ভোটের বাক্স
আবারও নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। দেশের সবচে গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাকর ওই নির্বাচন- স্থানীয় সরকার নির্বাচন। যাতে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায় দেশের সকল মানুষ। কোনো না কোনভাবে এতে জড়িত হয়েই যান। গ্রাম পর্যায়, ইউনিয়ন পর্যায়ের এ প্রতিযোগিতায় কারো না কারোর পরিচিত, নিজস্ব, আত্মীয় স্বজনেরা থাকবেই। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে সোচ্চার ছিল এনসিপি ও জামায়াত। কিন্তু বিএনপির যৌক্তিক বিরোধীতায় সেটা আর হয়নি। জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের তিন মাসের মধ্যে আবারও এ নির্বাচনের দাবি বিরোধী পক্ষের। সরকারও একটা রূপরেখা ইতিমধ্যে প্রণয়ন করেছে। আগামী সেপ্টেম্বর অক্টোবরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এ নির্বাচন শুরু করতে চায় সরকার।
সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকে ধাপে ধাপে পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই এ নির্বাচন নিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি হুমকির সম্মুখীন। কেননা স্থানীয় সরকার বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব খুব কম থাকে। এখানে মানুষ যোগ্য মানুষকে খুঁজে ভোট দেন মানুষ। দেখেন না সে কোন দলের। সবার প্রভাব প্রায় সমান। ফলে এতে আইনশৃংলা ঠিক রাখতে হিমশিম খেতে হয়। অতীতে স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে যে পরিমাণ রক্তপাত, সহিংসতা এবং প্রাণহানি হয়ে আসছে, তা নতুন সরকারের জন্য আসন্ন ওই নির্বাচন কেন্দ্র করে একটি বড় সতর্কবার্তা। সরকার এ ব্যাপারে কিভাবে পদক্ষেপ নেবে সেটা চ্যালেঞ্জিং একটা বিষয়।
দলীয় প্রতীকহীন নির্বাচন: সংঘাতের নতুন রূপ?
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, সংশোধিত আইন মোতাবেক এবারের নির্বাচনগুলো দলীয় প্রতীক ছাড়া সাধারণ প্রতীকে হবে। আপাতদৃষ্টিতে একে সহিংসতা কমানোর একটি ভালো উদ্যোগ মনে হলেও, মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। বিগত দিনগুলোতে দেখা গেছে, দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক দলের একটা সমার্থন ছিল। দলীয় প্রতীক না থাকলেও মানুষ বুঝতে পারেন কে কোন দলের প্রার্থী। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থীও হন। এতে করে স্থানীয় পর্যায়ে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, “বিদ্রোহী” বনাম “অফিসিয়াল” প্রার্থী এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চরম আকার ধারণ করে। প্রতীক না থাকায় একই দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা মাঠে নামতে পারেন, যার ফলে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হবে এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং এক দলের সঙ্গে অন্য দলের প্রার্থী ও সমর্থকদের বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রূপ নিতে পারে। স্থানীয় নির্বাচনে মারামারি বেশি হওয়ার মূল কারণ এখানে জয়-পরাজয়ের সাথে স্থানীয় সামাজিক মর্যাদা, জমিজমার প্রভাব এবং তাৎক্ষণিক ক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক থাকে।
বিগত নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই এবং দুই পক্ষের মুখোমুখি সংঘর্ষে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমান সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো সম্পূর্ণ “স্টাবল” বা সুসংহত অবস্থানে পৌঁছেছে কি না, তা একটি বড় প্রশ্ন। প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর ভেতরে এখনো রদবদল ও সংস্কারের প্রক্রিয়া চলছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তড়িঘড়ি করে নির্বাচন দিতে গেলে মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে অনেকে মত দিচ্ছেন।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের নির্বাচনকে যদি সত্যিই রক্তপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য করতে আইনশৃংখলাবাহিনীকে একটি নিরেট ও নিরাপদ “স্টাবল পজিশন” বা সুসংহত অবস্থানে পৌঁছাতে হবে। ফলে সরকার এ ব্যাপারে কতটা প্রস্ততি নিতে সক্ষম হবেন এটা একটা বড় প্রশ্ন। শুধু নির্বাচন সম্পন্ন করাই নয়, সরকারের শতভাগ নিরপেক্ষতা ও সর্বপরি সংঘাতহীন সুষ্ট, গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।
এতে করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শতভাগ পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। নির্বাচনের অন্তত তিন মাস আগে মাঠপর্যায়ের পুলিশ ও আমলাতন্ত্রকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে, যাতে তারা কোনো পক্ষের হয়ে কাজ না করে। নির্বাচনের আগে স্থানীয় পর্যায়ের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত ক্যাডারদের আগাম গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নিয়ে একটি উৎসব মুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ আলোচনা করে একটা রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে বর্তমান বিরোধী দলগুলোর (এনসিপি, জামায়াতসহ অন্যান্য) সাথে স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যৌথ আলাপ হওয়া প্রয়োজন, যেখানে সব দল মাঠপর্যায়ে শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে।
এছাড়াও একদিনে বা কম ধাপে নির্বাচন না করে, ধাপের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পুলিশ, আনসার ও প্রয়োজনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা বা বিজিবি মোতায়েন নিশ্চিত করা যেতে পারে, যাতে সংঘাত ও ক্ষয়ক্ষতি রোধ বা পরিমাণ কম হয়।
সর্বশেষ
স্থানীয় সরকার হলো রাষ্ট্রের ভিত্তি। এই নির্বাচন অবশ্যই প্রয়োজন এবং দ্রুততম সময়ে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের গাইডলাইন সরকারের সদিচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ। তবে তাড়াহুড়ো করে আরেকটি রক্তক্ষয়ী অধ্যায় তৈরি করার চেয়ে, প্রশাসনকে শতভাগ প্রস্তুত করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতা এনে নির্বাচনের মাঠে না নামলে সামাল দেয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। এ ছাড়াও নতুন সরকার দেশ পরিচালনায় হাত দেয়ার পর থেকেই মুখে সহযোগিতার কথা বললেও কার্যত বিভিন্নভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতে ফেলার কৌশল একটি পক্ষের। এছাড়াও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল তাদের অতীত কর্মকান্ডের জন্য নিষিদ্ধ। তাদের সিনিয়র সব নেতাদের দেশ ত্যাগে ত্রাহি অবস্থা। ফলে তারাও মোক্ষম সুযোগ খোঁজার অপেক্ষায়। যাতে সেটা কাজে লাগিয়ে সরকারকে দুর্বল করে রাজনীতির মাঠে অবস্থান তৈরি করতে পারে। ফলে ক্ষমতার পালাবদলের পর দেশ এখন কোনো নতুন বিশৃঙ্খলা তৈরিরও পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে পতিত শক্তি ও নিষিদ্ধ কোনো গোষ্ঠী সুযোগ না নিতে পারে এ ব্যাপারে কঠোর দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। ফলে বিরোধী দলেরও উচিৎ এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করা। কারণ মাঠের রাজনীতি সরকার পক্ষ একা সামলিয়ে উঠতে পারে না, যদি বিরোধী দল সহায়তা না করে। তাছাড়া অপশক্তি এ সুযোগে বিশৃংখলা তৈরি করে সুযোগ নিয়ে দেশের আইনশৃংখলার ভীত নাড়িয়ে দিলে সেটা উভয় পক্ষের জন্যই অমঙ্গলকর বৈকি।