১৫ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ০৪:৫৪:১০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
স্ন্যাপ সুবিধাভোগীদের ভাতা চুরি রোধে বড় পদক্ষেপ ২০২৭ সালে সোশ্যাল সিকিউরিটি ভাতা বাড়তে পারে ৪.৭ শতাংশ যৌন নিপীড়নের মামলায় ক্যারলকে ৫.৬ মিলিয়ন দিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঢালিউডের দু’জন চিত্রনায়িকার বক্তব্যে নিয়ে অনেক প্রশ্ন তরুণ স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা ‘জামানত ছাড়া ঋণ পাবেন’ রাজধানীর বুক থেকে নদী গায়েবের চেষ্টা রুখে দিল পরিবেশবাদিরা বাংলাদেশি অভিবাসীরা কি যুক্তরাষ্ট্রের বোঝা? নেতৃবৃন্দ নীরব কেন ৩১ অঙ্গরাজ্যে মারাত্মক ডায়রিয়া সৃষ্টিকারী পরজীবীর প্রাদুর্ভাব ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯৩ জন মানুষের মৃত্যু বারবার দেশে ফেরার ঘোষণায় হালকা হচ্ছেন হাসিনা


বাংলাদেশি অভিবাসীরা কি যুক্তরাষ্ট্রের বোঝা? নেতৃবৃন্দ নীরব কেন
বিশেষ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৫-০৭-২০২৬
বাংলাদেশি অভিবাসীরা কি যুক্তরাষ্ট্রের বোঝা? নেতৃবৃন্দ নীরব কেন পাবলিক চার্জ পর্যালোচনার কারণে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা প্রসেসিং সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।


যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী ভিসা (ইমিগ্র‍্যান্ট ভিসা) প্রক্রিয়ায় নতুন নীতিগত পরিবর্তন ও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের কারণে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র‍্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। বাংলাদেশও এ তালিকায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর নাগরিকদের ইমিগ্র‍্যান্ট ভিসা আবেদন যাচাই-বাছাই, আর্থিক সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা পর্যালোচনা আরো কঠোর করার অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন নীতির লক্ষ্য হলো এমন একটি অভিবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে নতুন অভিবাসীরা আর্থিকভাবে স্বনির্ভর থাকবেন এবং সরকারি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হবেন না।

নতুন এ নীতির প্রভাব বাংলাদেশি আবেদনকারীদের মধ্যেও পড়েছে। বিশেষ করে যারা পরিবারভিত্তিক ইমিগ্র‍্যান্ট ভিসা, কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা অথবা গ্রিনকার্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন, তারা ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। আইআর-১/সিআর-১, আইআর-৫, এফ-২এ, এফ-২বি, এফ-৩ ও এফ-৪সহ বিভিন্ন অভিবাসী ভিসা ক্যাটাগরির আবেদনকারীরা নতুন পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

কমিউনিটির অনেকের অভিযোগ, হাজারো বাংলাদেশি পরিবার যখন দীর্ঘদিনের ভিসা অপেক্ষা, পরিবার পুনর্মিলন এবং স্থায়ী বসবাসের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, তখন বাংলাদেশি সংগঠন ও নেতাদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ, কংগ্রেস সদস্যদের কাছে আবেদনকারীদের উদ্বেগ তুলে ধরা, অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনা আয়োজন এবং তথ্য সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন।

নিউইয়র্কের বড় বাংলাদেশি সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউইয়র্ক ইনক. এবং ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা (ফোবানা)-এর মতো সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কমিউনিটির একাংশের অভিযোগ, এসব সংগঠন নিয়মিত সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, তহবিল সংগ্রহ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকলেও অভিবাসন নীতি, ভিসা জটিলতা এবং বাংলাদেশি পরিবারগুলোর বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

কমিউনিটির অনেকের মতে, সংগঠনগুলোর ভূমিকা শুধু সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। অভিবাসন, নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক অবদান এবং বাংলাদেশি পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সঙ্গে যোগাযোগ করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অন্যদিকে বাংলাদেশি অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। অভিবাসীদের মূল্যায়ন শুধু তারা সরকারি সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন কি না-এ একটি বিষয় দিয়ে করা উচিত নয় বলে মনে করছেন অনেকে। বাংলাদেশি অভিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার, ব্যবসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা চিকিৎসা, প্রকৌশল, প্রযুক্তি, শিক্ষা, গবেষণা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও ছোট ব্যবসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন। তারা নিয়মিত কর প্রদান করছেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করছেন। বাংলাদেশি মেধার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ ড. ফজলুর রহমান খান। আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ প্রযুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তার উদ্ভাবিত ‘টিউব স্ট্র্যাকচার’ প্রযুক্তি শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার (বর্তমান উইলিস টাওয়ার)-এর নকশায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং উচ্চ ভবন নির্মাণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

অ্যারোস্পেস ও উপকরণ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের অবদান রয়েছে। ড. আবদুস সাত্তার খান যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ ও বিমান প্রযুক্তি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি নাসা, ইউনাইটেড টেকনোলজিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করেন এবং উন্নত অ্যারোস্পেস উপকরণ ও প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদান রাখেন। তার গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র ছিল উচ্চশক্তির নিকেলভিত্তিক অ্যালয়, যা উন্নত বিমান ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এসব প্রযুক্তি সামরিক ও বেসামরিক বিমান ইঞ্জিন উন্নয়নেও ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৫, এফ-১৬ যুদ্ধ বিমান গুলোর ক্ষমতা বৃদ্বি পেয়েছে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অ্যারোস্পেস প্রকৌশলী আসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। তিনি লকহিড মার্টিনের এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমান কর্মসূচির প্রকৌশল দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। এ ধরনের প্রকল্পে স্টেলথ প্রযুক্তি, উন্নত অ্যাভিওনিক্স, বিমান কাঠামো, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন ও উৎপাদন প্রকৌশলের মতো জটিল ক্ষেত্রে হাজারো প্রকৌশলী সম্মিলিতভাবে কাজ করেন।

প্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অবদান উল্লেখযোগ্য। জাওয়েদ করিম, ইউটিউবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, অনলাইন ভিডিও প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী মানুষের যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়ের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অবদান যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এর অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ সালমান খান, যিনি অনলাইন শিক্ষার বিপ্লবী প্ল্যাটফর্ম খান একাডেমি-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান সালমান খান ২০০৮ সালে খান একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য ছিল বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া। গণিত, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, কম্পিউটার প্রোগ্রামিংসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তৈরি অনলাইন পাঠের মাধ্যমে খান একাডেমি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পরিবার এই প্ল্যাটফর্ম থেকে উপকৃত হয়েছে। অনেক আমেরিকান শিশু স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি অতিরিক্ত অনুশীলন, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং কঠিন বিষয় বোঝার জন্য খান একাডেমির বিনামূল্যের শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করছে। শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য কমানো, প্রযুক্তির মাধ্যমে সবার কাছে মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে সালমান খানের অবদান বাংলাদেশি-আমেরিকানদের মেধা, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী শক্তির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অবদান তুলে ধরা এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিবাসন নিয়ে আলোচনায় শুধু সম্ভাব্য সরকারি সহায়তার বিষয়টি নয়, বরং অভিবাসীরা অর্থনীতি, সমাজ, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখছেন সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমান ইমিগ্র‍্যান্ট ভিসা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতাদের আরো দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার দাবি উঠেছে। তাদের উচিত কংগ্রেস সদস্য, নীতিনির্ধারক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের উদ্বেগ তুলে ধরা এবং ভিসা প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।

বাংলাদেশি-আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো বোঝা নয়; বরং তারা এই দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। শ্রম, ব্যবসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও সমৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলেছেন। এখন প্রয়োজন তাদের অবদানকে যথাযথভাবে তুলে ধরা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ কমিউনিটি গড়ে তোলা।

শেয়ার করুন