২২ জুন ২০১২, শনিবার, ০২:৫১:১৯ অপরাহ্ন


ঘটনার পর ঘটনা : ইমেজ সংকটে সরকার
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৯-০৫-২০২৪
ঘটনার পর ঘটনা : ইমেজ সংকটে সরকার মেজর সিনহা হত্যা নিয়ে তৎকালীন পুলিশপ্রধান ও সেনাপ্রধান


হঠাৎ করে একের পর এক ঘটনায় তোলপাড় বাংলাদেশ। কোনোটির চেয়ে কোনোটি কম নয়। জনমনেও এ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। সবকিছুই ভালো ভালো হয়ে গেল দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন। নতুন করে সরকার গঠন করে সবকিছুতে ঠিকঠাক নজর দিতে দিতেই এসব ঘটনার অবতারণা এবং একটার পর একটা। 

কেউ বলছে, কাকতালীয়ভাবে ঘটছে এসব। কেউ ভাবছে উল্টো। তবে এসব ঘটনার মধ্যে আজিজ আহমেদ ও বেনজীর আহমেদের ঘটনা বেশি বিস্ময় জেগেছে। দু’জনই একই সময় দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশের শীর্ষ ব্যক্তি ছিলেন। অবসরের পর তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে নানা অভিযোগ ও সর্বদা নীতিবাক্য বলা বেনজীরের সম্পদের পাহাড়ের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর জনমনে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। অথচ দু’জনই ছিলেন তৎকালীন সরকারের ব্যাপক আস্থাভাজন। এমনকি সেই সরকারের আমলেই তাদের এমন তথ্যাদি প্রকাশিত হওয়ায় ইমেজ সংকট সৃষ্টি হয়েছে ক্ষমতাসীনে। যদিও এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, অপরাধ যেই করুক ছাড় নেই। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন অপরাধ করে, দুর্নীতি করে যত মুরব্বিই ধরুক না কেন ছাড় দেওয়া হবে না। 

এ ঘটনায় শুধু যে রাজনীতি মহল বা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ সেটা নয়। আলোচিত এসব ঘটনায় বাংলাদেশের তৃণমূল থেকে শীর্ষপর্যায়, এমনকি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে যেখানে, সে পর্যায়েও আলোচনার খোরাকে পরিণত। এসব ঘটনার কোনোটিই দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। সবকিছুতেই কিছু না কিছু ইঙ্গিত মিলছে। একটার সঙ্গে অন্যটার মিল খোঁজার চেষ্টা করছেন অনেকেই। আবার কেউ খুঁজে না পেলেও কেউ কেউ দিয়ে দিচ্ছেন ক্লু। কিন্তু আসলেই কী সেটা আন্দাজ করা অন্তত সাধারণ মানুষের পক্ষে দুরূহ হয়ে গেছে।

সূচনা যেখান থেকে ---

বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকট

বাংলাদেশ ব্যাংকে হঠাৎ করে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এতে করে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সাংবাদিকরা। কেননা মিডিয়াতে যারা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিট করেন, তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রবেশ করেই নিতে হয় তথ্য। যুগের পর যুগ এভাবেই চলে আসছে। কিন্তু হঠাৎ করে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে ওই বিটের সাংবাদিক তথা, গোটা সাংবাদিক সমাজের জন্যই বিষয়টি অবমানকর হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় গত ৭ মে এক অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মন্তব্য ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। যার অর্থ আরেকটি হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে থাকতে পাওে, যা আড়াল করতেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এমন ব্যবস্থা। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যম একই ধরনের অর্থ হ্যাক হয়ে যাওয়ার তথ্যসমৃদ্ধ খবর পরিবেশন করে এবং সেখানে ওই হ্যাকিংয়ের সঙ্গে ভারতীয় হ্যাকারদের যুক্ত থাকার খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এমন কোনো হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেনি বলে জানান দেন। এরপর খবর বের হয় রিজার্ভের নিম্নমুখী এবং সেটা রেগুলার যেসব পেমেন্ট অপরিহার্য হয়েছিল ওটা পরিশোধ করার পর ১৩ বিলিয়নের মতো থাকবে বলে খবর প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে শুরু হয় হইচই। 

এ সময়ের খবর বাংলাদেশ সফরে আমেরিকার দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলের পররাষ্ট্র সহকারী ডোনাল্ড লু। বিশেষ করে একটি জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর মার্কিন এ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার সফর অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি। তবে তার সফরে যেসব কথা তিনি বলেছেন, সেটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। জানান দিয়েছেন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আগের অবস্থানেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর নির্বাচন পূর্ব আগের অবস্থা আর নতুন করে বোঝানোর নেই। এতে সরকার বিরোধীদলসমূহ বিশেষ করে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো নতুন করে চাঙ্গা হয়। পক্ষান্তরে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পরে ক্ষমতাসীন মহলে। 

জেনারেল (অব.) আজিজের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ডোনাল্ড লু ঢাকা ত্যাগ করার পর ২০ মে রাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট খবর দেয় বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারবর্গের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সাবেক এ সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় তোলপাড়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞার পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এটিকে নিশিরাতের স্যাংশন হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ‘লু আসলেন শান্তির বার্তা নিয়ে, ফিরে গিয়ে দিলেন স্যাংশন।’ 

২৬ মে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির তথ্য থাকলে তার বিচার সেনাবাহিনী করবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। একই সঙ্গে তিনি জানান, সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আদালত যে ব্যবস্থা নিচ্ছে, তাতে সরকারের সমর্থন রয়েছে। সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তার ভাইকে বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি এড়াতে সহযোগিতা করেন। এটি করতে গিয়ে তিনি নিয়মবহির্ভূত প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন। 

সেনাপ্রধান থাকাকালে বেশ প্রভাবশালী এ সেনাপ্রধান বেশি আলোচিত ২০১৮ সনের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এক বক্তব্যে। বিরোধীদল যখন বলছিল দিনের ভোট রাতে হয়েছে সে নির্বাচনে তথা, ২০১৮ সনের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান গণমাধ্যমে বলেন, ‘সেনাপ্রধান হিসেবে বলছি, আমিও এই দেশের নাগরিক। গত এক সপ্তাহ সারা দেশ ঘুরে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, বিগত ৪৭ বছরে এ রকম শান্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আমি দেখিনি। বিগত নির্বাচনগুলোতে কিছু না কিছু সহিংসতা হয়েছে। এবারও সহিংসতা হয়েছে, তবে সে সংখ্যা খুবই কম।’ নির্বাচনের একদিন আগে শনিবার রাজধানীর আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাছে গণমাধ্যমকর্মীদের এসব কথা বলেন সেনাপ্রধান।

সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সবাই আশ্বস্ত করেছে, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আজিজ আহমেদ বলেন, কোনো প্রকার হুমকি আছে কি না, সে জিনিসটা আমরা জানার চেষ্টা করেছি। যাতে করে সেনাবাহিনী দিয়ে সে ঝুঁকি, বিপদ-ভয়ের আশঙ্কা কমিয়ে নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু সবাই আমাদের আশ্বস্ত করেছে।’

সেনাপ্রধান বলেন, ‘কিছু কিছু এলাকা যেমন-সীমান্ত এলাকা সম্পর্কে বলেছে। আমি সে এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনীর টহল বৃদ্ধি করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছি, যাতে সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।’ আজিজ আহমেদ বলেন, ‘এছাড়া সারা দেশের সংখ্যালঘু এলাকাগুলোয় সেনাবাহিনী গিয়ে আশ্বস্ত করছে, ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে তাদের ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে এবং যার যার ভোট দিতে পারে। এজন্য সেসব এলাকায় সেনাবাহিনী টহল আজকেও যাচ্ছে, নির্বাচনের পরেও যাবে।’ 

জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগের দিন একজন সেনাপ্রধান এভাবে বক্তব্য দিতে পারেন কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তাছাড়া ওই নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধীদল অংশই নেয়নি। 

এই নির্বাচনকেই অভূতপূর্ব হিসেবে চিহ্নিত করে বক্তব্য দেন জাপানি রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। ২০২২ এর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন জাপানের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনের পর জাপান দূতাবাস সহিংসতা নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছিল। এটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। কারণ জাপান কোনো দেশের নির্বাচনের পর বিবৃতি দেয় না।’ ইতো নাওকি বলেন, নির্বাচন নিয়ে বৈশ্বিক মতামতের একটা গুরুত্ব আছে। জাপান ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরপরই উদ্বেগ জানিয়েছিল। আমরা নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার কথা শুনেছি, যা পৃথিবীর আর কোথাও শুনিনি। আমি আশা করবো, এবার তেমন সুযোগ থাকবে না বা এমন ঘটনা ঘটবে না।

ইতো নাওকি বলেন, পুলিশ কর্মকর্তারা আরো সতর্ক হবেন বলে আমরা আশা করছি। জাপান বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আমাদের চাওয়া থাকবে, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা আরো সামনে এগিয়ে যাবে। আর উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা চলমান রাখতে হলে অবশ্যই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। সেজন্য আমাদের চাওয়া থাকবে-নির্বাচনে গণতান্ত্রিক উপায়ে সব দল অংশগ্রহণ করবে। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়, সেজন্য চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের জানানো হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রদূত।

ফলে ওই নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও একটা কৌতুহল ছিল। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এটাকে দিনের ভোট রাতে হওয়া ব্যাখ্যা এখনো দেন। অথচ তৎকালীন সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ বলেছিলেন ৪৭ বছরের ইতিহাসের সেরা ভোট! 

সাবেক আইজিপি বেনজীরের সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ

গত ২৩ মে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দেয় আদালত। একই সঙ্গে তার সম্পদ কেনার ৮৩টি দলিল জব্দেরও আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেনের আদালত। বৃহস্পতিবার (২৩ মে) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেয় আদালত। এরপর দ্বিতীয় দফায় আবারও বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানের নামে থাকা আরো ১১৩টি দলিলের সম্পদ এবং গুলশানের চারটি ফ্ল্যাট জব্দ করার আদেশ দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদের নামে থাকা শেয়ার অবরুদ্ধ করারও আদেশ দিয়েছে আদালত। ২৬ মে ঢাকা মহানগর আদালতের সিনিয়র স্পেশাল জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন এ আদেশ দেন।

প্রসঙ্গত, ঢাকার এক দৈনিকে প্রকাশিত এক জাতীয় দৈনিকের দাবি, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খোঁজ মিলেছে। এরপর থেকেই বেশ আলোচনায় পুলিশের সাবেক এই আইজিপি। 

জাতীয় ওই দৈনিকে ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ কওে, যেখানে তার নানা অর্থ সম্পদের বিবরণ তুলে ধরা হয়। বেনজীরের বিপুল সম্পদের মধ্যে রয়েছে গোপালগঞ্জের সাহাপুর ইউনিয়নে সাভানা ইকো রিসোর্ট নামের এক অভিজাত ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র। এছাড়াও তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ছয়টি কোম্পানির খোঁজ পাওয়া গেছে। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরো দাবি করা হয়, ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে বেনজীর আহমেদের দামি ফ্ল্যাট, বাড়ি আর ঢাকার কাছের এলাকায় বিঘার পর বিঘা জমি রয়েছে। দুই মেয়ের নামে বেস্ট হোল্ডিংস ও পাঁচতারা হোটেল লা মেরিডিয়ানের রয়েছে ২ লাখ শেয়ার। পূর্বাচলে রয়েছে ৪০ কাঠার সুবিশাল জায়গাজুড়ে ডুপ্লেক্স বাড়ি, যার আনুমানিক মূল্য কমপক্ষে ৪৫ কোটি টাকা। একই এলাকায় আছে ২২ কোটি টাকা মূল্যের আরো ১০ বিঘা জমি।

অথচ গত ৩৪ বছর ৭ মাসের দীর্ঘ চাকরিজীবনে বেনজীর আহমেদ বেতন-ভাতা বাবদ মোট আয় ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকার মতো হওয়ার কথা। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি দেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন এমপি। চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ৩৪ বছর ৭ মাস চাকরি করে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ সালে অবসরে যান। অবসর গ্রহণের পর দেখা যায়, বেনজীর আহমেদের স্ত্রী ও কন্যাদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে, যা তার আয়ের তুলনায় অসম। 

বেনজীর আইজিপিসহ বিভিন্ন স্থানে সরকারি দায়িত্ব পালনকালে ছিলেন ব্যাপক ক্ষমতাধর। কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালে এ ব্যাপারে কোনো কিছু প্রকাশিত না হলেও অবসরে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় অবৈধ সম্পদ নিয়ে আওয়াজ। ঘটনা নিয়ে দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয় যে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার পর কীভাবে এতো সম্পদের মালিক হতে পারেন। উল্লেখ্য, বেনজীরও ক্ষমতায় থেকে বিভিন্ন সময়ে যেভাবে বক্তব্য দিতেন, সেটা কোনোভাবেই একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে মেলানো যেতো না। অনেকটাই রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই কথা বলতে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। এতেই তার বিরুদ্ধে সবার কিছুটা উৎসাহ ছিল। 

সংসদ সদস্য আনারের হত্যাকাণ্ড 

চিকিৎসার কথা বলে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সফরে গিয়ে খুন হওয়ার পর জানা যায়, এমপি আনার হত্যায় অংশ নেওয়া ৬ কিলারই বাংলাদেশি। এমনকি যে ফ্ল্যাটে তিনি অবস্থান করছিলেন, সেটাও এক বাংলাদেশির। হত্যার পর এমপি আনারের লাশ টুকরা টুকরা করা হয়। ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, বাংলাদেশের কোনো এমপি ভারতে গিয়ে খুন হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। তাই এটিকে বিরল ঘটনা বলছে তারা। তবে হত্যাকাণ্ডের পরক্ষণেই বাংলাদেশ থেকে একাধিকজন বলেন, এ ঘটনায় বাংলাদেশিরাই জড়িত। ভারত এর সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। তদন্দের আগেই মুহূর্তের মধ্যে এমন কথা বলাটা কতটা সমীচিন সেটা আলোচিত হয়েছে। 

আনারের চাঞ্চল্যকর কর্মকাণ্ড 

আনোয়ারুল আজীম আনার খুন হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে একে একে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব অপরাধের তথ্য। তার অপরাধের ফিরিস্তি এতো দূর পৌঁছেছিল যে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছিল পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল। তারপরও বারবার সংসদ সদস্য হয়েছেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০০৭ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করেছিল বাংলাদেশ পুলিশ। হুন্ডি ব্যবসা, সোনা চোরাচালান, হত্যা, গুমসহ বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে দেশের আদালতেও তখন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। এরপরও পলাতক থাকায় ২০০৮ সালে সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অথচ ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আনারের জনপ্রিয়তার কারণেই তাকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছিল। 

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম গত ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা জমা দেন, তাতেও তিনি নিজের বিরুদ্ধে ২১টি মামলা থাকার কথা উল্লেখ করেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মামলাগুলোর কোনোটিতে খালাস, কোনোটিতে অব্যাহতি পান তিনি, সে বিষয়টিও হলফনামায় তুলে ধরেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রকাশ্যে আসেন আনোয়ারুল আজীম আনার। কিছুদিনের মধ্যেই ইন্টারপোলের লাল তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়।

আনোয়ারুল আজীম আনারের বিরুদ্ধে এমন নানা অভিযোগের মধ্যে তিনি কীভাবে তিন দফায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন; তাকে দেশের অন্যতম একটি প্রধান দল আওয়ামী লীগই-বা কীভাবে মনোনয়ন দিয়ে আসছে, এখন এসব প্রশ্ন সামনে আসছে।

শেয়ার করুন