সজীব ওয়াজেদ জয়
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট থেকে বিরত থাকার আহবান জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জয়ের আহবান কি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমলে নেবে? না-কি গোপনে রাগে ক্ষোভে কিংবা নানান ধরনের লোভে পরে আঁতাত করে চলবে?
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে শেষ হয়ে গেছে গত সোমবার। গত ১০ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে আর কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে কেউ প্রচারণা চালাতে পারবেন না। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট গ্রহণ চলবে। এদিকে নির্বাচনের একসপ্তাহ আগে বাংলাদেশকে বাঁচানোর কথা বলে ভোট বর্জনের ডাক দিয়েছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। এতে জয়ের বক্তব্যের চুম্বক অংশ হলো, ‘এই নির্বাচন শুধুমাত্র একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার বৈধতা তৈরির চেষ্টা। তাই ভোট থেকে বিরত থাকাই বাংলাদেশের মানুষের জন্য শেষ সুযোগ। তিনি আরও বলেন, “আপনারা কেউ ভোট দিতে যাবেন না। ভোট না দিলে এই নির্বাচন সফল হবে না। জামায়াত থেকে বাঁচতে চাইলে এটাই লাস্ট চান্স।” এর পরে তিনি আরও বলেন, এটা কোনও নিয়মমাফিক নির্বাচন নয়, এটা সাজানো নাটক। রেজাল্ট আগেই নির্ধারিত। আপনারা ভোট দিতে গেলে অন্যায়কে সমর্থন করবেন।
কে শুনবে জয়ের কথা?
২০২৪ সাখে জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনে পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতির কাছে যে আহবান জানিয়েছে তা কতটা তাদের দলের পাশাপাশি দেশবাসী কতটা আমলে নেবে তা-নিয়ে জল্পনা কল্পনার শেষ নেই।
আওয়ামী লীগের পাশে আসলেই কেউ নেই
কারো কারো মতে, সজীব ওয়াজেদ জয় যখন এই আহবান জানাচ্ছেন তখন মাঠ পর্যবক্ষেণ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বক্তব্য হলো, ২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পরে দেশ ছেড়ে তাদেরকে একা অসহায় অবস্থায় ফেলে গেছেন মহাপরাক্রমশালি সভাপতি শেখ হাসিনা। বেশ কয়েকজন প্রভাবশালি নেতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কয়েকলাখ বিত্তশালী সক্রিয় কর্মী-ও বিপুল পরিমাণে অর্থ নিয়ে দেশ ছেড়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেছেন। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আছেন, যারা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেতরে কোনো রকমে টিকে থাকা নেতাকর্মীদের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামার জ্বালাময়ী আহবান জানিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকজন আওয়ামী লীগের নেতা এই প্রতিনিধিকে বলেন, যারা দেশের বাইরে বসে এখন মহাবিপ্লবীর ভূমিকা নিচ্ছেন তারা বাংলাদেশের বর্তমান নেতাকর্মীদের গত সতের মাসে কোনো ধরনের সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। তাই দেশ থেকে অঢেল টাকা পয়সা নিয়ে দেশের বাইরে বসে নির্দেশ দিলে তাদের কথা কে শুনবে। কিন্তু তারা জানে না ১৫ বছর ধরে বিএনিপ’র বিরুদ্ধে নিপীড়ন নির্যাতনের বুলডোজার চালানো হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বর্তমানে সে-ই বিএনপির প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্য সহযোগিতা সহমর্মিতায় বাংলাদেশে থাকা আওয়ামী লীগের ত্যাগি অসহায় নেতাকর্মীরা এখন কোনো রকমে টিকে আছে।
আন্তর্জাতিকমহলও পাশে নেই
এদিকে কারো কারো বিশ্লেষণ হচ্ছে সজীব ওয়াজেদ জয় যখন ভোট বর্জনের এমন আহবান জানাচ্ছেন তখন দেখা গেছে আন্তজাতিকমহলও আওয়ামী লীগের পক্ষে নেই। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের জন্য ‘সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণকে’ আর শর্ত হিসেবে দেখছে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত শব্দ দুটির নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইয়াবস। ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক ইয়াবস বলেছিলেন, নির্বাচনে সমাজের সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এর মূল কথা। এতে ইভার্স ইয়াবস বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দৃষ্টিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলতে প্রথমেই বোঝায়-বাংলাদেশের সব সামাজিক গোষ্ঠীর নাগরিকদের অংশগ্রহণ। যেমন নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।’ সম্প্রতি ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই ব্যাখ্যা দেন তিনি। ফলে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের পাশে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একটি বড়ো অংশই ইতোমধ্যে বেকে বসেছে। এখানে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তি সজীব ওয়াজেদ জয়ের কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।
তরুণরা কি শুনবে জয়ের ডাক?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার বড়ো ধরনের ফ্যাক্টর হচ্ছে তরুণ ভোটার। যারা দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ আমলে দেখেছে কিভাবে ভোটের নামে ৭১’এ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দলটি তাদের সাথে ভোটের নামে তামাশা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে আওয়ামী লীগেরও তরুণ ভোটাররা ভোট দিতে পারেনি। দেশে এবার তরণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। এই তরুণ ভোটাররা দেখেছে .কোটা সংস্কারের দাবি থেকে সরকারের পদত্যাগের এক দফার আন্দোলন। একদিকে সরকারের বল প্রয়োগ, অন্যদিকে ছাত্র জনতার অনড় অবস্থান। তারা দেখেছে জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আন্দোলন ঘিরে এত প্রাণহানি ও রক্তপাতের ঘটনা দেখা যায়নি। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাতে নিহতের সংখ্যা বলা হচ্ছে প্রায় ১৪০০ জন। এমন নির্মম মৃত্যু দেখা তরুণরা কি এখন জয়ের কথায় হুড়মুড় করে ভোট বর্জনের দিকে যাবে? আর যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জয় ওই আহবান জানাচ্ছেন সে-ই তরুণরা-ও কি তাদের আমলে ভোট দিতে পেরেছিলেন? এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক রিপোর্টেও উল্লেখ করেছে যে, ২০০৯ সালের পর একে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হিসাবে দেখা হচ্ছে। তাদের ভাষায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর কোনো কার্যকারিতাই ছিল না। কখনো ভোট বর্জন, কখনো শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের মাধ্যমে তাদের দমন করা হতো। তবে এবার পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। রিপোর্টে আরও বলা হয় ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক তরুণ মনে করছেন, বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন।
শেষ কথা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। অতীতে অনেক দলকে নিষিদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি সে কথা হয়তবা ঠিক। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে ক্ষতও এতো তাড়াতাঢ়ি শুকিয়ে গেছে তা-ও বলা যাবে না বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। তা-ই ভবিষ্যতে কি হয় তা প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দিতে হবে এমন ভরসা নিয়েই আপাতত আওয়ামী লীগকে সামনের দিনগুলি গুণতে হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রজন্মকে অন্তরের অন্তস্থলে স্থান করে দিতে নতুন পরিকল্প্ননা নিয়ে অবশ্যই মাঠে নামতে হবে। আবারও একঝাক ত্যাগি নেতাকর্মী কর্মী তৈরি করতে হবে। তারপরে তাদের প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবা তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বা অন্য কেউ কোনো ত্যাগ স্বীকারে আহবানে জানালে ভালো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে। তা-ই ভোট বর্জন কিংবা কোনো ধরনের নাশকতায় দলটিকে না জড়িয়ে আবারও একটি বিশাল আদর্শবান নেতাকর্মী তৈরির কাজের মন:নিবেশই করাই শ্রেয় বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।