ওরেগান স্টেট ডিটেনশন সেন্টার
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন স্টেটের মাল্টনোমাহ কাউন্টিতে দুই মুসলিম নারীর হিজাব জোরপূর্বক খুলে নেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। মাল্টনোমাহ কাউন্টি শেরিফ অফিস এ ঘটনায় বাদীদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং ক্ষতিপূরণসহ নীতিগত পরিবর্তনে সম্মত হয়েছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পোর্টল্যান্ডে একটি প্রতিবাদের সময় গ্রেফতার হওয়ার পর দুই বোন সেরিন আবুয়েলহাওয়া এবং মারজান্নাহ হাসানকে মাল্টনোমাহ কাউন্টি ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বুকিং প্রক্রিয়ার সময় তাদের ধর্মীয় হিজাব জোরপূর্বক খুলতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। মামলায় আরো বলা হয়, হিজাব ছাড়া তোলা তাদের ছবি এবং নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ একটি স্টেটব্যাপী ডাটাবেসে সংরক্ষণ করা হয়, যা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য উন্মুক্ত ছিল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কেয়ার ২০২৫ সালে মাল্টনোমাহ কাউন্টি শেরিফ অফিস এবং সংশ্লিষ্ট ডিটেনশন সেন্টারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মামলায় বলা হয়, এ পদক্ষেপ দুই নারীর ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে।
সমঝোতা অনুযায়ী, শেরিফ অফিস ৩০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছে এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন আনছে। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ধর্মীয় কারণে হিজাব পরিহিত নারী বন্দিদের হিজাব খুলতে হলে তা শুধুমাত্র নারী কর্মকর্তা দ্বারা এবং পুরুষদের দৃষ্টির বাইরে একটি পৃথক কক্ষে সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া বুকিংয়ের সময় দুটি ছবি তোলা হবে একটি হিজাবসহ এবং অন্যটি হিজাব ছাড়া। তবে হিজাব ছাড়া তোলা ছবি বিশেষ কারণ ছাড়া পুরুষ কর্মীরা দেখতে পারবেন না। প্রয়োজনে বন্দিদের জন্য নতুন হিজাব সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
মামলার বিবরণে উঠে আসে, গ্রেফতারের পর দুই বোনকে আলাদা করে রাখা হয় এবং বুকিংয়ের সময় পুরুষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাদের শরীরের অংশ উন্মুক্ত করা হয়, যা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছিল। তারা এই অভিজ্ঞতাকে অপমানজনক এবং মর্যাদাহানিকর বলে উল্লেখ করেন। মারজান্নাহ হাসান জানান, তাকে বারবার হিজাব খুলতে চাপ দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে তিনি বাধ্য হয়ে তা খুলতে সম্মত হন। এরপর তাকে প্রায় আট ঘণ্টা হিজাব ছাড়া অবস্থায় অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় তাকে খাবার হিসেবে হ্যাম স্যান্ডউইচ দেওয়া হয়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ হওয়ায় তিনি খেতে পারেননি।
অন্যদিকে সেরিন আবুয়েলহাওয়া প্রথমে হিজাব খুলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে একজন নারী কর্মকর্তা তাকে তল্লাশি করলেও সেই সময়ও পুরুষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তার শরীরের কিছু অংশ উন্মুক্ত হয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়। এক পর্যায়ে তাকে একটি আলাদা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি হিজাব খুলতে বাধ্য হন এবং কয়েক ঘণ্টা হিজাব ছাড়া থাকতে হয়। মামলায় আরো উল্লেখ করা হয়, এক কর্মকর্তা তাকে বলেন যে, জেলে আসার পর তার আর হিজাব পরার অধিকার নেই।
কেয়ারের ডেপুটি লিটিগেশন ডিরেক্টর গাদেইর আব্বাস এই ঘটনাকে মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সংস্থাটির জাতীয় লিটিগেশন ডিরেক্টর লেনা মাসরি বলেন, এ সমঝোতা শুধু ভুক্তভোগীদের জন্য নয়, বরং পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তিনি আরো বলেন, এখন মাল্টনোমাহ কাউন্টির মুসলিম নারীদের আর ধর্মীয় বিশ্বাস ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নির্দেশের মধ্যে বেছে নিতে হবে না। সেরিন আবুয়েলহাওয়াও তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এ আইনি লড়াই ভবিষ্যতে অন্যান্য মুসলিম নারীদের অধিকার রক্ষায় সহায়ক হবে বলে তিনি আশা করেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়, যদিও দুই বোনের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ পরে প্রত্যাহার করা হয়, তবুও তাদের বুকিং ছবি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ডাটাবেসে রয়ে যায়। তবে মামলা দায়েরের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই ছবিগুলো মুছে ফেলার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে কেয়ার জানায়।
শেরিফ অফিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা সব নাগরিককে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নতুন নীতিমালা সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনা এড়াতে তারা কাজ করে যাবে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কারাগার ও আটক কেন্দ্রে সাধারণত মুসলিম নারীদের হিজাব পরার অনুমতি দেওয়া হয়, এমনকি বুকিং ছবিতেও। এ ঘটনাটি তাই দেশজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
এ সমঝোতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। ধর্মীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত মর্যাদাকে সম্মান না করলে আইনি জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। একইসঙ্গে এটি ভবিষ্যতে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সংবেদনশীল নীতিমালা প্রণয়নের পথ সুগম করতে পারে।
পোর্টল্যান্ড জেলে মুসলিম নারীদের জন্য নতুন হিজাব নীতি : বুকিং ফটোতে ধর্মীয় আবরণ রাখা যাবে
পোর্টল্যান্ড এলাকার মাল্টনোমাহ কাউন্টি জেলে গ্রেফতার হওয়া মুসলিম নারীদের জন্য নতুন মাগশট নীতি প্রবর্তন করেছে। পুরোনো নীতিতে, ডাউনটাউন পোর্টল্যান্ড জেলের ইন্টেক সেন্টারে বুকিং ফটোগ্রাফের আগে নারীদের হিজাব বা বোরকা খুলতে বাধ্য করা হতো, যা ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের কিছু শাখার নিয়মাবলীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যারা কয়েক ঘণ্টার চেয়ে দীর্ঘ সময় জেলে থাকতেন, তাদের একটি তোয়াল দেওয়া হতো।
নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, প্রাথমিক মাগশট ফটোতে নারী গ্রেফতাররা হিজাব বা বোরকা পরে থাকতে পারবেন, যা ডরমিটরি আইডি কার্ড তৈরির জন্য ব্যবহৃত হবে। একটি দ্বিতীয় বুকিং ফটো নেওয়া হবে হিজাব বা বোরকা ছাড়া, যা শুধু নারী কর্মীরা তুলবেন এবং পুরুষ জেলকর্মীরা যৌক্তিক কারণ ছাড়া সে ছবি দেখতে পারবে না। চিফ করেকশন ডেপুটি স্টিভ রেয়ারডন জানিয়েছেন, ছবি তোলার সময় পুরুষ জেলকর্মীদের পুরোপুরি ফটোগ্রাফির এলাকা ত্যাগ করতে হবে।
নারীরা জেল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার সময় নারী ডেপুটি দ্বারা তল্লাশি করানো হবে এবং সেই সময় হিজাব বা বোরকা খুলতে হবে। তবে নতুন নীতি অনুযায়ী, এ তল্লাশি হবে নিজ কক্ষে, যাতে ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করা যায়। হিজাব বা বোরকা ধারণ করা অবস্থায় প্রবেশ করা নারীর ধর্মীয় পোশাক জেলের কাছে সংরক্ষণ করা হবে, এবং তার পরিবর্তে একটি জেল-জারি হিজাব দেওয়া হবে। যারা ডরমিটরিতে স্থানান্তরিত হবে, তাদের আবার নারীদের দ্বারা তল্লাশি করা হবে এবং হিজাব সরাতে হবে।
নতুন নীতির ফলে মুসলিম নারীরা তাদের ধর্মীয় অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবেন এবং বুকিং ফটোগ্রাফের সময় হিজাব বা বোরকা পরিহিত থাকতে পারবেন। পুরুষ কর্মীদের চোখে নারীদের ছবি দেখা না যাওয়ায় তাদের প্রাইভেসি ও সম্মান বজায় থাকবে। এই পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য জেল ও ডিটেনশন সেন্টারগুলোর জন্য ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল নীতি প্রবর্তনের উদাহরণ স্থাপন করছে।