক প্রক্রিয়া বন্ধ করা সম্ভব: (১) বর্তমান সংসদে একটি সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাস করা, যার অন্তর্ভুক্ত থাকা চাই; (ক) হেইট স্পিচ ও ক্রাইম আইন, যে আইনের অধীনে সরকার বাদী মোকদ্দমার মাধ্যমে সব সংখ্যালঘু নির্যাতকের বিচার হবে; (খ) সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচারের জন্য প্রতি জেলায় একটি দ্রুত বিচারের ক্ষমতাসম্পন্ন আদালত প্রতিষ্ঠা করা। (২) জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা। (৩) বাতিলকৃত শত্রু (অর্পিত) সম্পত্তি আইনে অধিগৃহীত সব সম্পত্তি প্রকৃত মালিককে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া।

তিনি বলেন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইনের ঈপ্সিত ফল পাওয়ার জন্য নিম্নোক্ত কয়েকটি সম্পূরক পদক্ষেপও গ্রহণ করতে হবে: (ক) ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনরুজ্জিবীত করা,(খ) জজ্ সাহাবুদ্দিন কমিশন রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী অবিলম্বে সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা; (গ) একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন পূর্বক ২০০৬ থেকে এ পর্যন্ত সংঘটিত সব সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপরাধীদের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট আদালতের কাছে হস্তান্তর করা; (ঘ) নির্যাতন প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাদের পুনর্বাসন এবং শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা; (ঙ) একটি বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন করা; (চ)পার্বত্য ভূমি কমিশনের দ্রুত, যথাযথ বাস্তবায়ন; (ছ) দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ আইন করা; (জ) সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসমূহের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা; এবং (ঝ) ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আদলে সংখ্যালঘু ধর্মীয় ফাউন্ডেশেন গঠন করা।  

তিনি আরো বলেন, আমাদের দাবিনামার কয়েকটি অবশ্য আপনার ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিও বটে। আর আমরা যে প্রস্তাবগুলো করেছি সেগুলো মোটেও নতুন কিছু নয়; পাশের দেশ ভারতে জাতীয় সংখ্যালঘু আইন তো আছেই, একটি সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও রয়েছে; আর এখানে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে, হেইট ক্রাইম আইন রয়েছে যার বলে কেউ বর্ণবাদী বা ধর্মীয় সন্ত্রাসের শিকার হলে ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সন্ত্রাসীকে ফেডারেল অপরাধে অপরাধী হিসেবে তড়িত বিচারের ব্যবস্থা করে।  

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, উক্ত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন হলে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ হবে, এবং তখন দেশের সংখ্যালঘু নাগরিকরা ভয়হীন, স্বাভাবকি জীবন-যাপন করতে সক্ষম হবে।

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন নবেন্দু বিকাশ দত্ত, দ্বিজেন ভট্টাচার্য এবং শিতাশু গুহ। ঐক্য পরিষদকে আওয়ামী লীগকে দালাল হিসাবে আখ্যায়িত করে প্রশ্ন করলে কয়েকজন ঐক্য পরিষদ নেতা উত্তেজিত হলেও দ্বিজেন ভট্টাচার্য এবং শিতাংশু গুহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

শেয়ার করুন