২২ জুলাই ২০১২, সোমবার, ০৮:৫৪:৫৭ অপরাহ্ন


নির্বাচনকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা সব আমলেই
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৯-০৮-২০২৩
নির্বাচনকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা সব আমলেই


সব আমলে নির্বাচনকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নেওয়ার অবিরাম চেষ্টার কোনো বিরতি ছিল না। জনগণের আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলেও সেটাকেও দলীয় ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার কাজে ও জনগণের কাছে জবাবদিহিহীন বিশেষ মহলের ক্ষমতালিপ্সা-দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে আমরা ব্যবহৃত হতে দেখেছি। তাই প্রতিটি নির্বাচনের আগে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের দাবিতে তুমুল আন্দোলন আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। অথচ স্বাধীন দেশে একটি বৈষম্যহীন কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলার দাবি রাজনীতির মাঠের বাইরেই রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, নির্বাচন নিয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহলের দায়িত্বহীন ও একগুঁয়ে আচরণের সুযোগে শক্তিমান বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর ছবক ও ধমক আমাদেরকে সহ্য করতে হচ্ছে। আর এজন্য নির্বাচন নিয়ে প্রতিবার অস্থিতিশীল অবস্থার অবসান চায় জাতি। 

এসব বক্তব্য বাংলাদেশ জাসদের জাতীয় কমিটির সভায় রাজনৈতিক প্রস্তাবে উঠে আসে। এতে আরো বলা হয় বিদ্যমান সরকারব্যবস্থায় একটি সত্যিকার জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশ জাসদের পক্ষে সে ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণও অসম্ভব। 

বাংলাদেস জাসদের জাতীয় কমিটির সভা সম্প্রতি ঢাকাস্থ শিশুকল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে দলের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নেন-সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, কার্যকরি সভাপতি ইন্দু নন্দন দত্ত, স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেনসহ স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ। সভায় প্রায় ৪০ জেলার প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 

সভায় বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক প্রস্তাব গৃহীত হয়। এতে আরো বলা হয়,  বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় বায়ান্নো বছর হলো। কিন্তু একটি স্থিতিশীল নির্বাচনীব্যবস্থা আজও আমরা পেলাম না। রাজনৈতিক দলীয় সরকার, সামরিক সরকার মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া একটি দেশের জন্য এটা অত্যন্ত অমর্যাদাকর। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার এহেন অধঃপতন ঘটেনি। স্বাধীনতার এত বছর পরেও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিকীকরণ না হবার ফলে আজ এ অবস্থা। এ কথা অনস্বীকার্য যে, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ধারাবাহিকতায় বিদ্যমান সরকারব্যবস্থায় একটি সত্যিকার জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশ জাসদের পক্ষে সে ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণও অসম্ভব। দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান স্বাধীনতার আগের তুলনায় বেড়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু সময়টা বড় দীর্ঘ হয়েছে। অপরদিকে উন্নয়নের নামে সৃষ্টি হয়েছে প্রচণ্ড শ্রেণিবৈষম্য, যা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। চরম লুটপাট, বিদেশে সম্পদ পাচার দেশকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে ফেলেছে। বিদেশি ঋণের বিশাল বোঝা আমাদের আর্থসামাজিক কাঠামোকে তছনছ করে দিতে এগিয়ে আসছে। দীর্ঘ সামরিক শাসন, রাজনৈতিক দলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন এদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোকে গড়ে তুলতে বাধার সৃষ্টি করেছে। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের আধুনিকীকরণ ও গণতন্ত্রায়ন হয়নি। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে লুটপাট, দুর্বৃত্তপনা ও পেশিশক্তির জোর সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। উৎপাদনমুখী ও নিয়মতান্ত্রিক অর্থনীতি-রাজনীতি আজ উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়েছে। এ অরাজক অবস্থার অবসানকল্পে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সামাজিক সব শক্তিকে একত্রিত হয়ে বিদ্যমান অবস্থাকে পরিবর্তন করার জোরদার সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত, জনকল্যাণমুখী, জাতীয় মর্যাদাসম্পন্ন, গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা আজ জরুরি কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাসদের দাবিগুলো হচ্ছে, নির্বাচন নিয়ে প্রতিবার অস্থিতিশীল অবস্থার অবসান চাই। নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টাম-লী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সময় হতে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সংস্কার করতে হবে। 

অন্যদিকে জাতীয় সম্পদ লুটপাট ও বিদেশে পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে ও তাদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। উৎপাদন কাজে জড়িত দেশপ্রেমিক ও মানবিক উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতি থাকতে হবে। সমতাভিত্তিক, ন্যায়বিচারিক ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করতে হবে। 

এর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম একটি কমিশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আবাসিক পর্যায়ে গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না। সমাজের বিত্তহীন ও নিম্ন আয়ের ১০০ শতাংশ মানুষকে সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তার অধীনে আনতে হবে। শহর ও গ্রামে রেশনিংব্যবস্থা চালু করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারসাজি বন্ধে ‘সিন্ডিকেট’-এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

দলের পক্ষ থেকে দাবিতে আরো উঠে আসে যে, প্রতিটি সক্ষম পূর্ণ বয়স্ক মানুষকে কাজ দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কাজের সংস্থান নতুবা সর্বজনীন বেকার ভাতা দিতে হবে। শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি মাসিক ২৫ হাজার টাকা অথবা দৈনিক ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। শ্রমিকের অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কৃষকের হাতে সরাসরি কৃষি উপকরণ দিতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে। ৫. ফেডারেল পদ্ধতির শাসন চালু করে বাংলাদেশের বিভাগসমূহকে প্রদেশে পরিণত করতে হবে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। জাতীয় সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ৭০ ধারার সংশোধন করতে হবে। স্বশাসিত, শক্তিশালী ও সংসদীয় পদ্ধতির স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মার্কা বাতিল করতে হবে। স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করতে হবে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর স্বাধীন বিকাশের জন্য সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পার্বত্য শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সর্বজনীন সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বৈত নাগরিকদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। ৬. অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল নীতি তথা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। গোটা বিচার বিভাগকে সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে পরিপূর্ণভাবে পৃথক করতে হবে। নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে হবে। জীবনমুখী সাংস্কৃতিক জাগরণের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণ আর্থসামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলসহ স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ৭. সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সর্বজনীন আবাসন ও সর্বজনীন একমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. বিশ্বশান্তি ও ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, মৈত্রী ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অলঙ্ঘনীয়। তিস্তাসহ আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য বণ্টন করতে হবে।

শেয়ার করুন