ডুয়েটের গেটে আগুন
ঢাকার মিরপুরে শাহ আলী মাজারে গত ১৪ মে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় একদল ব্যক্তি। আর এতে করে মাজার আক্রান্ত হওয়ার তালিকায় যোগ হলো খোদ রাজধানীর শাহ আলী মাজার। মিরপুরের এই মাজারে মধ্যরাতে হামলা চালিয়ে পিটিয়ে বের করে দেওয়া হয় এই পীরের ভক্তদের।
প্রতিক্রিয়ায় যা বলা হচ্ছে
সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ১৭ মাসে সারা দেশে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে হামলার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। আর এসব ঘটনার সাথে কারা কারা বা কোন কোন দল জড়িত তার হিসাবও তুলে ধরেন তারা। মাজারে হামলায় রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততার তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি ১৩টি হামলায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৪টি ঘটনায় বিএনপি, ৪টিতে জামায়াতে ইসলামী, ২টিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ১টিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনিসিপির) ও ১টিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
টিআইবিসহ বিভিন্ন মহলের উদ্বেগ
দেশে এভাবে মাজারে হামলার নিন্দা ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিবৃতিতে বলেন, এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। এটা বরং সুপরিকল্পিতভাবে বিদ্বেষ ও হিংসা ছড়িয়ে করা হয়েছে, যাতে আবহমান বাঙালির উদারনৈতিক লোকজ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রময় চর্চার ক্ষেত্র, মাধ্যমসমূহ ধ্বংস হয়। আর এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি বিকশিত হতে পারে। এটা দেশবাসীর জন্য অশনিসংকেত।
অন্যদিকে অনৈতিক কাজের অভিযোগ তুলে রাজধানীর শাহ আলী মাজারে হামলা হয়েছে। এ হামলায় জামায়াতে ইসলামীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, এখন তো প্রমাণিত হচ্ছে, মন্দ কাজগুলো আপনারাই করে মাজারের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন।
আবারও শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা
এদিকে গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগ কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, ইউএওসহ অন্তত ২৫জন আহত হয়েছেন। ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত শিক্ষার্থী এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়। নিজস্ব শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের দাবিতে উত্তাল এই গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) ক্যাম্পাস। প্রধান ফটক বন্ধ করে দিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে ১৮ মে সোমবার সকাল ১০টা থেকেই বিক্ষোভ শুরু করেছে তারা। ক্যাম্পাসের বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ১৯ মে মঙ্গলবারও অবস্থান করছেন। ডুয়েট ক্যাম্পাসে এখনও ঢুকতে পারেননি উপাচার্য, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগ কেন্দ্র করে সেখানে সংগঠিত ঘটনার পেছনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত শিক্ষার্থীরা। এরা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় বসার মাত্র কয়েকমাসের মাথায় সেখানে মিছিল সমাবেশ করে হেন অশ্লীল ভাষা নেই যে তারা তা ব্যবহার করতে কুন্ঠাবোধ করেনি। উচ্চ শিক্ষা নিতে আসা এসব শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে যে দলটি সমর্থন দিচ্ছে তাদের কর্মীদের মুখে এরকম ভাষা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে উপাচার্য অপসারণের একদফা দাবিতে টানা আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)। উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলামের পদত্যাগ দাবিতে অনড় শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারি ও শিক্ষার্থীদের চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ১৮ মে সোমবার ৮ দিনে গড়িয়েছে।
বলা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের (ভিসি) বড় একটি অংশের কপালে এখন জুটছে পদত্যাগ। সর্বশেষ খবর হলো ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিেিক নির্বাচিত সরকার অব্যাহতি দিয়েছে। এর বিপরীতে নিজেদের পছন্দ মতো নতুন নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকাল। বলা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জামায়াত ঘরানার শিক্ষকরা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তাই এদেরকে অপসারণে বিএনপিকে এখন কঠোর ভূমিকা পালন করছে। তবে এনিয়ে শিক্ষাঙ্গনে একটা অস্থির ভাব ফুটে উঠেছে। আর এটাকে সুচারুভাবে কাজে লাগাচ্ছে বিএনপির প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল।
জুলাই বিপ্লবীদের সাথে দূরত্ব বাড়ছেই
এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাতের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। গত ১৭ মে রোববার রাতে নগরীর টাইগারপাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করে এনসিপি। এসময় এনসিপি, চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দিন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে ‘অবৈধ মেয়র’ অ্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ফ্লাইওভারের পিলারের গ্রাফিতি মুছে হলুদ ও সাদা রং করা হয়েছে। গত ১৮ মে সোমবারও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলা ইস্যুতে চট্টগ্রাম নগরীতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ ঘটনা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছেন বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির(এনসিপি) নেতাকর্মীরা। এই ধরনের ঘটনা আসলে বিএনপির সাথে জুলাই বিপ্লবীদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ানো ইঙ্গিত দিচ্ছে কেই কেউ।
তাহলে দেশ কোনো দিকে যাচ্ছে?
গত কয়েকদিন এসব ঘটনা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দীর্ঘদিন পর দেশে জনগণের ভোটে একটি গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছে বাংলাদেশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর সবার ধারণা দেশ অন্তত কয়েকটি বছর ধীরে সুস্থ্যে চলবে । কিন্তু সার্বিক অবস্থায় কারো কারো অভিমত যে ঘটনায় সেদিকে যাচ্ছে না। এদিকে দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে যখন এমন অবস্থা বিরাজ করছে তখন আবারও উস্কানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে একটি মন্তব্য করেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, দলের নাম ছিলো জাতীয়তাবাদী দল, এখন হয়েছে চাঁদাবাজির দল। শনিবার (১৬ মে) রাজশাহীতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। তার এই ধরনের বক্তব্য নিয়ে চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা। প্রশ্ন হচ্ছে এমন সিনিয়র একজন রাজনৈতিক নেতা যেভাবে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছে তা কি আসলে ক্ষমতাসীনদেরকে চাপে রাখা না বেকায়দায় ফেলা?
বিএনপি কি করছে?
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপি কি করছে? দেশব্যাপী গোপনে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি মিলে মিশেই করা হচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর বের হচ্ছে। আর এসব ঘটনার পেছনে যে-ই থাকুক না কেনো আইন কি নিজস্ব গতিতে চলছে? একজন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করতে বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে আইন শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিতদের কেনোইবা এখন অনুমতি তোয়াজ করতে হয়? কেনো তারা নিরপেক্ষভাবে কঠোর হতে পারছেন না? কেনোই বা এসব ঘটনায় আইন শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী কঠোরতা দেখাচ্ছে না? চাঁদাবাজদের তালিকা করেও কেনো প্রশাসন নিরব? তা নিয়ে সর্বত্র প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু তার চেয়ে বড়ো প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ ও মাঠের সক্রিয় প্রধান বিরোধী দল যেভাবে ব্যাটিং করে চলেছে তা-দেরই বা লক্ষ্য কি? কারো কারো অভিমত দলটি এভাবে ক্ষমতাসীনদের চাপে রাখতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে চাপে রাখতে গিয়ে মাঠে ময়দানে মব সৃষ্টির পাশাপাশি অশ্লীল পদ্ধতিতে বক্তব্য বা আন্দোলন করা কি কোনো দলকে চাপে রাখা না বেকয়াদায় ফেলা- এগুলো আলোচনায় এখন উঠে আসছে।
শেষ কথা
২০০৪ সালের ১২ জানুয়ারি সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে বার্ষিক ওরস চলাকালে একটি শক্তিশালী বোমা হামলা চালানো হয়। এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই পুলিশের একজন এএসআইসহ ৫ জন নিহত হন। এছাড়া অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন গুরুতর আহত হন। হামলার ধরনে বলা হয় যে ওরসে আগত কয়েক হাজার ভক্তের সমাগমের মাঝে মাটিতে পুতে রাখা শক্তিশালী বোমাটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ওই হামলার সময় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় সরকার ক্ষমতায় ছিল। জামায়াতে ইসলামী ছিল ওই বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অন্যতম শরিক। আর ওই সময়ে জামায়াতের সাথে জোট নিয়ে দেশের ভেতর বাইরে প্রচন্ড ইমেজ সঙ্কটে পড়ে বিএনপি। তাদেরকে দীর্ঘদিন ধরে এই দুর্নাম পোহাতে হয় যে বিএনপি একটি সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী দল। অন্যদিকে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে বার্ষিক ওরস চলাকালে বোমা হামলার ঘটনা বিএনপির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইমেজ আন্তর্জাতিক ইমেজ কোথায় নিয়ে গিয়েছিল তা সবার জানা। এসব কারণে এবং বর্তমান চলামান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কারো কারো মতে, সার্বিক পরিস্থিতি কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে? কারো মতে, এসব বুঝতে বেশি দূর যাওয়া লাগে না যখন বার্লিন-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর একটি স্বীকৃত জাতীয় চ্যাপ্টার বা শাখা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন ‘এটা দেশবাসীর জন্য অশনিসংকেত।’ প্রশ্ন হচ্ছে মাজার মন্দিরে হামলা করে কিংবা আরও অন্য ইস্যুকে মাঠে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা-কে কারো কারো মতে একধরনের গুপ্ত কৌশল। তাদের মতে, এগুলোর মাধ্যমে আসলেই চাপে না বেকায়দা ফেলা হচ্ছে যখন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে আশঙ্কার বার্তা। বলা হচ্ছে চলতি অর্থবছরের জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে ৬৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বাজেট সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সহায়তা পাওয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আরও আশঙ্কার বার্তা হচ্ছে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। টানা তিন বছর ধরে মন্থর প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির অব্যাহত ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে অব্যাহত নিম্নমুখিতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। কারো মতে, বিএনপি প্রতিপক্ষ কি কারো সহায়তায় চাপে রাখার কথা বলে সরকারের এমন সঙ্কটময় সময়কে গুপ্ত প্রক্রিয়া কাজে লাগাতে চায়?