যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক নজরদারির জন্য এআই প্রযুক্তির ব্যবহার
যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত সুরক্ষার জন্য তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি এখন নীরবে দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ নাগরিকদের ওপর নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) ও ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) বিরুদ্ধে। নাগরিক অধিকারকর্মী ও আইনপ্রণেতারা এই প্রবণতাকে ‘মিশন ক্রিপ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। যেখানে সীমিত একটি উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে ব্যাপক ও নিয়ন্ত্রণহীন নজরদারিতে পরিণত হয়।
প্রথমে দক্ষিণ সীমান্তে অবৈধ অভিবাসন দমনে ব্যবহারের জন্য চালু হওয়া এআই প্রযুক্তি, যেমন ফেসিয়াল রিকগনিশন, বায়োমেট্রিক স্ক্যানিং, লোকেশন ট্র্যাকিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ, এখন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের শনাক্ত, গতিবিধি বিশ্লেষণ এবং সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক মানচিত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ডিএইচএসের ক্রয়সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইসিইর জন্য এআই-ভিত্তিক নজরদারি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দ্রুত বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ কোটি ডলার মূল্যের প্যালান্টি টেকনোলজিসের ইমিগ্রেশন ওএস, যা অভিবাসীদের রিয়েল টাইম ট্র্যাকিং ও তথাকথিত স্বেচ্ছা দেশত্যাগ পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা রাখে। ৪৬ লাখ ডলার ব্যয়ে বিআইটু টেকনোলজিসের আইরিস স্ক্যানিং স্মার্টফোন। সাত লাখ পঞ্চাশ হাজার ডলার মূল্যের ক্লিয়ারভিউ এআই ফেসিয়াল রিকগনিশন চুক্তি, যা আইসিইর ইতিহাসে এই প্রযুক্তিতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এসব প্রযুক্তি শুধু অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্য নয়, বরং বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেস একত্র করে ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগ, অবস্থান ও অতীত কার্যক্রম বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করে।
মিডিয়া ৪০৪-এর হাতে আসা অভ্যন্তরীণ ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, আইসিই কর্মকর্তারা রাস্তায় কিশোরদের মুখ স্ক্যান করে তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করছেন, যদিও তাদের কাছে কোনো পরিচয়পত্র ছিল না। ব্যবহৃত অ্যাপগুলোর একটি মোবাইল ফর্টিফাই, যা ডিএইচএস, এফবিআই ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডেটাবেসে থাকা ২০ কোটির বেশি ছবির সঙ্গে সংযুক্ত। এছাড়া মিনেসোটা পাবলিক রেডিও ও ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইসিই এমন সফটওয়্যারও ব্যবহার করছে যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নজরদারি ও লোকেশন ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বড় জনসমাবেশ, বিশেষ করে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। এসব প্রযুক্তি প্রথম সংশোধনী দ্বারা সুরক্ষিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইমিগ্র্যান্ট অধিকার কর্মীদের মতে, সীমান্ত সুরক্ষা ও অভিবাসন প্রয়োগের জন্য তৈরি এসব প্রযুক্তি এখন কার্যত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নজরদারির হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। আইসিইর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই) শাখা অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ ইস্যু তুলে দেশের ভেতরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের বৈধতা দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেন সতর্ক করে বলেছেন, এ প্রযুক্তিগুলো আইসিইকে এমন ক্ষমতা দিচ্ছে, যা আমেরিকানদের সাংবিধানিক অধিকার পদদলিত করতে পারে। ইলেকট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টার (ইপিক)-এর মারিয়া ভিলেগাস ব্রাভো প্রথম ও চতুর্থ সংশোধনী লঙ্ঘনের গুরুতর আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন।
এ উদ্বেগের প্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে সিনেটর এড মার্কি একটি আইন প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ডিএইচএস ও আইসিইর ফেসিয়াল রিকগনিশন ও অন্য বায়োমেট্রিক নজরদারি নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারের ওপর বাধ্যতামূলক নিরীক্ষা ও শক্তিশালী তথ্য-গোপনীয়তা আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে।
ডিএইচএস অবশ্য দাবি করছে, এসব প্রযুক্তি জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার ও আইনপ্রয়োগের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয়। তবে নাগরিক অধিকারকর্মীদের মতে, দক্ষতা ও নিরাপত্তার আড়ালে এক ধরনের সর্বব্যাপী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে সাধারণ মানুষই পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।ইমিগ্র্যান্ট অধিকার কর্মীরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন, এখনই যদি স্পষ্ট সীমারেখা, বিচারিক তদারকি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত না করা হয়, তবে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নামে শুরু হওয়া এই এআই নজরদারি ভবিষ্যতে পুরো সমাজের ওপর স্থায়ী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।