২২ জুন ২০১২, শনিবার, ০৪:৪২:০৭ অপরাহ্ন


ভারতের রাজনীতিতে রূপালি পর্দার তারকাদের সমাবেশ
সুপর্ণা চক্রবর্তী
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৫-২০২৪
ভারতের রাজনীতিতে রূপালি পর্দার তারকাদের সমাবেশ


রাজনীতি বলতে আমরা কি বুঝি? রাজনীতি হলো দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সর্ম্পকের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণবিষয়ক কর্মকান্ডের সমষ্টি। অর্থাৎ, এককথায় জনকল্যাণ এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজের নীতি নির্ধারণের নামই হল রাজনীতি। আর এইসব কর্মকান্ডে যারা যুক্ত থাকেন বা নীতি নির্ধারণ করেন তাদের বলা হয় রাজনীতিবিদ। জনগণের মনোনীত রাজনীতিবিদদের নিয়েই গঠিত হয় সরকার। সরকারের মৌলিক দায়িত্ব জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী দেশের নিরাপত্তা বিধান করা, সমাজের শান্তি বজায় রাখা, জনগণের জান-মাল রক্ষা করা এবং বিবাদের ক্ষেত্রে বিচারকার্য সঠিক এবং সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা।

সমগ্র বিশ্বের মতো ভারতের রাজনীতিও দেশের সংবধিানের কাঠামোর মধ্যে কাজ করে। ভারতবর্ষ একটি সংসদীয় ধর্ম নিরেপক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজতন্ত্র, যেখানে রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং ভারতের প্রথম নাগরিক, প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারের প্রধান। আমাদের এই ভারতে দ্বৈত রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলিত, কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য। কেন্দ্রীয় সরকার সমগ্র ভারতের নীতি নির্ধারক, রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের আওতায় পড়ে। ভারতের প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৫১ সালে । সেই থেকে সংবিধানিক ক্রমর্বধমান ধারায় নির্বাচন হয়ে আসছে 

সাম্প্রতিককালে ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ধারায় হাওয়া বইছে। রূপালি জগতের খ্যাতনামা শিল্পীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক দল। দীর্ঘদিনের পেড়ে খাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের সাথে টলিউড থেকে বলিউড- লম্বা লাইন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খেলার দুনিয়া। ক্রিকেট থেকে ফুটবল। যদিও খেলার দুনিয়ার তারকরা হাতেগুণা কয়েক জন মাত্র। খেলার জগৎ থেকে নভোজিৎ সিং সিধু বাদে আর কেউ সেইভাবে ঠিকে থাকতে পারেননি। সে শচীন টেন্ডুলকারই হোক বা মুহম্মদ আজহার উদ্দিন- কেউ না। আসলে রূপালী পর্দার শিল্পের অভিনীত চরিত্রগুলি হৃদয় স্পর্শী, সহজে মানুষের মনের মনিকোঠায় জায়গা করে নেয় আর সেইটা কাজে লাগিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নিজেদের ভোটব্যাংক বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক ময়াদানে রূপালি পর্দার শিল্পিদের প্রথম পদার্পণ কংগ্রেসের হাত ধরে। 

বর্তমানে ভারতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস যেন চাঁদের হাট। সমগ্র টলিউড ইন্ডাস্ট্রি যুক্ত হয়েছে এই দলে। কে বা নেই? টলিউডের বড় পর্দার প্রথম সারির অভিনেতা দেব অরফে দীপক অধীকারী থেকে শুরু করে মিমি চক্রবর্তী, জুন মালিয়া, সন্ধ্যা রায়, মুনমুন সেন, দেবশ্রী রায়, পরিচালক গৌতম ঘোষ, রাজ চক্রবর্তী প্রমুখ। পিছিয়ে নেই ছোট পর্দার শিল্পীরাও। সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিলেন সকলের প্রিয় ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’ রচনা ব্যনার্জী। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় হয়তো নির্ভর বা বিশ্বাস কোনটাই করতে পারছেন না রাজনৈতিক তারকাদের উপর। তাই তিনি তার দলে বড় এবং ছোট পর্দার তারকারদের মেলা বসিয়েছেন। তার এই দলে যুক্ত হয়েছেন বলিউডের শত্রুঘ্ন সিনহা, বাবুল সুপ্রিয়র মতো ব্যক্তিরারও। টলিউডের সাথে বিচার করলে বলিউডের হাতে গুণা গুটিকতেক তারকা ছাড়া সিংহজগৎই রাজনৈতিক ময়দান থেকে শতহস্ত দূরে। 

রঙ্গিণ দুনিয়ার তরকারা যখন তাদের জগৎ ছেড়ে কোন রাজনৈতিক দলের হাত ধরে ময়দানে নামেন, তখন তাদের এটা মাথায় রাখা উচিৎ যে ঐ রাজনৈতিক দলের ‘ইমেজ’ নির্ভর করে তাদের উপর। এমনকি নিজর ‘ইমেজও’ যে কোন ধরনেরর বেফাঁস কথা র্বাতা সেই ইমেজকে নড়বড়ে করে দেয় তা অনেক তারকাই বুঝতে চান না। যেমন ধরুন, রাজনীতিতে নবগতা রচনা ব্যানার্জী। জি-বাংলায় অনুষ্ঠিত সবচেয়ে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো “দিদি নাম্বার ওয়ান” এর উপস্থাপিকা। দীর্ঘ বছর ধরে সমান জনপ্রিয়। এ বছর পশ্চিমবঙ্গের হসনী জেলায় তৃণমূল কাংগ্রেস থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রতিপক্ষ বিজেপির জাদরেল নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়। এক সময় একই সঙ্গে দুজনে অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু লকেট চ্যাটার্জী অনেক দিন আগেই অভিনয় জগতে থেকে বিদায় নিয়ে রাজনীতির ময়দানে প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়- সেই লকেট চ্যাটার্জির সাথে টক্কর দিতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’-এর। তৃণমূল কংগ্রেস এবং মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পক্ষে কথা বলতে গিয়ে এমন কিছু বেফাঁস কথা বলে ফেলেছেন যা এখন জনগণের কাছে এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে হাসির খোরাক হয়ে গেছে।

রচনা ব্যানার্জী রাজনীতিতে যতই অনভিজ্ঞ হোন না কেন তার এটা বোঝা উচিত যে রাজনীতিরে ময়াদানে হাজার হাজার মানুষের সামনে রাজনৈতিক ভাষাই ব্যবহার করা উচিত। সিনেমার ডায়লগ না। ইনি জনগণের সেবা করতে এসেছেন সিনেমায় অভিনয় করতে নয়। জনসভায় উনার বলা প্রত্যকটি ডায়ালগ এমনভাবে ভাইরাল হয়েছে যে নিউজ চ্যানেলগুলি ওনাকে কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না। যদিও এই কটাক্ষের উত্তর ইনি খুব সুন্দরভাবে ম্যাানেজ করছেন, তবুও তাঁর অবস্থা এখন শাঁখের করাতের মতো। এগুলেও বিপদ, পিছলেও বিপদ। 

এবারে আসা যাক টলিউড প্রথম সারির নায়ক দেবের কথায়। দেব ওরফে দীপক অধীকারী পশ্চিমবঙ্গের মোদিনীপুর জেলার ঘাটাল মহুকুমার প্রার্থী তৃতীয়বার, দেবের বক্তৃতা ঘিরেও কটাক্ষোর শেষ নেই। কিন্তু রচনা ব্যানার্জির মতো এত ভাইরাল হয়নি। যদিও এবছর ইনি নির্বচানে সামিল হতে চননি দলের চাপে বাধ্য হয়েছেন ঘটালের জনসভার তিনি এটা স্পষ্ট করে দিছেনে। যে রাজনীতি সম্পর্কে ওনার গভীর জ্ঞান না থাকলেও দলের তাবেদারিতে ওনার জুড়ি মেলা ভার। আর একদিকে বিজেপি প্রার্থী হেমা মালিনীর কথাই ধরুন, আশির দশকের ড্রিমর্গাল যেরকম দাপুটে অভিনেত্রী, সেই রকম দাপুটে রাজনৈতিক নেত্রী। সেই তুলনায় কংগ্রেসের প্রার্থী জয়াপ্রদা বা অমিতাভপত্নী জয়া বচ্চন রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকতেই পারলেন না।

বলিউডই বলুন বা টলিউড কিংবা খেলার জগতের রাজনীতির ময়দানে সবাই প্রবেশ করেন ঠিকই, কিন্তু জনসেবা বা সমাজ সোবায় কারোর টিকিটিও দেখা যায় না। দু’চারজন ছাড়া রাজনিনীতিবিদেরও জনসেবায় সম্পর্ণূরূপে নিজেদের নিয়োজিত করেন না ঠিকই, কিন্তু এলাকার স্বার্থে একলাকাবাসির ধরা ছোঁয়ার মধ্যেই থাকেন। এলাকাবাসি নিজেদের সুবধিা অসুবিধা উনাদের কাছে ব্যক্ত করতে পারেন। কিন্তু রূপালি পর্দার রাজনীতিবিদরা নির্বাচনের সময় ছাড়া অন্য সময় থাকেন জনগণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। রাজনীতিতে ওনাদের আসার মূল লক্ষ্যই হল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি। রাজনতির ‘র’ও জানেন না। দল থেকে যা শিখিয়ে দেওয়া হয় সেই বুলিই জনসভার মুখুস্থ বলে আসেন, স্ক্রিপ্ট মুখস্থের মতো।

অভিনয় জগত হল আমাদের সব থেকে বড় বিনোদন জগৎ। দেশের সংস্কৃতি জড়িয়ে আছে এই জগতের সাথে। শুধু নিজের দেশের নয়, বিদেশের মাটিতেও নিজেদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার একমাত্র মাধ্যম। আবার ব্যবসায়িক দিক থেকে বিচার করলেও সরকারের হাতে মোটা অঙ্কের মুনাফা তুলে দেয় এই জগৎ। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলি নিজ নিজ দলের প্রচার এবং প্রসার বাড়ানো জন্য হাতিয়ার করেছে এই জগতের তারকাদের। এখন দেখতে বা শুনতে ভালো না লাগলেও ভবিষ্যতে দেশের বিশাল বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে এই রাজনৈতিক দলগুলি। কারণ রাজনীতি এবং সংস্কৃতি দুটি ভিন্ন ধারার বিষয়। রাজনীতি বলতে আমরা বুঝি সমাজের আইনবিধি, সংস্কৃতি বলতে বুঝি ব্যক্তি এবং জাতির মূল্যবোধ ও আচরণবিধি। সেজন্য রাজনীতি এবং সংস্কৃতিকে কখনোই একই ধারায় প্রবাহিত করা যায় না, লাভের থেকে ক্ষতি হয় বেশি।

বর্তমানে ভারতের বিনোদন জগৎ একটি মাত্র স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। নাম বলিউড (মুব্বাই ফিল্ম ইন্ড্রাস্টি)। এই বলিউড ইন্ডাস্ট্রি দেশে এবং বিদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সেখানে আমাদের বাঙালির বাঙালিয়ানার কোন স্থান নেই। আর আমাদের টলিউড ইন্ডাস্ট্রি ছুটে চলেছে এক অন্য দিশায়। নিজেদের লোভ এবং স্বার্থ চরিতার্থ করতে তারা এতটাই ব্যস্ত যে অন্য কোন দিকে খেয়ালই নেই। আমাদের বাঙালির বাঙালিয়ানা আস্তে আস্তে বিলিন এর পথে।

আমাদরে রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের ভোটব্যাংক বাড়ানোর জন্য বিনোদন জগতের শিল্পীদের রাজনীতিতে নিয়ে আসছেন ঠিকই, সেই সঙ্গে তৈরি করছেন শিল্পের ফাটল। কারণ শিল্পের মধ্যে বা বিনোদন জগতের সাথে যখন রাজনীতি যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেটা সু থাকে না হয়ে যায় কু। রাজনৈতিক দলগুলির এটা বোঝা উচিত যে বিনোদন জগতের ওপর সংস্কৃতি এবং অর্থনীতি দুটুই জড়িত। সেই কারণে রাজনীতির সস্তা খেলায় বিনোদন জগতকে কখনো যুক্ত কারা উচিত না। আজ মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ঠিকই কিন্তু বিনোদনের মান তলানিতে। আমাদের বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কথা ছেড়েই দিন। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি বাঙালি অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে। সংখ্যালগিষ্ঠ জাতি। এর জন্য দায়ী আমাদের সরকার।

বাংলার বিনোদন জগৎ যদি সক্রিয় না হয় তা হলে শুধুমাত্র মুম্বাই এর বিনোদন জগতের ওপর নির্ভর করে ভারতীয় সংস্কৃতি বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না। আমরা রাজনৈতিক দলগুলির দিকে আঙুল তুলছি ঠিকই, কিন্তু সেই দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে রাজনৈতিক দলগুলি তাদের কাজ করছে। শিল্পীদের- বিশেষ করে বাংলার বিনোদন জগতের শিল্পীদের এটা বোঝা উচিত যে তাদের একমাত্র দায়িত্ব এবং কর্তব্য হল বাংলার সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধশালী করা।

শেয়ার করুন