ইসলামী আন্দোলন ও জামাতে ইসলামীর আমির
অনেকটা দীর্ঘ নাটকের পর জামায়াতে ইসলামীর জোট ছেড়ে দিলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। না-কি জামায়াতই বাধ্য করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে জোট ছেড়ে চলে যেতে? নানা প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে ইমান আকিদা আদর্শগত অনেক প্রশ্নে তফাৎ থাকা সত্ত্বেও তারা পরাস্পরের এতো কাছাকাছি কেনোই এলো আর কেনোই বা বিচ্ছেদ ঘটলো তা-নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অন্ত নেই।
শুধুই কি আসন ভাগাভাগির প্রশ্ন?
বলা হচ্ছে পছন্দের আসন পায়নি। এমনকি ইসলামী জোটের নামে উদ্ভুত আবদার শর্তের বেড়াজালে ইসলামী আন্দোলকে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছিল। তাই এই ধরনের জোটে ইসলামী দল আগ্রহী হয়নি। আর একারণে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন দলটি এককভাবে ২৬৮ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছে। এব্যপারে দলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হচ্ছে ইসলামের মৌলিক নীতির প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক আস্থাহীনতায় ১১ দলীয় সমঝোতায় থাকছে না।
জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হতে চায়
একটি সূত্র জানায়, জামায়াত যেভাবেই হোক না কেনো আগামী সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে আগ্রহী। তাদের দল থেকেই বিরোধী দলের প্রধানের পদটি পেতে চায়। জামায়াতে কাছে প্রথমে খবর ছিল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সাথে ২৪ জুলাইয়ের আন্দোলনে শরিক ছাত্রনেতাদের নিয়ে গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির নির্বাচনী ঐক্য হচ্ছে। এমন ঐক্যের কারণে আগামী সংসদে প্রধান বিরোধী দলের কাতারে চলে আসবে এনসিপি। আলোচনার এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া আর তা না হলেও থাকবে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায়। এ আওয়াজ দিয়েছিলেন দলটির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। এদিকে অবস্থা বেগতিক দেখে জামায়াতে ইসলামীর টনক নড়ে। তারা মনে করেছিল তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাতেই বসতে চাচ্ছে সহসাই। কিন্তু অবস্থা এমন পর্যায়ে টার্ন নিচ্ছিল যে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হওয়ার বিষয়টি নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। কারো কারো মতে, একারণে দলটি প্রথমে ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট ‘এক বাক্সে’ আনার ডাক দিয়ে মাঠ গরম করতে থাকে। এতে মোটামুটি দেশের একটি জনগোষ্ঠীর সহানুভূতির পাশাপাশি সমর্থনের পাল্লা ভারী হতে থাকে। এসময়ে অন্য ধর্মের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও জামায়াত কাছে টেনে নিয়ে ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট ‘এক বাক্সে’ আনার প্রক্রিয়া জোরদার করে। তাদেরকে একটি অসাম্প্রদায়িক দল হিসাবে প্রকাশ করতে থাকে। এতে করে দলটির সাথে ইমান আকিদা প্রশ্নে প্রচন্ড আদর্শগত ফারাত থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলনকে কাছে টেনে নিতে সক্ষম হয় জামায়াত। কারো কারো মতে, এমন জোট গঠনের প্রশ্নে কাছাকাছি চলে আসাতে ইসলামী আন্দোলনের অনেক প্রভাবশালী নেতাকর্মীরাও আপত্তি জানায়। এর পাশাপাশি তারা দলের ভেতরে ফুসতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। জোট গঠন ও ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট ‘এক বাক্সে’ আনার ঘোষণা জামায়াতের সেসময় দৃশ্যমান আন্তরিকতা ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রলুব্দ করে ফেলে।
পশ্চিমাদের বাধা
কিন্তু একটি সূত্র জানায় একটি প্রতিবেশী দেশের পাশাপাশি পশ্চিমাদের বাধা আপত্তি জামায়াতকে বেকায়দায় ঠেলে দেয়। এদিকে ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট ‘এক বাক্সে’ আনার প্রক্রিয়া যখন জোরদার হতে থাকে তখন দেশে ঘটে যায় অনেক ধরণের ঘটনা। ‘ইনকিলাব মঞ্চের’ প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির মারা যাওয়ার পর দেশব্যাপী বিভিন্ন ধরনের তুলকালাম কান্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায় থেকে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য পশ্চিমাদের নজরে পড়ে। এসময় দফায় দফায় জামায়াতেরই শীর্ষ নেতাদের সাথে মার্কিন যুক্তহরাষ্ট্রসসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের কূটনীতিকদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কারো কারো মতে, এসব বৈঠকে ‘ইনকিলাব মঞ্চের’ প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির মারা যাওয়ার পরপর এর প্রতিবাদে সারাদেশে সহিংস ঘটনার ব্যাপারে জামায়াতকেই আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয়। তারা তাদের বক্তব্যে বোঝাতে চেষ্টা করে জামায়াত এধরনের ঘটনার সাথে মোটেই সম্পৃক্ত নয়। কিন্তু একটি সূত্র জানায়, জামায়াত নেতাদের বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারেনি পশ্চিমারা। কারো মতে, এরই ফলশ্রুতিতে বলা যায় পশ্চিমাদের চাপে জামায়াত জোট গঠন ও ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট ‘এক বাক্সে’ আনার প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়। এর বিনিময়ে নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকেও (এলডিপি) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোটে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এমনকি জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না বলে দলটির আমিরের সাথে দেখা করার পর গণমাধ্যমকে এমনটাই জানান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কিংবা জুলাই বিপ্লবের সৈনিককে কাছে টেনে নেওয়া নয়, পশ্চিমাদের চাপে পরে নিজেদের মডারেট ইসলামী দল বলে জাহির করতেই জামায়াতে ইসলামীর এই ধরণের তৎপতরতা। কিংবা ইসলামী আন্দোলনকে কাছে টেনে কৌশলে দূরে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে কাজ করেছে বলে অনেকের অভিমত। এতে করে একদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কে এখন আর প্রধান বিরোধী দলের স্বাদ নেওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হলো, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর পথ সুগম হলো। এখন সমানে দিনে দেখা যাবে কার কৌশল বাস্তবায়ত হয়। কারণ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কিন্তু একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকার খায়েশ ছিলো...।