১১ জানুয়ারী ২০২৬, রবিবার, ০৩:১১:৫৬ পূর্বাহ্ন


তিন বছরে দুই বার পরিবর্তন করে ড্যাপকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ৩১-১২-২০২৫
তিন বছরে দুই বার পরিবর্তন করে ড্যাপকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো


সম্প্রতি ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের ঘটনায় জনমনে নিরাপত্তাজনিত আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। একইসাথে জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫ প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে ঘোষিত হয়েছে ঢাকা। রাজধানী ঢাকা ইতিমধ্যেই পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল ও অতিঘন শহরের পাশাপাশি মারাত্মক বায়ু দূষণ, পরিবেশ দূষণ, যানজট ও জলাবদ্ধতার শহর। উপর্যুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়েই আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপের মুখেই ঢাকা মহানগরীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধন ও ইমারত বিধিমালা অনুমোদন করল সরকার। এর ফলে রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় ভবন নির্মাণে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর), জনঘনত্ব ও আবাসন ইউনিট এর মান বহুলাংশে বেড়েছে। এটা অপরিণামদর্শী এবং ঢাকা মহানগরীর বাসযোগ্যতাসহ নির্মিত পরিবেশ ও প্রতিবেশ এর জন্য হুমকিস্বরূপ। এই ধরনের উদ্যোগ ঢাকা মহানগরীর বাসযোগ্যতাকে একেবারে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে। এর পাশাপাশি তিন বছরে দুই বার ড্যাপ এর পরিবর্তন করা হলো ঠিক কোন প্রক্রিয়ায়, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) আয়োজিত “ঢাকা মহানগরীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর সংশোধন এবং ইমারত বিধিমালা অনুমোদন: ঢাকার ক্রমবর্ধমান বাসযোগ্যতার সংকট" শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব বক্তব্য উঠে আসে। 

এসব বক্তব্য দিয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠীর অনৈতিক চাহিদা পূরণ করতে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর সংশোধন ও অনুমোদনকৃত ইমারত নির্মাণ বিধিমালার ত্রুটিপূর্ণ গেজেট অবিলম্বে বাতিল করবার দাবী করে পরিকল্পনাবিদদের পেশাজীবি প্রতিষ্ঠান বিআইপি। একইসাথে বিআইপির পক্ষ থেকে বলা হয়, মাটির জিওলজিক্যাল এবং হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য, সিসমিক মাইক্রা জোনিং, লিকুইফেকশন প্রভৃতি বিবেচনায় নিয়ে দূর্যোগ সহনশীল ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক ভবনের উচ্চতা, এফএআর, জনঘনত্ব নির্ধারণ করতে হবে। শহরের বাসযোগ্যতা ও অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধাদি ও পরিবেশের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েই সকল পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি করে বিআইপি। পাশাপাশি ড্যাপ সংশোধন এর প্রক্রিয়ায় কৃষিজমি ও জলাভূমিতে উন্নয়ন নিষিদ্ধ করবার প্রয়াসকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করে বিআইপি। 

এতে বক্তারা আরো বলেন, পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশবাদী, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের মতামত ও দাবীকে উপেক্ষা করেই সরকার ড্যাপ এর এই সংশোধন করল। এতে জনবহুল ঢাকা শহরে উঁচু ভবনের সংখ্যা বাড়বে এবং ইতিমধ্যে স্থবির হয়ে যাওয়া শহরে পরিবহন, পরিসেবাসহ সকল ধরনের নাগরিক সেবার উপর অসহনীয় চাপ পড়বে । এই চাপ বহন করবার ক্ষমতা এই শহরের নেই। এই ধরনের উদ্যোগ ঢাকা মহানগরীর বাসযোগ্যতাকে একেবারে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে।

বিআইপির সহ সভাপতি-১ পরিকল্পনাবিদ শাহরিয়ার আমিন এর সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মূল প্রবন্ধে বলেন, ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা-২০২৫ এর সাম্প্রতিক সংশোধন রাজধানীর বাসযোগ্যতা, জননিরাপত্তা ও টেকসই নগর উন্নয়নের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, মাত্র তিন বছরের মধ্যে ব্যবসায়ীদের চাপে দুইবার সংশোধন করা নগর পরিকল্পনার মৌলিক নীতি ও আন্তর্জাতিক চর্চার পরিপন্থী এবং এটি স্পষ্টতই গোষ্ঠীস্বার্থনির্ভর। সংশোধিত ড্যাপে অধিকাংশ এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর), ভবনের উচ্চতা, আবাসন ইউনিট ও জনঘনত্ব অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে, যার পেছনে কোনো গ্রহণযোগ্য কারিগরি বিশ্লেষণ, অবকাঠামোগত সক্ষমতা মূল্যায়ন বা ঝুঁকি বিবেচনা নেই। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে যানজট, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকান্ড ও ভূমিকম্প ঝুঁকি বহুগুণে বাড়বে এবং পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশনসহ নাগরিক সেবাব্যবস্থার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল নগরীতে পরিণত হওয়া ঢাকায় জনঘনত্ব আরও বাড়ানো একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ, যা শহরের কার্যকারিতা ও জীবনমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তিনি গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির মতো এলাকায় ফার কমানোর যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে বৈষম্য বজায় রাখার কথা বলেন এবং আবাসিক এলাকায় ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা নির্ধারণ না করাকে একটি বড় পরিকল্পনাগত ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করেন। ঢাকার টেকসই ভবিষ্যৎ রক্ষায় তিনি ড্যাপ সংশোধন অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা, স্বচ্ছ ও কারিগরি ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

বিআইপি উপদেষ্টা পরিষদ এর সদস্য পরিকল্পনাবিদ-স্থপতি সালমা এ. শফি বলেন, ঢাকার আশেপাশের জেলা ও উপজেলা কীভাবে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা হবে, সে বিষয়েও ড্যাপে বলা রয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকাগুলোর পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে মানুষের ঢাকামুখী প্রবণতা কমানো যাবে। তিনি আরও বলেন, ড্যাপ বাস্তবায়নের কাঠামোও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু বাস্তবে ড্যাপ বলতে আমরা কেবল ফার (ঋঅজ) ও ভবনের উচ্চতা সংক্রান্ত আলোচনা শুনি, যা হতাশাজনক। 

বিআইপি’র সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন মন্তব্য করেন যে, ড্যাপ এর সংশোধনের প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে এমন গোষ্ঠী ও অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে যে পরিমার্জন করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। তিনি বলেন, সংশোধিত ড্যাপে ঢাকা শহরের মাত্র ১০-২০ শতাংশ মানুষ যারা ভূমির মালিক তাদের অংশীজন হিসেবে দেখানো হয়েছে, হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে বাকি ৮০ শতাংশ নাগরিকের আবাসন, চলাচল ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। পরিকল্পনা মানুষের জন্য হওয়ার কথা থাকলেও এতে মুনাফাভিত্তিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করছে। অগ্নিকান্ড, ভূমিকম্প, নাগরিক নিরাপত্তা ও চলাচলের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগর ঝুঁকি উপেক্ষা করে ঘনত্ব ও উচ্চতা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একদিকে জাতীয় নীতিতে ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমানোর কথা বলা হলেও অন্যদিকে এমন পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা ঢাকায় আরও অধিক সংখ্যক মানুষের আগমনকে উৎসাহিত করছে, যা জাতীয় শিল্পনীতি ও বিকেন্দ্রীকরণ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিআইপি ফেলো পরিকল্পনাবিদ এ কে এম রিয়াজ উদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে আমরা আদৌ পরিকল্পিত উন্নয়ন চাই কি না। কারিগরি জ্ঞান ও প্রমাণভিত্তিক তথ্য ছাড়া কোনো উদ্যোগ গ্রহণ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। তিনি বলেন, ঢাকায় আমরা সর্বোচ্চ কত মানুষকে রাখতে চাই, সে সিদ্ধান্ত আগে রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কেন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফার বাড়ানো হল, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনাগত ব্যাখ্যা থাকতে হবে। 

বিআইপির বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ আবু নাইম সোহাগ তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে আজ ড্যাপ এবং ফার দুটি একে অপরের সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। ড্যাপ কয়েক বছর পর পর পরিবর্তনযোগ্য। কিন্তু বিগত তিন বছরে দুই বার ড্যাপ এর পরিবর্তন করা হলো ঠিক কোন প্রক্রিয়ায়, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। নগর পরিকল্পনাবিদদের তাদের পেশাগত কাজগুলো স্বাধীন ভাবে করবার সুযোগ রাষ্ট্রকে দিতে হবে। নয়তো ঢাকা পরিণত হবে একটি কংক্রিটের জঞ্জালে পূর্ণ একটি শহুরে বস্তিতে, যেখানে থাকবে না কোনো নাগরিক পরিসেবা, বাসযোগ্যতা, খেলার মাঠ বা হাঁটার জন্য ন্যূনতম কোনো জায়গা।

আর এসব কারণে পরিকল্পনাবিদরা ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠীর অনৈতিক চাহিদা পূরণ করতে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর সংশোধন ও অনুমোদনকৃত ইমারত নির্মাণ বিধিমালার ত্রুটিপূর্ণ গেজেট অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান। তারা ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর জনঘনত্ব ও এফএআর (ফার) সংক্রান্ত সংশোধন প্রক্রিয়ায় শহরের বাসযোগ্যতা এবং অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধাদি ও পরিবেশের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। মাটির জিওলজিক্যাল এবং হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য, সিসমিক মাইক্রা জোনেশন (ঝবরংসরপ গরপৎড়ুড়হধঃরড়হ), লিকুইফেকশন প্রভৃতি বিবেচনায় নিয়ে দূর্যোগ সহনশীল ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার (জরংশ ঝবহংরঃরাব খধহফ টংব চষধহ) মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক ভবনের উচ্চতা, এফএআর, জনঘনত্ব নির্ধারণ করতেও দাবি জানান তারা। ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালায় এফএআর (ফার), সেটব্যাক, ভূমি আচ্ছাদন এর যথাযথ মান নির্ধারণ করতে হবে যেন ভবনগুলোর অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত আলো বাতাসের প্রবাহের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর বসবাস নিশ্চিত করা যায়। এলাকাভিত্তিক ভিন্নতাকে বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন এলাকার জন্য শ্রেণীভিত্তিক জনঘনত্ব, এফএআর, সেটব্যাক এর মান নির্ধারণ করার পরামর্শ দেন তারা।

শেয়ার করুন