ট্রাম্পের সাথে সার্জিও গোর
মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের ঢাকা সফর নিয়ে ইতিমধ্যে কূটনৈতিক মহল নড়েচড়ে বসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের আসন্ন ঢাকা সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তার এটিই প্রথম বাংলাদেশ সফর।
মূলত সফরের মূল প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অনুধাবন। কেননা নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির গতি-প্রকৃতি সরাসরি মূল্যায়ন করা এবং মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে এর ভারসাম্য বজায় রাখার পথ খোঁজা এ সফরের প্রধান উদ্দেশ্য হতে পারে।
সার্জিও গোর কেবল পেশাদার কূটনীতিক নন; তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সরাসরি হোয়াইট হাউসে রিপোর্ট করেন। তাই তার এ সফরকে ওয়াশিংটনের কোনো সাধারণ রুটিন সফর হিসেবে না দেখে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বার্তা আদান-প্রদান হিসেবে গণ্য করা যায়।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফর, মংলা পোর্ট আধুনিকায়ন, তিস্তা নদী প্রকল্প, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের বিষয়গুলো ওয়াশিংটনকে হয়তো ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে ঢাকার বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ অনুধাবন করাই হতে পারে মার্কিন দূতের মূল এজেন্ডা।
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্রসমূহ (অনুমান ও বিশ্লেষণ) আলোচনার বিষয়কৌশলগত মাত্রা ও কূটনৈতিক তাৎপর্যচীন ও রাশিয়া ইস্যু প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের রাশিয়া সফর (সার্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক) মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে থাকতে পারে। চীন ও রাশিয়ার দিকে ঢাকার ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু, তা অবশ্যই পরিমাপ করবে ওয়াশিংটন। সার্জিও গোর একই সঙ্গে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন রসায়ন এবং ঢাকাস্থ চীনের অবস্থান নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ তিনি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবে এ সফরে।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন গোরের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে মার্কিন সমর্থন বজায় রাখার পাশাপাশি রাখাইন পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে কথা হবে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক টানাপোড়েন এবং ইরান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করতে চাইতে পারেন বিশেষ দূত।
সফরকালে সার্জিও গোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
বহুমাত্রিক এনগেজমেন্ট
এ সফরে গোর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করবেন তিনি।
আসলে ওয়াশিংটন বর্তমানে বাংলাদেশকে শুধু একটি আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে দেখছে না, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের সিনেট শুনানিতে চীনা চুক্তি নিয়ে দেওয়া সতর্কবার্তা এবং তার জবাবে ঢাকাস্থ চীন দূতাবাসের পাল্টা প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশ কেন্দ্রিক পরাশক্তিগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি বজায় রেখে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি চালনা করছে তা অত্যন্ত সুচতুরভাবে মার্কিন দূতের কাছে উপস্থাপন করাই হবে ঢাকা diplomatic corps-এর প্রধান চ্যালেঞ্জ।