মিনিয়াপোলিসে সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তারা একটি বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করছেন।
মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে গত মাসের এক সহিংস ঘটনার বর্ণনা নিয়ে অসত্য বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে দুই ফেডারেল ইমিগ্রেশন এজেন্টকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে ইউ এস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের অ্যাকটিং ডিরেক্টর জানান, তদন্ত শেষে তাদের চাকরিচ্যুত করা হতে পারে এবং ফৌজদারি অভিযোগও আনা হতে পারে। তিনি বলেন, শপথের অধীনে মিথ্যা বলা গুরুতর ফেডারেল অপরাধ। বিষয়টি তদন্ত করছে মিনেসোটার ইউএস অ্যাটর্নির দফতর।
ঘটনার জেরে আনা ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদন করার দুদিন পরই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ভেনেজুয়েলার নাগরিক জুলিও সিজার সোসা-সেলিস ও আলফ্রেডো আলেহান্দ্রো আলহর্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তারা একটি ঝাড়ুর লাঠি ও তুষার সরানোর কোদাল দিয়ে এক আইসিই কর্মকর্তাকে আক্রমণ করেছেন। ১৪ জানুয়ারির ওই ঘটনায় সোসা-সেলিস উরুতে গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাটি ঘটে মিনিয়াপোলিসে রেনি গুডের প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের কয়েক দিনের মধ্যে, যা স্থানীয়ভাবে বিক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। মিনেসোটার ইউএস অ্যাটর্নির দফতর আদালতে দাখিল করা আবেদনে জানায়, নতুন প্রাপ্ত প্রমাণ প্রাথমিক শুনানির সাক্ষ্য ও ১৬ জানুয়ারি দাখিল করা এফবিআই হলফনামার সঙ্গে ‘গুরুতরভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।’ তাই অভিযোগ ‘উইথ প্রেজুডিস’ খারিজের আবেদন করা হয়, অর্থাৎ একই অভিযোগ পুনরায় আনা যাবে না। শুক্রবার বিচারক সে আবেদন মঞ্জুর করেন।
সোসা-সেলিসের আইনজীবী রবিন ওলপার্ট সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘অসাধারণ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তার মক্কেল স্বস্তি পেয়েছেন এবং আইসিই কর্মকর্তার কথিত বেআইনি আচরণের জবাবদিহি চান। আলহর্নার আইনজীবী ফ্রেডেরিক গেটজ বলেন, অভিযোগ খারিজে তার মক্কেল ‘অত্যন্ত আনন্দিত’ এবং চলমান যেকোনো তদন্তে সহযোগিতা করবেন। হেনেপিন কাউন্টি অ্যাটর্নির দফতর ও মিনেসোটা ব্যুরো অব ক্রিমিনাল অ্যাপ্রিহেনশনও আলাদা তদন্ত চালাচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ এজেন্টদের পরিচয় বা ঠিক কোন বক্তব্য মিথ্যা ছিল তা প্রকাশ করেনি। ইউএস অ্যাটর্নির দফতরে দাখিল করা এফবিআই হলফনামায় অভিযোগ ছিল, অভিযুক্তরা জোরপূর্বক এক ফেডারেল কর্মকর্তাকে আক্রমণ ও বাধা দিতে সহায়তা করেছেন। তবে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)-এর প্রাথমিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বিবরণ ও হলফনামার বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে। কে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং কতজন হামলায় জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে অসামঞ্জস্য দেখা যায়।
ডিএইচএস জানায়, এক ভেনেজুয়েলান নাগরিককে লক্ষ্য করে ‘টার্গেটেড ট্রাফিক স্টপ’ পরিচালনা করা হচ্ছিল। তিনি পালিয়ে গিয়ে একটি পার্ক করা গাড়িতে ধাক্কা দেন এবং পরে এক কর্মকর্তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। তখন নিকটবর্তী অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দুজন বেরিয়ে এসে কোদাল ও ঝাড়ুর লাঠি দিয়ে কর্মকর্তাকে আক্রমণ করেন বলে দাবি করা হয়। আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়া হয়েছে বলে এমনটিই জানায় ডিএইচএস।
অন্যদিকে এফবিআই হলফনামায় বলা হয়, লাইসেন্স প্লেট যাচাই করে গাড়িটির নিবন্ধন অননুমোদিতভাবে অবস্থানরত এক ব্যক্তির নামে পাওয়া যায়। চালক পালিয়ে গেলে এজেন্টরা ধাওয়া করেন; গাড়ি দুর্ঘটনার পর ধস্তাধস্তির সময় একজন ঝাড়ুর লাঠি দিয়ে আঘাত করেন এবং আরেকজন কোদাল ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ। আলো স্বল্পতার কারণে দৃশ্যমানতা কম ছিল বলেও হলফনামায় উল্লেখ আছে। সিসিটিভিতে আংশিক ফুটেজে আঙিনায় কোদালধারী একজনকে ও বাড়ির দিকে দৌড়ে যাওয়া আরেকজনকে দেখা যায়, তবে ক্যামেরার সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো ঘটনা ধরা পড়েনি।
গ্রেফতারের পর সোসা-সেলিস কোদাল হাতে থাকার কথা স্বীকার করলেও ব্যবহার অস্বীকার করেন; আলহর্না বলেন, তিনি দৌড়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার সময় ঝাড়ু ছুড়ে দিয়েছিলেন। তিনি আরো জানান, গাড়িটি পাঁচ মাস আগে কিনেছিলেন কিন্তু মালিকানা হস্তান্তর সম্পন্ন করেননি।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন মিনিয়াপোলিসে চলমান ইমিগ্রেশন সার্জ বা বিশেষ অভিযান সমাপ্তির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের পর এই অভিযান তীব্র সমালোচনা ও ফেডারেল কর্তৃপক্ষকে এলাকা ছাড়ার দাবির মুখে পড়ে। ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-এর অভিযানে বলপ্রয়োগ ও তথ্যভিত্তিক অসামঞ্জস্যের অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে এবং ফেডারেল সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরো তীব্র করেছে। সীমান্ত সিজার টম হোম্যান ঘোষণা করলেন মিনেসোটার অভিবাসন অভিযান সমাপ্তি।
মিনিয়াপোলিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিতর্কিত অভিবাসন অভিযান গত বৃহস্পতিবারশেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন বর্ডার সিজার টম হোম্যান । যদিও সাম্প্রতিক সপ্তাহে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে দুই মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, হোম্যান অভিযানকে বৃহৎ সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেছেন।হোম্যান বলেছেন, আমরা সফল হয়েছি এবং আমরা মিনেসোটাকে আরো নিরাপদ করে রেখে যাচ্ছি।’ তিনি জানান, অভিযানের সময় অন্তত ৪,০০০ অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারীদের সঙ্গে উত্তেজনা কমেছে।টম হোম্যান জানিয়েছেন, ট্রাম্প মিনেসোটায় প্রায় ২ হাজার আইস ও বর্ডার প্যাট্রোল কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের অনুমোদন করেছেন। এর ফলে দেশান্তর কার্যক্রম আবার স্থানীয় ফিল্ড অফিসের নিয়ন্ত্রণে ফিরবে। হোম্যান আরো বলেন, অপারেশন মেট্রো সার্জ শেষ হচ্ছে। আমরা এখনো অভিবাসন আইন প্রয়োগ করবো, তবে আমাদের অগ্রাধিকার থাকবে অপরাধীদের ক্ষেত্রে। হোম্যান ট্রাম্পকে প্রশংসা করে বলেন, অভিবাসী বহিষ্কার অভিযান দেশব্যাপী এবং মিনেসোটাতেও অব্যাহত থাকবে, যদিও জরিপ দেখায় এটি ক্রমেই জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে।
তবে কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনা, উত্তেজক বক্তব্য এবং স্থানীয় ডেমোক্র্যাটদের, প্রতিবাদকারীদের ও অভিবাসীদের প্রতি কটাক্ষকে বিবেচনা করলে এটি স্পষ্টভাবে হট-স্পট শহর থেকে প্রত্যাহারের বড় সংকেত। ডেমোক্র্যাটরা দ্রুত এই মুহূর্তকে বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেন্টার এ্যামি ক্লোবুশার (ডেমোক্র্যাট-মিনেসোটা), যিনি গভর্নরের জন্য প্রার্থী, বলেছেন, মিনেসোটাররা একত্রিত হয়েছিল, আইসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল এবং কখনো হার মানেনি। জানুয়ারিতে ট্রাম্পের নির্দেশে প্রায় ৩ হাজার এজেন্ট মিনেসোটায় প্রবেশ করেন, যা ব্যাপক ব্যাঘাত ও তীব্র প্রতিরোধের সৃষ্টি করে। লিগ্যাল নিরাপত্তা প্রায় না থাকায়, মুখোশধারী এজেন্টরা অবৈধ অভিবাসীদের তল্লাশি চালান এবং প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
জানুয়ারি ৭ তারিখে একজন আইস কর্মকর্তা অশস্ত্র মোটরচালক রেনি গুডকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর জানুয়ারি ৩০ তারিখে দুই বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট প্রতিবাদকারী অ্যালেক্স প্রেট্টিকে হত্যা করেন, যিনি অন্য প্রতিবাদকারীকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। ফেডারেল কর্মকর্তারা এজেন্টদের সমর্থন জানিয়েছেন, নিহতদের ডোমেস্টিক টেররিস্ট আখ্যা দিয়েছেন এবং এখন পর্যৗল্প ট্রাম্প প্রশাসন কোনো স্বাধীন তদন্ত শুরু করেননি।
প্রাথমিকভাবে ট্রাম্প সংঘর্ষ থেকে সরে আসার সংকেত হিসেবে হোম্যানকে নিয়োগ দেন, যিনি পেশাদার অভিবাসন কর্মকর্তা, গ্রেগ বোভিনোর স্থলাভিষিক্ত হন, যিনি সমালোচকদের সঙ্গে সংঘর্ষকে উপভোগ করতেন। হোম্যান দ্রুত প্রায় ২৫শতাংশ এজেন্ট প্রত্যাহার করেন এবং অভিযানকে টার্গেটেড এনফোর্সমেন্টে মনোনিবেশ করতে নির্দেশ দেন, অর্থাৎ আইনত অপরাধী অভিবাসীদের গ্রেফতার করা, আইনগত অভিবাসীদের নয়।
প্রেস কনফারেন্সে হোম্যানের মিনিয়াপোলিসের মিশন সম্পন্ন প্রসঙ্গটি যখন আসে তখন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসনাল নেতারা হুমকি দিয়েছেন যে, ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা আইসের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে সম্মত না হলে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির জন্য ফান্ডিং বিল সমর্থন করবেন না। এ সংঘর্ষের ফলে গত শুক্রবারের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলে আংশিক সরকারি শাটডাউন ঘটার সম্ভাবনা বেড়েছে। সেনেট ডেমোক্র্যাটরা ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির জন্য স্টপগ্যাপ ফান্ডিং বিল ব্লক করেছেন, যা কোনো আইস সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করেনি।
সিনেটের মাইনরিটি লিডার চক শুমার ও হাউস মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফ্রিস হতাশা প্রকাশ করেছেন। শুমার বলেন, আমরা আইন প্রণয়ন প্রয়োজন যাতে আইসের নিপীড়ন শেষ হয়। প্রশাসন সত্যিই আইস সংস্কারের পক্ষপাতী নয়।