মিনেসোটায় দুই মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত জ্যাকি রাহম লিটল
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা স্টেটে দুইটি মসজিদে পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মিনেসোটার এডিনা এলাকার বাসিন্দা জ্যাকি রাহম লিটল (৩৯)-কে দোষী সাব্যস্ত করেছে ইউনাইটেড স্টেটস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ফর দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব মিনেসোটা। আদালত লিটলকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে সংঘটিত এই হামলাকে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ ঘৃণামূলক অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি পরপর দুই দিন মসজিদে আগুন দেন, যার ফলে মসজিদ ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আদালত বলেছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা কেবল ভবন ধ্বংস নয়, বরং পুরো সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও আস্থায় আঘাত। সাজা ভোগের পর তাকে তিন বছর পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে। প্রসিকিউটরদের দাবি, তার কর্মকাণ্ড ছিল উদ্দেশ্যমূলক এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে উদ্ভূত।
মামলার তদন্তে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল প্রথম হামলা হয় মিনিয়াপোলিস সিটির মসজিদ ওমর ইসলামিক সেন্টারে। দোষী লিটল মসজিদের বাথরুমে একটি কার্ডবোর্ড বাক্সে আগুন ধরিয়ে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একজন কর্মী ধোঁয়া দেখতে পেয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেন, ফলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়। তবে আগুন লাগার কারণে ভবনের কিছু অংশে ক্ষতি হয় এবং মসজিদে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
পরের দিন, ২৪ এপ্রিল তিনি আরও বড় আক্রমণ চালান ব্লুমিংটন সিটিতে অবস্থিত মসজিদ আল-রাহমা মসজিদে। ওই সময় মসজিদে প্রায় ৪০ শিশু একটি ডে-কেয়ার কার্যক্রমে ছিল এবং উপাসনার জন্য অনেকে উপস্থিত ছিলেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি তৃতীয় তলায় আগুন ধরিয়ে দেন। দমকলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভাতে সক্ষম হন, ফলে বড় বিপর্যয় এড়ানো যায়। তবে সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭৮,০০০ ডলার বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিচারক রায় ঘোষণার সময় বলেন, ধর্মীয় স্থানে হামলা সমাজে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। সাজা ছিল ফেডারেল নির্দেশিকার মধ্যবর্তী সীমায়। ৫ বছর ৪ মাস থেকে ৮ বছর ৬ মাসের মধ্যে। আদালত মনে করেছে, অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় এই সাজা যথাযথ।
প্রসিকিউটররা যুক্তি দিয়েছিলেন, উপাসনালয়ে হামলা শুধু ভবনের ক্ষতি নয়, বরং এটি পুরো সম্প্রদায়ের মানসিক নিরাপত্তায় আঘাত। তারা বলেন, যখন ধর্মীয় স্থান আক্রান্ত হয়, তখন মানুষের বিশ্বাস ও শান্তির অনুভূতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাজা ঘোষণার পর মুসলিম অধিকার সংস্থা কেয়ার এক বিবৃতিতে রায়কে স্বাগত জানায়। সংস্থাটি বলেছে, এই রায় ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের জন্য জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তাদের মতে, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় এমন বিচার অপরিহার্য।
আদালতের নথি ও চিকিৎসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,জ্যাকি রাহম লিটল বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভুগছিলেন, যা তার বিচারবুদ্ধি ও বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। তবে প্রসিকিউটররা উল্লেখ করেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলেও অপরাধের দায় এড়ানো যায় না।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, জ্যাকি রাহম লিটল অতীতে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এক মুসলিম নারীকে হয়রানি করেন এবং কুরআনের একটি ছবি টয়লেটে রাখা অবস্থায় তাকে পাঠান। পরে একই ধরনের ছবি পাঠানো হয় মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর-কে। এছাড়া ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি মিনিয়াপলিসে একটি অফিস ও পুলিশ গাড়িতে ‘৫০০’ লিখে স্প্রে-পেইন্ট করেন। এই সংখ্যার অর্থ এখনো স্পষ্ট নয়।
দোষী জ্যাকি রাহম লিটল শুধু ফেডারেল মামলায় নয়, স্টেট আদালতেও বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে পৃথক মামলা চলছে হেনেপিন কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট-এ, যা মিনেসোটার স্থানীয় আদালত। আগামী ২৫ মার্চ সেখানে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। ঘটনার কয়েক দিন পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় ম্যানকাটো শহরে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা বলেন, উপাসনালয়ে হামলা কেবল সম্পদের ক্ষতি নয়, বরং এটি মানুষের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় আঘাত। রায় ঘোষণার পর তারা সন্তোষ প্রকাশ করলেও ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
ইউ এস প্রসিকিউটর অফিস জানিয়েছে, ধর্মীয় স্থান সবার জন্য নিরাপদ হওয়া উচিত। তারা বলেন, আইনের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে কেউ ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে অপরাধ করতে সাহস না পায়।
মিনেসোটায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা বেড়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ধরনের ঘটনা সমাজে বিভাজন ও ভয় সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়ানোই এই সমস্যার সমাধান। এই ঘটনায় আদালতের রায় মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য ন্যায়বিচারের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু শাস্তি নয়, বরং সচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগও প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন হামলা প্রতিরোধ করা যায়।