১৬ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০২:৪৮:১৭ পূর্বাহ্ন


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-১৯
বার্গেনের ব্রিগেল
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৫-০৭-২০২৬
বার্গেনের ব্রিগেল বার্গেনের সারি সারি কাঠের বাড়ি


উত্তর ইউরোপের সমুদ্রবেষ্টিত দেশ নরওয়ের পশ্চিম উপকূলে আছে এক প্রাচীন বন্দরনগরী-বার্গেন (Bergen)। পাহাড় ও ফিয়র্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এ শহর শত শত বছর ধরে ছিল উত্তর ইউরোপের বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আর সে ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর স্মারক হলো পুরোনো কাঠের ঘরের সারি-ব্রিগেল (Bryggen)।

এ ঐতিহাসিক বন্দরঘাটকে তার অসাধারণ ঐতিহ্যের জন্য ইউনেস্কো ১৯৭৯ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। মধ্যযুগে বার্গেন ছিল উত্তর ইউরোপের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার বন্দরে নোঙর করত জার্মানি, ডেনমার্ক ও ইংল্যান্ড থেকে আসা অসংখ্য জাহাজ। ১৪শ শতকে জার্মান ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সংগঠন Hanseatic League এখানে তাদের বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। সে সময় থেকেই Bryggen-এর কাঠের ঘরগুলো গুদামঘর ও অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি হতো নরওয়ের বিখ্যাত শুকনো মাছ-কড ফিশ। আবার জার্মানি থেকে আসতো কাপড়, শস্য ও নানা বিলাসদ্রব্য। আজও Bryggen-এর রঙিন কাঠের ঘরগুলো সেই মধ্যযুগের বাণিজ্য জগতের গল্প শুনিয়ে যায়।

সকালের নরম আলোয় আমি Bryggen-এর দিকে হাঁটছি। সামনে সারি সারি রঙিন কাঠের ঘর-লাল, হলুদ, বাদামি। যেন রঙতুলির আঁচড়ে সাজানো কোনো পুরোনো চিত্রকর্ম। আমার সঙ্গে স্থানীয় এক গাইড-আন্না। তার চোখে নীল সমুদ্রের ঝিলিক। এ ঘরগুলো দেখলে মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে-আমি বললাম।

আন্না মৃদু হেসে বললো-ঠিক তাই। Bryggen আসলে একটা জীবন্ত জাদুঘর। এখানে দাঁড়ালে তুমি ৬০০ বছর আগের Bryggen দেখতে পারবে।

আমরা একটি সরু কাঠের গলিতে ঢ়ুকে পড়ি। দুই পাশে পুরোনো কাঠের দেয়াল। বাতাসে হালকা কাঠের গন্ধ। আন্না বললো-এখানে একসময় জার্মান ব্যবসায়ীরা থাকতো। তারা খুব কঠোর নিয়মে জীবন কাটাতো। এমনকি রাতে আলো জ্বালানোরও নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল। কারণ কাঠের শহরে আগুন লাগার ভয় ছিল সবসময়।

Bryggen-এর সামনে সমুদ্রের নীল জল। বন্দরে ভাসছে ছোট ছোট নৌকা। আমি জিজ্ঞেস করলাম-এ জায়গা নিয়ে কি কোনো প্রেমের গল্প আছে? আন্না একটু হেসে বললো-অবশ্যই আছে। অনেক নাবিক মাসের পর মাস সমুদ্রে কাটিয়ে এখানে ফিরতো। তখন এই বন্দরে তাদের অপেক্ষা করত প্রিয় মানুষরা। আমি মজা করে বললাম-তাহলে এই বন্দরে নিশ্চয়ই অনেক পুনর্মিলনের গল্প আছে। সে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললো-হয়তো এখনো আছে। কারণ Bryggen-এ প্রেমও একটু সমুদ্রের মতো-গভীর আর ধীর। তার কথা শুনে মনে হলো Bryggen শুধু কাঠের ঘরের সারি নয়-এটা মানুষের স্মৃতি আর

আবেগেরও একটি বন্দর।

আন্না বললো-Bryggen-এর ইতিহাসে আগুনের গল্পও আছে। কয়েক শতাব্দীতে বহুবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই এলাকা ধ্বংস হয়েছে। সবচেয়ে বড় আগুন লাগে ১৭০২ সালে, যখন প্রায় পুরো Bryggen শহরই পুড়ে যায়। তবুও মানুষ আবার একই ধাঁচে ঘরগুলো তৈরি করে। কারণ Bryggen শুধু একটি বাজার নয়-এটি ছিল শহরের পরিচয়। আজ আমরা যে রঙিন কাঠের ঘরগুলো দেখি, সেগুলোর অনেকগুলোই সেই পুনর্নির্মাণের ফল।

বিকেলের দিকে আমরা সমুদ্রের ধারে একটি ছোট ক্যাফেতে বসি। আন্না কফির কাপ হাতে দিয়ে বললো-Bryggen-এ খুব বৃষ্টি হয়। কিন্তু মানুষ বলে, বৃষ্টি না হলে এ শহর এত সবুজ হতো না। আমি কফিতে চুমুক দিয়ে বললাম-আজ তো বৃষ্টি নেই। তাই হয়তো শহরটা আরো সুন্দর লাগছে।

আন্না হাসলো। হয়তো তুমি এসেছো বলেই আজ রোদ উঠেছে। আমরা দুজনেই হেসে উঠি। দূরে বন্দরের জলে তখন সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে।

Bryggen-এর কাঠের ঘরগুলো যেন ইতিহাসের পাতায় দাঁড়িয়ে থাকা রঙিন স্মৃতি। এখানে সমুদ্রের হাওয়া, পুরোনো বাণিজ্যের গল্প, নাবিকদের অপেক্ষা আর মানুষের আবেগ-সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য ঐতিহ্য। হয়তো সেই কারণেই ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে।

Bryggen থেকে বিদায় নেওয়ার সময় মনে হলো-

কিছু শহর শুধু চোখে দেখা যায় না, হৃদয়ের ভেতরেও থেকে যায়। আর Bryggen শহর তাদেরই একটি।

শেয়ার করুন