ইউনাইটেড স্টেটস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস)
যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী এবং বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য ভিসা নিয়মে ব্যাপক পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, নতুন নিয়মের উদ্দেশ্য হলো ভিসা ব্যবস্থায় নজরদারি বৃদ্ধি, অপব্যবহার কমানো এবং বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরো নিয়ন্ত্রিত করা। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এ পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতা, অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
১৭ জুলাই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এই নিয়ম প্রকাশ করে। এটি আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে, যদি আদালত থেকে কোনো বাধা না আসে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি গত প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি। নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, বর্তমানে প্রচলিত নির্দিষ্ট কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সুবিধা বাতিল করা। বর্তমানে এফ ভিসাধারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, জে ভিসাধারী বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী এবং আই ভিসাধারী আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা সাধারণত তাদের নির্ধারিত উদ্দেশ্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারেন।
বর্তমান ব্যবস্থায় একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক ডিগ্রি শেষ করার পর ঐচ্ছিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, উচ্চতর শিক্ষা বা দ্বিতীয় ডিগ্রি শুরু করতে পারতেন এবং এজন্য সব সময় নতুন করে থাকার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে হতো না। একইভাবে, কোনো গবেষক জে ভিসায় তার গবেষণা প্রকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান করতে পারতেন এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রে থেকে নিজ দেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য কাজ করতে পারতেন।
নতুন নিয়ম কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের থাকার সময়সীমা নির্ধারিত হবে তাদের নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী। তারা তাদের নির্ধারিত প্রোগ্রামের শেষ তারিখ পর্যন্ত অথবা সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারবেন-যেটি আগে শেষ হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে মাত্র ৩০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড। বর্তমানে এফ-১ শিক্ষার্থীদের জন্য যে ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে, নতুন নিয়মে তা কমিয়ে ৩০ দিন করা হচ্ছে। যদি কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাক্রম চার বছরের বেশি সময় ধরে চলে, তাহলে তাকে অতিরিক্ত থাকার জন্য ইউনাইটেড স্টেটস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস)-এর কাছে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে হবে। যারা যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় থাকতে চান, তাদের নতুন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও নতুন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বরের পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী আই ভিসাধারী সাংবাদিকরা তাদের নির্দিষ্ট সংবাদ প্রকল্পের সময়কাল পর্যন্ত অথবা সর্বোচ্চ ২৪০ দিন পর্যন্ত থাকতে পারবেন, যেটি আগে শেষ হবে। তবে চীনের সাংবাদিকদের জন্য সর্বোচ্চ সময়সীমা হবে ৯০ দিন।
নতুন নিয়ম শুধু ভবিষ্যতে আসা ব্যক্তিদের জন্য নয়; ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর যারা এফ জে বা আই স্ট্যাটাসে যুক্তরাষ্ট্রে থাকবেন, তাদের ক্ষেত্রেও নতুন সময়সীমা প্রযোজ্য হবে। যদিও তাদের অবিলম্বে কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে না, তবে ভবিষ্যতে থাকার মেয়াদ নির্ধারিত সীমার মধ্যে পড়বে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো এফ-১ শিক্ষার্থী যদি ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন এবং তার স্নাতক প্রোগ্রাম শেষ হতে আরো তিন বছর বাকি থাকে, তাহলে তিনি তার প্রোগ্রামের শেষ তারিখ পর্যন্ত থাকতে পারবেন। তবে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে চাইলে তাকে নতুন নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করতে হতে পারে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী থাকার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন বিনামূল্যের হবে না। শিক্ষার্থী, গবেষক, বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী বা সাংবাদিকদের প্রতিবার থাকার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ইউনাইটেড স্টেটস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের কাছে আবেদন করতে হবে এবং কমপক্ষে ৪২০ ডলার ফি দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিরিক্ত খরচ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার আর্থিক চাপ আরো বাড়াবে।
নতুন নিয়মে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয় পরিবর্তন এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম বছরে সাধারণভাবে মেজর পরিবর্তন বা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর হতে পারবেন না। শুধু বিশেষ ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে, যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায়, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট (ডিএইচএস) অনুমতি দিতে পারে।
গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ম আরো কঠোর করা হয়েছে। তারা তাদের শিক্ষাগত উদ্দেশ্য পরিবর্তন করতে পারবেন না। অর্থাৎ কোনো শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে মাস্টার্স বা গবেষণা শুরুর পর অন্য ক্ষেত্রে পরিবর্তন করতে চাইলে তার সুযোগ সীমিত থাকবে। তাদের বিকল্প হিসেবে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সুযোগ থাকলেও সেটিও বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থী একটি ডিগ্রি শেষ করার পর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আরেকটি ডিগ্রি নিতে চাইলে সে ডিগ্রিটি অবশ্যই উচ্চতর শিক্ষাগত স্তরের হতে হবে। উদাহরণ হিসেবে, একজন শিক্ষার্থী যদি ব্যবসায় স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন, তাহলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আবার অন্য বিষয়ে আরেকটি স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার জন্য থাকতে পারবেন না। তবে তিনি মাস্টার্স বা উচ্চতর ডিগ্রির জন্য আবেদন করতে পারবেন।
তবে পেশাগত ডিগ্রির ক্ষেত্রে কিছু প্রশ্ন এখনো স্পষ্ট নয়। যেমন-আইন ডিগ্রি (জে.ডি.) মাস্টার্সের সমতুল্য কি না, অথবা মেডিকেল ডিগ্রি (এম.ডি.) পিএইচডির চেয়ে উচ্চতর কি না-এসব বিষয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ভবিষ্যতে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এসব শিক্ষার্থী প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখেন বলে অনুমান করা হয়। তারা শিক্ষা খাতের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পে প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার কর্মসংস্থান সমর্থন করেন।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের বৈধ অভিবাসন সীমিত করার বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে। তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার জন্য আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে এবং গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে আগ্রহ কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। নতুন নিয়ম সরাসরি কোনো শিক্ষার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা থেকে নিষিদ্ধ করছে না। তবে অতিরিক্ত কাগজপত্র, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বাড়তি খরচ অনেক শিক্ষার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে অন্য দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস। বেশিরভাগ বিদেশি শিক্ষার্থী পূর্ণ টিউশন ফি প্রদান করেন, যা অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনায় সহায়তা করে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় কমতে পারে এবং এর প্রভাব আমেরিকান শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিতেও পড়তে পারে বলে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, নতুন নিয়মের মাধ্যমে ভিসা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে এবং যারা নিয়মের অপব্যবহার করেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। তবে সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা এমনিতেই জটিল, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘসূত্রতায় ভরা। নতুন বিধিনিষেধ বিশ্বের মেধাবী শিক্ষার্থী, গবেষক ও পেশাজীবীদের যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।
নতুন ছাত্র ভিসা নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। প্রশাসন এটিকে ভিসা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও সমালোচকদের মতে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রতিভাবান শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারাতে পারে। ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এ নিয়ম আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে কি না এবং শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিই এখন অভিবাসন ও শিক্ষা মহলের অন্যতম বড় প্রশ্ন।