১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৮:২৯:৩২ অপরাহ্ন


জামায়াত-এনসিপি একে অপরকে ছেড়ে যাওয়ার পেছনে কি?
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৬-০৯-২০২৬
জামায়াত-এনসিপি একে অপরকে ছেড়ে যাওয়ার পেছনে কি? জামায়াত-এনসিপির লগো


জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চ চলামান। সেই হিসাবে ঢাকা-রংপুর লংমার্চ হবে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ, শনিবার। ছয়দফা দাবিতে এই লংমার্চে এখন আরেক দফা যুক্ত হয়েছে। গণভোটের রায় কার্যকর, গ্যাস-বিদ্যুৎ-সারের সংকট নিরসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণসহ ছয় দফা দাবিতে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ করে ১১ দল। জেটের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বিরোধী দলের ছয় দফা এখন সাত দফায় পরিণত হয়েছে। আগের ছয় দফার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি। এসব ক্ষেত্রে বিএনপি বিগত ফ্যাসিস্ট আমলকে ছাড়িয়ে গেছে। আর একারণে বলা হচ্ছে সামনের দিনে মানিক মিয়ায় লাখ মানুষ সমাবেশের প্রস্তুতি। আবার সব দফা ছাপিয়ে এই জোটের হুঁশিয়ারি আছে সরকারের বিরুদ্ধে ‘একদফার আন্দোলন’ ডাক দেওয়ার আভাস। 

বিএনপি সাড়া দিচ্ছে?

এদিকে ১১-দলীয় ঐক্যের এমন কর্মসূচির ব্যাপারে সরকারের যে নড়াচাড়া নেই তা নয় কিন্তু। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মুখ খুলেছেন। বলেছেন, গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবার আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুতের জন্য সমগ্র দেশের মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে আমরা আমাদের বিরোধীদলীয় বন্ধুদের কাছে সহযোগিতা আশা করেছিলাম। অথচ আমরা দেখলাম তারা একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করেছেন। বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে, জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। এব্যাপারে সর্বশেষ খবর হলো ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাত থেকেই শিল্প খাতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতি হবে বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বর্তমান সংকটের আগে যে পরিস্থিতি ছিল, সেই জায়গায় আপাতত যাওয়া যাবে।

ঐক্যর মধ্যে এমন খবর কেনো?

সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দালনের মাঝে অন্য খবর-ও আছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচনী জোট যা ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য নামে পরিচিত তাদের একটি অংশ অন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেননা খোদ প্রধান শরিক এখন আর একসাথে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অংশ নেবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে এনসিপি। এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) এনসিপির প্রার্থী দিয়েছেন দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) প্রার্থী হচ্ছেন দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এছাড়াও দরটি সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। আর অন্যদিকে জামায়াত নাম না ঘোষণা করলেও শোনা যাচ্ছে ঢাকা উত্তরে সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে সাদিক কায়েমকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে।

কি কারণে বিচ্ছেদের করুণ সুর?

রাজপথে যখন জামায়াত-এনসিপি সরকারের বিরুদ্ধে একসাথে চষে বেড়াচ্ছে তখন নির্বাচনের মাঠে কোনো এমন খবর এলো? এনিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা শোনা যায়। কারো কারো মতে, এনসিপিকে মাঠে আর কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা আর্থিক সুযোগ দিতে জামায়াতের আগ্রহ নেই। তারা মনে করে এনসিপি জামায়াত ঐক্যের কারণে সংসদে ৬টি আসন পেয়েছে। কিন্তু এনসিপি জামায়াতের সে-ই অবদানকে আমলে নিচ্ছে না। তা-না হলে নির্বাচনী মাঠে সদ্য গঠিত এই দলটি এতোটা আসন পেতো না। উল্লেখ্য ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে ৩০টি আসনে প্রতিদ্ধন্দ্বিতা করে ৬টি আসন লাভ করেছে এনসিপি। জামায়াত মনে করে এটা তাদের সমর্থনের কারণে হয়েছে। তা না হলে এনসিপি যেভাবে রাজনীতির নির্বাচনী মাঠে এনসিপি কোসঠাসা ছিল, সেক্ষেত্রে জামায়াত পাশে না থাকলে তাদেরকে কেউ গুরুত্বই দিতো না। কিন্তু সে-ই জামায়াত এখন মনে করে তারা সামনের দিনগুলিতে আর এনসিপিকে ছাড়া দেবে না। তাছাড়া জামায়াতের কাছে খবর আছে যে এই এনসিপির ভেতের একটি বড়ো অংশ তাদের (জামায়াতের) রাজনীতি পছন্দই করে না। এনসিপির ভেতরে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি ও দলটির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভিন্নমত ও অসন্তোষ রয়েছে, ভবিষ্যতে এটা আরও বিকশিত হবে। এই আশঙ্কা থেকে জামায়াত আগে ভাগে সরে যেতে চায়। 

এনসিপির নিয়ে আরও অনেক হিসাব-নিকাশ

এদিকে জামায়াতের হাইকমান্ড মনে করে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এনসিপি আর-ও কোনঠাসা হয়ে পড়বে। তাই এদের পেছনে জামায়াতের আর্থিক কিংবা সাংগঠনিক ব্যয় দুটো-ই তাদের জন্য বুমেরাং হবে। তাছাড়া এনসিপির তরুণ নেতৃত্বের অনেকের আচরণ জামায়াতের নিজ দলের জন্য ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলেও দলটির ব্যাপারে সর্তক রয়েছে জামায়াত। কেননা মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নের এনসিপির খোলামেলা রাজনৈতিক বক্তব্য জামায়াতের অভ্যন্তরে সাংগঠনিক জটিলতা তৈরির আশঙ্কা আছে। কেননা এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনেকের রুঢ় আচরণে জোটে থাকা একটি দলটি দল সরে যেতে বাধ্য হয়। 

অন্য মত-ও এনসিপিতে

এদিকে এনসিপির ভেতরের রয়েছে ভিন্নমত। কেননা দলটি অনেকেই মনে করে জামায়াতের সাথে জোট করার কারণে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ সমর্থকরা এখন আর নতুন গঠিত দলকে বিশ্বাস করে না। কারণ সাধারণ শিক্ষার্থীসহ জনগণের একটি বিরাট অংশই মনে করেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ব্যানারে কোটা আন্দোলন আসলে কোনো রাজনৈতিক প্লাটফরম না। কিন্তু এখন এরসাথে সে-ই সময়ে যোগ দেওয়া সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের ধারণা কেবল আসনে জয়লাভের আশায় জামায়াতের সাথে জোট করা হয়েছে। একে তারা এখন কোনোভাবে সহজভাবে নিচ্ছে না। একটি পক্ষ মনে করে, ইতোমধ্যে জামায়াতের সঙ্গে জোরালোভাবে যুক্ত থাকলে এনসিপির স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েই গেছে। 

এনসিপি জামায়াত অনেক কিছু দিয়েছে

এদিকে একটি অংশ মনে করে যে, জামায়াত এনসিপির ছাত্র আন্দোলনের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দরকষাকষির সুযোগ করতে পেরেছে। এবং সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে দলটি বিরোধী দলের আসনে বসতে পরেছে। দেশে বিদেশে জামায়াত তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে। কিন্ত এনসিপি এর বিপরীতে জামায়াত থেকে কিছুই আদায় করতে পারেনি বলে দলের ভেতরে ক্ষোভ চলমান। একারণে এনসিপি এখন জামায়াতের বলয়ের বাইরে থাকতে চায় বলে কারো কারো অভিমত। 

জামায়াত দ্যুতিয়ালি করছে

এদিকে এনসিপির এরক অংশের নেতারা মনে করেন তাদের সাথে জামায়াত কার্যত দ্যুতিয়ালি করছে। এনসিপির নেতারা মনে করেন, জামায়াত মুখে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললেও গোপনে তাদের বোঝাপড়ায় আছে। আবার এমন-ও হতে পারে জামায়াত কৌশলে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন আন্দোলন ডাক দিয়ে এনসিপিকে ব্যবহার করে সংসদের ভেতরে-বাইরে কোনো ধরনের সুযোগ আদায় করে নিতে চায়। কেননা গত কয়েকদিনের আন্দোলনে এনসিপির বোধোদয় হয়েছে যে, জামায়াত চাপে রাখার পাশাপাশি একেবারে নিজের দলের নেতাকর্মীদের রাজনীতির মাঠে চাঙ্গা ও বিভিন্ন দেনদরবারে সক্রিয় রাখতে তাদের ব্যবহার কাছে। একটি সূত্র জানায়, এনসিপির অনেকে মনে করেছিলেন তারা শক্ত একটি বিরোধী দল হয়ে বিএনপিকে সংসদেও ভেতরে বাইরে মোকাবেলা করবে। কিন্তু বাস্তবে বর্তমানে জামায়াতকে চাপে রাখতে কিংবা প্রভাব বিস্তার করতে এনসিপির তেমন শক্ত ক্ষমতাই নেই। তা-ই এর সুযোগ নিচ্ছে বলে দলের এক অংশের ধারণা। এদিকে দলটির সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ হচ্ছে যে তারা একদিকে যেমন বিএনপির সহানুভূতি বা সমর্থন পাচ্ছে না, তেমনি জামায়াত থেকে আর্থিক কিংবা সাংগঠনিক সহযোগিতাও মিলছে না। এর পাশাপাশি রাজনীতির মাঠে এনসিপির বিরুদ্ধে সরকারের কোনো তৎপরতাকে ঐক্যবদ্ধভাবেও জামায়াত মোকাবেলা করছে না। এনসিপির নেতাদের মতে, দলটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিএনপি বা ছাত্রদল আক্রমণ বা কোনো ধরনের প্রতিহিংসার আশ্রয় নিলে জামায়াত ও তাদের অঙ্গসংগঠন সাহায্যের হাত বাড়ায় না। আরেকটি সূত্র জানায় যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের টানাপোড়েনের একটা বড় কারণ ছিল সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুসারে বিরোধী দল ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ দাবি করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তারা পেয়েছে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ। অথচ এসব নিয়ে বড়ো ধরনের প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে জামায়াতের সাড়া পায়নি এনসিপি। 

জামায়াত এনসিপির সে-ই মহব্বত আর নেই

এদিকে একটি সূত্র জানায় যে, অর্ন্তর্বতী সরকারের সময়ে জামায়াত-এনসিপির সে-ই মহব্বত আর নেই। কারো কারো মতে, অর্ন্তর্বতী সরকারের সময়ে জামায়াত এনসিপির মধ্যে অনেক মহব্বত ছিল। ওই সময়ে এনসিপির সাথে সম্পৃক্ত বর্তমান নেতৃত্বদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইমেজকে পুঁজি করে রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণমাধ্যমসহ প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জামায়াত শক্ত ভীত তৈরি করে নেয়। এখন এইসব ক্ষেত্রে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি যেনো ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য তারা একধরনের কৌশল হাতে নিয়েছে। অর্থ্যাৎ বিএনপির সাথে গোপনে দেনদরবার ঠিক-ই সেরে নিচ্ছে জামায়াত। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে এনসিপিকে সাথে রাখতে চায় না জামায়াত, যা নেতারা বুঝে ফেলেছেন।

শেয়ার করুন