১৫ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ০৪:৫৬:০৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
স্ন্যাপ সুবিধাভোগীদের ভাতা চুরি রোধে বড় পদক্ষেপ ২০২৭ সালে সোশ্যাল সিকিউরিটি ভাতা বাড়তে পারে ৪.৭ শতাংশ যৌন নিপীড়নের মামলায় ক্যারলকে ৫.৬ মিলিয়ন দিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঢালিউডের দু’জন চিত্রনায়িকার বক্তব্যে নিয়ে অনেক প্রশ্ন তরুণ স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা ‘জামানত ছাড়া ঋণ পাবেন’ রাজধানীর বুক থেকে নদী গায়েবের চেষ্টা রুখে দিল পরিবেশবাদিরা বাংলাদেশি অভিবাসীরা কি যুক্তরাষ্ট্রের বোঝা? নেতৃবৃন্দ নীরব কেন ৩১ অঙ্গরাজ্যে মারাত্মক ডায়রিয়া সৃষ্টিকারী পরজীবীর প্রাদুর্ভাব ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯৩ জন মানুষের মৃত্যু বারবার দেশে ফেরার ঘোষণায় হালকা হচ্ছেন হাসিনা


বারবার দেশে ফেরার ঘোষণায় হালকা হচ্ছেন হাসিনা
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৫-০৭-২০২৬
বারবার দেশে ফেরার ঘোষণায় হালকা হচ্ছেন হাসিনা শেখ হাসিনা


বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তার দলের পলাতক নেতাকর্মীদের নিয়ে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বার্তা সংস্থার সাক্ষাৎকারে বলা হচ্ছে এবারে এধরনের বার্তায় রযেছে দলটির নেতাকর্মীসহ তার আত্মসমর্পণ কথা। তবে শেখ হাসিনার এই ধরনের হুঙ্কারে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া আছে দেশের ভেতরে বাইরে। 

দেশের ভেতরে প্রতিক্রিয়া

এখন দেখা যাক তার আগমনকে কে কিভাবে দেখছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত থেকে দেশে ফিরলে তাঁর আত্মসমর্পণের আইনগত সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। এর পাশাপাশি তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামির জামিন হয়েছে, এরকম নজির নেই।’ তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ না নেওয়ায় শেখ হাসিনার আপিল করার অধিকার নেই। অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শক্তিগুলোর আবারও দেশে ফেরার ঘোষণা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা ‘রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যা বলেছেন

বাংলাদেশে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ’বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ও ’জাতীয় নাগরিক কমিটি’-এর উদ্যোগে গঠিত এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশে রায় হয়ে গিয়েছে। এখন এই সরকারের উচিত যথাযথ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় গণহত্যাকারীকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা।

আ.লীগের নেতাকর্মীদের প্রতিক্রিয়া

এসব বিষয় নিয়ে স্বাভাবিক কারণে নাম প্রকাশ করতে চান না কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আ.লীগের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী দেশ প্রতিনিধিকে এব্যাপারে তাদের ভাষায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। এব্যাপারে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী মনে করেন, শেখ হাসিনা এধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও দিবেন, তা চলমানই থাকবে। তারা বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। সেখানে-ও তাকে বলতে শোনা যায় যে, দেশের খুব কাছাকাছি আছেন এবং যেকোনো সময় ”চট করে ঢুকে পড়তে” পারেন। তখনো এনিয়ে পুরো দেশে হুলুস্থল অবস্থা দেখা যায়। এব্যাপারটি উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের নেতা বলেন, শেখ হাসিনার এধরনের বক্তব্যের কারণে সেসময়ের দেশে নেতাকর্মীদের মধ্যে আসলে একটা ভয়ার্ত পরিবেশে সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারপরেও বিদেশে বসে শেখ হাসিনার সেদিনের ঐ ডাককে বিশ্বাস করে মাঠে নেমে হাজার হাজার নেতাকর্মীদের অন্তর্বর্তী সরকারের রোষাণলে পড়তে হয়েছিল। কেননা সদ্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাকর্মীদের মধ্যে সেসময়ে বেশ উত্তেজনা ছিল। ছিল আবেগ, আগ্রহ। ফলে ওই সময়ে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতাও দেখা দেয় তাদের সভাপতির সেধরনের মন্তব্যে। তারা ধরে নিয়েছিলেন নেত্রী অসলেই ঢুকে পড়ছেন। একারণে অতি বিশ্বাসী আ.লীগ নেতাকর্মীরা সেসময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাকডাক মেনে একেবারে নিজেদের বিপদ ডেকে আনে। তবে শেখ হাসিনার এমন মন্তব্যের পরে থেকে তা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বহুল আলোচিত ও ব্যঙ্গাত্মক বাক্যে পরিণত হয়েছে বলে অনেক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর অভিমত। এখন আবার বছর, মাস উল্লেখ করে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে নেতাকর্মীরা হালকাভাবে নিবেন বা নিচ্ছেন বলে দেশ পত্রিকার প্রতিনিধির কাছে তারা আকপটে স্বীকার করেন। 

তার মতে, এর কারণ সবাই জানে বা ভালো জ্ঞান রাখে যে, যেহেতু শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণেই কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে আছেন। তাই নিজে নিজে হাকডাক মেরেই বাংলাদেশে চলে আসা বা ঢুকে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে তাঁকে ফেরাতে ভারত সরকারের কাছে যে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার, তাতে কতটা আন্তরিকতা ও তাড়াহুড়া থাকবে তা কেউ বলতে পারেন না। আর যদিও তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয় সে-টি হবে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায়। তা-ও সে দ্রুত হবে তার কোনো লক্ষণ নেই। কারো কারো মতে, বিকল্প যে পথ আছে সেটি হলো ‘পুশব্যাক’। শেখ হাসিনার বেলায় ভারত কর্তৃক এই পুশব্যাক পদ্ধতি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে তা-ও বিবেচ্য বিষয় বলে দেশ প্রতিনিধিকে ওই আওয়ামী লীগ নেতা তার অভিমত ব্যক্ত করেন। আরেকজন আওয়ামী লীগ নেতা দেশ প্রতিনিধিকে বলেন, ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের নেতাদেরসহ বাংলাদেশে ফিরে আত্মসমর্পণের বিষয়টি আসলে খুব জটিল এবং ভারতের জন্য বিভিন্ন কারণেও ঝুকিপূর্ণ। 

কেনোনা শেখ হাসিনা আসলে নিজেই কোথায় অবস্থান করছেন বা আছেন তা তিনি নিজেই জানেন কি-না সন্দেহ। কিংবা তার দলের পলাতক নেতারা-ই বা সত্যিই কই আছেন তা-ও তিনি নিজেই জানেন কি-না সন্দেহ? জানলেও পলাতক এইসব নেতাদের বিশাল বহর নিয়ে কখন কোন দেশ কর্তৃক বাংলাদেশে নিয়ে আনা হবে তা সত্যিই প্রশ্ন সাপেক্ষ। এভাবে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আওয়ামী লীগের আরও বেশ কয়েকজন নেতা দেশ প্রতিনিধি বলেন, ডিসেম্বরে দেশে ফেরা কিংবা ”চট করে ঢুকে পড়তে” পারেন- এমন সব বক্তব্য দিয়ে হয়ে যাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু এতে কাজ হবে না। বরং নিজেকে হালকা করে ফেলছে বা হয়ে যাচ্ছেন অনেক ‘পাতলা’। আর একারণেই সম্ভবত ’একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয়’ বলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে মন্তব্য করেছে সেটি তা-রই ইঙ্গিত বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। উল্লেখ্য সম্প্রতি দেশে ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। 

অন্যদিকে মাত্র কয়েকমাস আগে নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি-ও বলেছেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ নিয়ে আর কথা না বলে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে ভারত আগ্রহী। সেই সময়ে তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে দেশটির নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হওয়ার এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে ভারতের ইচ্ছার কথা। এরপরে একারণে ভারতের কাছেও এখন শেষ হাসিনা প্রাসঙ্গিক কি-না তা খতিয়ে দেখার আছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। 

তা-ই এধরনের পরিস্থিতিতে ডিসেম্বরে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাদেরসহ শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করার আহবানটি একসময়ে নেতাকর্মীদের কাছে হাওয়া মিলিয়ে যাবে কিংবা তিনি নিজেই হালকা হয়ে যাবেন বা হয়ে গেছেন বলে অনেকেই মনে করেন।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হবে: ভারত

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ নিয়ে ভারত সরকার কোনো মন্তব্য করেনি। তবে জানিয়েছে, যেকোনো প্রত্যর্পণ আইনগত বিষয়। আইনি প্রক্রিয়াতেই তার নিষ্পত্তি হবে। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাঁকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান। পলাতক শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ফেরার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। যদি মৃত্যুই আসে, আমি চাই আমার নিজের মাটিতেই মৃত্যু হোক, যেখানে আমার মা-বাবা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছিল।’

১৪ জুলাই নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনার ওই সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে ভারতের মনোভাবের কথা জানতে চান এক সাংবাদিক। তিনি জানতে চান, শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের আলোচনা হয়েছে কি না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সরাসরি এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি। তিনি বলেছেন, যেকোনো প্রত্যর্পণই আইনি বিষয়। আইনি প্রক্রিয়াতেই এর নিষ্পত্তি হবে। শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের মনোভাবের কোনো বদল ঘটেনি বলেও উল্লেখ করেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।

ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে কিছু ভারতীয় উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। এক সাংবাদিক জানতে চান, ১১টি প্রকল্প যা ঘোষিত হয়েছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কি না। এই প্রশ্নের উত্তরে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, উন্নয়নমূলক সহযোগিতা প্রকল্প পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত। সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

শেয়ার করুন