প্রতীকী ছবি
ঘটনা শুরু হয়েছে বলা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জগন্নাথ হলকে কেন্দ্র করে। এই হল থেকেই চমক দেখানো শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যালঘু হিন্দুদের হল এটি। ডাকসু নির্বাচনে সবার দৃষ্টি ছিলো এই হলের আবাসিক হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্ররা কাকে ভোট দেয়? কারণ জগন্নাথ হল মানেই আওয়ামী ছাত্রলীগের। কিন্তু ২০২৪ সালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতে কারো কারো ধারণা ছিল হলটিতে এবার মিশ্র ভোট পড়তে পারে। সে-হিসাবে বিএনপি সমর্থিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের ভোট বাক্সে হিন্দু ছাত্রদের কিছু ভোট পড়বে। কারণ হলটিতে ভোট টানতে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। বলা যায় ডাকসু নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পেতে ছাত্র শিবিরের হেন কাজ নাই যে করেনি। তাই শিবির নেতাদের মধুর কণ্ঠের আহবানে হয়তোবা জগন্নাথ হলের হিন্দু ছাত্ররা তাদেরকেই ভোট দেবে। কিন্তু নির্বাচনের পর ফলাফলে দেখা গেলো পুরো হিসাবই পাল্টে গেলো। কেননা এই হল-ই নয় সারা বাংলাদেশের মানুষই জানের ১৯৭১ সালের পাক বাহিনীর নির্মমতা। তারা এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘুণাক্ষরেও ভুলে যায়নি ওই সময়ের বর্বরতার শিকারদের মুখে ইতিহাস শুনে। এজন্য তারা ডাকসু নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই জামায়াতে ইসলামীর আর্দশের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে বেছে নেয়নি। শুধু তা-ই নয় এতোদিন সদ্য পতিত আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা মনে করতো যে জগন্নাথ হলটি তাদেরই, হিন্দু ভোট মানেই ছাত্রলীগ। কিন্ত এবারে সে-ধারণাও পাল্টে গেলো। হলটিতে মোট ভোটার দুই হাজার ২২৫ জন। ফলাফলে দেখা গেলো ডাকসু নির্বাচনে জগন্নাথ হলে সহসভাপতি (ভিপি) পদে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন ছাত্রদলের প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান। সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিরোধ পর্ষদ প্যানেলের মেঘমল্লার বসু এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ছাত্রদলের প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। এই কেন্দ্রে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভিপি ও জিএস প্রার্থীরা সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছেন। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায় যে, জগন্নাথ হলে ভিপি পদে ছাত্রদলের প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান ১ হাজার ২৭৬ ভোট পেয়েছেন। এই পদে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের উমামা ফাতেমা ২৭৮ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীম হোসেন ১৭১ ভোট এবং বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী আব্দুল কাদের পেয়েছেন ২১ ভোট। আর অন্যদিকে এই কেন্দ্রে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভিপি প্রার্থী মো. আবু সাদিক ওরফে সাদিক কায়েম ১০ ভোট পেয়েছেন। প্রতিরোধ পর্ষদ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী তাসনিম আফরোজ ইমি পেয়েছেন ১১ ভোট। জগন্নাথ হলে ডাকসুর জিএস পদে মেঘমল্লার বসু সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ১৭০ ভোট পেয়েছেন। একই পদে ছাত্রদলের প্রার্থী তানভীর বারী হামিম ৩৯৮ ভোট পেয়েছেন। এই পদে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন আরাফাত চৌধুরী। তিনি পেয়েছেন ১৬৯ ভোট। এই হলে জিএস পদে শিবিরের প্রার্থী এস এম ফরহাদ পেয়েছেন ৫ ভোট। আর বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের আবু বাকের মজুমদার পেয়েছেন ২৭ ভোট।
একই প্রবণতা জাতীয় নির্বাচনেও
এদিকে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলো। এতে দেখা গেলো জামায়াত-এনসিপির দুই সংখ্যালঘু প্রার্থীই পরাজিত হয়ে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৭৯ জন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল বলে জানা গেছে। এর মধ্যে যে চার প্রার্থী জয়লাভ করেছেন তারা সবাই জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে মনোনীত ছিলেন। বিএনপি এবার ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ছয় ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজন পরাজিত হয়েছেন। তারা হলেন বাগেরহাট-১ আসনের কপিল কৃষ্ণ মন্ডল ও বাগেরহাট-৪ আসনের সোমনাথ দে। এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৭৯ জনের মধ্যে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের ২২টি দল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ৬৭ জনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। এর বাইরে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ১২ জন প্রার্থী নির্বাচন করেন। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায় যে, নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি একজন করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী দিয়েছিল। তারা দুজনই পরাজিত হয়েছেন। তারা হলেন খুলনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী এবং মৌলভীবাজার-৪ আসনে এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাশ। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায় যে, খুলনা-১ আসনে বিএনপির আমির এজাজ খান পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিন্ধদ্বী কৃষ্ণ নন্দী পান ৭০ হাজার ৩৪৬ ভোট। ভোটের ব্যবধান ৫১ হাজার ৬। এই আসনে পোস্টাল কেন্দ্রসহ মোট কেন্দ্র ছিল ১২০টি। এখানে তৃতীয় অবস্থানে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবু সাঈদ। তিনি পেয়েছেন ৫ হাজার ৬১৯ ভোট। এছাড়া, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী। যেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী প্রীতম দাশ পেয়েছেন চার হাজার ২৭৫ ভোট। অন্যদিকে, ঢাকা-৩ আসন থেকে জয় পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্ররায়, মাগুরা-২ আসনে জয়ী হন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী। বান্দরবান থেকে জয়লাভ করেন বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাচিং প্রু। রাঙ্গামাটি আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করেন দীপেন দেওয়ান।
কেনো এমন হলো
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে ভোট পড়াটা ফলাফলের পর একে অনেকেই একে স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন। কেননা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বর্বরোচিত ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালায়। অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসেবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও উপজাতি শিক্ষার্থীদের এই আবাসিক হলে নির্বিচারে ঘুমন্ত ছাত্র-শিক্ষক এবং কর্মচারিদের হত্যা করা হয়। অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাসহ বহু মানুষ এতে শহীদ হন। এবং ইতিহাস থেকে জানা যায় হল প্রাঙ্গণকে মরণফাঁদে পরিণত করা হয়েছিল যা আজ ভুলতে পারে না কেউ। তাই এই হলে ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল এমনটাই হবে বলে অনেকের অভিমত। তবে হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আওয়ামী ছাত্রলীগকে-ই সব নির্বাচনে বেছে নেওয়ার প্রবণতা থেকে সড়ে আসাকে অনেকে বিস্ময়কর বলে মনে করেন। এক্ষেত্রে ঠিক এই সময়ে বিএনপি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শক্তভাবে বুকে ধারণের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ভূমিকাকে জগন্নাথ হলের হিন্দু ছাত্রদের আকৃষ্ট করেছে। কেননা এতোদিন ছাত্রদলকে মনে করা হতো এটি একটি হিন্দু বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের সমর্থক ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তা-ই কারো কারো মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু ভোটাররা তাদের নিজস্ব স্বার্থ বা আওয়ামী প্রীতি থেকে সড়ে দাড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অসাম্প্রদাযিক বাংলাদেশের পক্ষেই ভোট দিয়েছে।
নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের কি হলো? ক্ষুব্ধ জামায়াত, উদ্বিগ্ন আ.লীগও
প্রশ্ন হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘুরা কেনো বিএনপির প্রায় সব প্রার্থীদের বিজয়ী করলো? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এবার ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ছয় ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজন পরাজিত হয়েছেন। অন্যদিকে নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি একজন করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী দিয়েছিল। তারা দুজনই পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু কেনো এতো প্রচারণা আকর্ষণ সৃষ্টির পরেও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন? জামায়াত হেন আশ্বাস নাই যে তাদেরকে দেয়নি। সংখ্যালঘু সম্প্রদাদের প্রতি জামায়াতের আকর্ষণ রীতিমত সবাইকে আবাক করে দেয়। এনিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের জল্পনা-কল্পনার শেষ ছিল না। কারো কারো মতে, নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে অতি বাড়াবাড়ির পাশাপাশি নানান ধরনের প্রলোভনের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কারো কাছেই বিষয়টি গ্রহণীয় হয়ে উঠেনি। এটা তাদের আত্মসম্মানে লেগেছিল যে টাকা কড়ির বিনিময়ে হয়তবা সংখ্যালঘুরা এবারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জলাঞ্জলি দিতে যাচ্ছে। তাছাড়া যদিও বলা হয়ে থাকে নির্বাচনেও টাকাই সব? সে হিসাব মেলালেও হিন্দুদের ভোট নিয়ে নানান কথা শোনা যায়। দেখা গেছে এবারের ভোটে হিন্দু ভোটাররা টাকা কিংবা নিজেদের ধর্মকেও গুরুত্ব দেয়নি। তারা গুরুত্ব দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আসলে কে উপহার দেবে? কে হিন্দুদের বুকে ধারণ করে জানিয়ে দেবে তারা-ও বাংলাদেশের নাগরিক, যা প্রাশ্চাত্যে হয়ে থাকে। এমন আস্থার জায়গায় এবার বিএনপি হিন্দু প্রার্থীরা আশ্বস্ত করতে পেরেছেন বলেই কারো কারো ধারণা। এমন আস্থার জায়গা তৈরি করতে পেরেই বিএনপির ভোট বাক্সে সংখ্যালঘুদের মনকে কাছে টানতে পেরেছ বলে কারো কারো বিশ্লেষণ। যদিও নির্বাচনে আগে জামায়াতের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ মুক্তিযুদ্ধে চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বিশ্বাসীদের প্রতি একটি বার্তা দেওয়া হয়। এই বার্তায় দলটি জানায় যে, ‘জামায়াত প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থি ইসলামী রাজনৈতিক দল-যা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিল রেখে নিজেদের নীতিগুলো ক্রমাগত পরিমার্জন করেছে। আমরা সবসময়ই গণতান্ত্রিক ও জনমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তবে এসব বক্তব্যে কাজ দেয়নি। কারো কারো বিশ্লেষণ হচ্ছে ইসলামপন্থী রাজনীতির মধ্যে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এখনো অনুপস্থিত, যা মতাদর্শিক আধিপত্যের ধারণা থেকে নিজেকে পৃথক করে বহুত্বের মধ্যস্থতাকারী কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এমতে বিশ্বাসীদের তাই অভিমত, জামায়াত যদি ভোটের রাজনীতিতে বিজয়ী হতে চায়, তাকে ইসলামপন্থী রাজনীতির আদর্শগত ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে আমলে নিতে হবে। হয় ইসলামপন্থী রাজনীতিকে এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যা বহুত্বকে ধারণ করতে পারে অথবা ইসলামপন্থী রাজনীতি পরিত্যাগ করে জামায়াত নিজেকে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
ক্ষুব্ধ জামায়াত
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,ডাকসুর পরে এভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জামায়াত এনসিপিকে জামায়াতকে আস্থায় নিতে না পারায় তারা ক্ষুব্ধ। এখন একে তারা নানা কায়দায় ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় প্রতিটি সেক্টরে জামায়াত এখন সংখ্যালঘুদের প্রতি নজরদারি বাড়িয়েছে। বলা যায় এগুলো তাদের ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়ার অংশ।
উদ্বিগ্ন আওয়ামী লীগ
এদিকে এতোদিন আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে রাখতো যে মুক্তিযুদ্ধে চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিশ্বাসীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল হচ্ছে তারা। আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পর থেকে দেশে বিদেশে প্রচার করে বেড়াতো যে তারাই একমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভরসাস্থল। এবারের ডাকসু নির্বাচনের পাশাপাশি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সে ধারণা পাল্টে গেছে যা আওয়ামী লীগের শীর্ষমহলকে নাড়া দিয়েছে। কারো মতে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর বিভিন্ন সময় হামলার ব্যাপারে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের যোগসাজশের প্রমাণ মিলেছে। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায় কুমিল্লাসহ কয়েকটি জেলায় পূজামন্ডপে হামলা ভাংচুরের মধ্যে সেসময়ে ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ ইন্দনকে অনেকে অভিযোগ করেছে। এছাড়া মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২১ একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরে। এতে তারা দেখায় যে প্রায় নয় বছরে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ৩ হাজার ৬৭৯টি হামলা হয়েছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত ওই পরিসংখ্যানে আইন ও সালিশ কেন্দ্র-আসকের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন আমলে উঠে আসে ভয়াবহ তথ্য। এতে দেখা যায় যে, ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট বছর নয় মাসে হিন্দুদের উপর ৩ হাজার ৬৭৯টি হামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৫৯টি বাড়িঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। এই সময়ে হিন্দুদের ৪৪২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর ও আগুন দেওয়া হয়েছে। প্রতিমা, পূজামন্ডপ, মন্দিরে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৬৭৮টি। এসব হামলায় আহত হয়েছে ৮৬২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। নিহত হয়েছে ১১ জন। এর বাইরেও ২০১৪ সালে দু’জন হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হন। শ্লীলতাহানি করা হয় আরও চারজনের। এছাড়া ২০১৬, ২০১৭ ও ২০২০ সালে ১০টি হিন্দু পরিবারকে জমি ও বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে দখলের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেও এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হতাশ করেছে।
সংখ্যালঘুরা বিকল্প খুঁজছিলো
কারো কারো অভিমত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিভিন্ন সময়ে এর বিরুদ্ধে তাদের মতামত জানানোর সুযোগ খুঁজছিলো। বলা যায় একটি বিকল্প ব্যবস্থা বা দল খুঁজতে থাকে। কারো কারো মতে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর বিএনপির তৃণমূল থেকে শীর্ষ মহল পর্যন্ত মুক্ত পরিবেশের গ্যারান্টি পেয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আশ্বস্ত হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, বা মত পাল্টে ফেলে। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এমন মত পাল্টানোর হিসাব নিকাশে আ.লীগ বিব্রত ও উদ্বিগ্ন। তবে জামায়াত কিংবা আ. লীগের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এমন সাহসী সিদ্ধান্ত বা মতামত ধরে রাখতে বিএনপিকে সর্তক থাকতে হবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। কারণ তাদের পক্ষ থেকে সড়ে যাওয়া ভবিষ্যতে জামায়াতসহ এ দল দু’টি থেকে নানান ধরনের উস্কানি ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন অনেকে। এবিষয়কে সামনে রেখে বিএনপিকে পথ চলতে হবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত।