২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৯:২৩:৪৫ অপরাহ্ন


মেট্রোরেলের ট্র্যাপে বাংলাদেশ?
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৩-০৯-২০২৬
মেট্রোরেলের ট্র্যাপে বাংলাদেশ? মেট্রোরেল


মেট্রোরেলের উপর অতি আগ্রহ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় আমাদেরকে মেট্রোরেলের ট্র্যাপে ফেলে দিয়েছে। যোগাযোগ ও পরিবহনের অন্যান্য সম্ভাবনাগুলোকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এজন্য অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয় ও ঋণঝুঁকি কমাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন নগর ও পরিবহন বিশেষজ্ঞারা। তারা বাসসহ সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ ও মনোযোগ বাড়াতে পরামর্শ দেন। 

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট আইপিডির সম্প্রতি এক অনলাইন আলোচনা এসব পরামর্শ দেওয়া হয়। আলোচনার প্রতিপাদ্য ছিল - “মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা”। 

আলোচনায় উঠে এসেছে যে, ঢাকার মতো শহরে গণপরিবহন হিসেবে মেট্রোরেলের উপযোগিতা আছে কিন্তু সেটা একমাত্র পরিবহন সেবা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। বিগত এক দশকে ঢাকার বাসব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি, বাস রুট রেশনালাইজেশনকে ব্যর্থ করে রাখা হয়েছে। বিআরটি প্রজেক্টে বিনিয়োগ করবার পরেও এক হাজার কোটি টাকার জন্য বিআরটি প্রকল্প চালু করবার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। অথচ তেমন কোন আলোচনা ছাড়াই আড়াই লক্ষ কোটি টাকা দিয়ে নতুন তিনটি মেট্রোরেল অনুমোদন দেয়া হয়েছে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাবে মেট্রোরেল ১ ও মেট্রোরেল ৫ (উত্তর) এ দ্বিগুণের বেশি ব্যয় বেড়েছে, যা আমাদের বিদেশি ঋণের চাপ আরও বাড়িয়ে দিবে- বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। ফলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং উপযোগিতা ও লাভ ক্ষতির যথাযথ বিশ্লেষণ এর মাধ্যমেই মেট্রোরেল ১ ও মেট্রোরেল ৫ (উত্তর) সহ মেট্রোরেল এর যে কোন প্রকল্প অনুমোদন দিতে হবে। 

মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মেট্রোরেলের উপর অতি আগ্রহ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় আমাদেরকে মেট্রোরেলের ট্র্যাপে ফেলে দিয়েছে। যোগাযোগ ও পরিবহন এর অন্যান্য সম্ভাবনাগুলোকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ২০০৫ সালে প্রণীত ঢাকার জন্যে প্রণীত হয়েছিল স্ট্র‍্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট পরিকল্পনা (এসটিপি)। সেখানে বাস যোগাযোগ, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব সুবিধাদির উপর প্রাধান্য দেবার কথা হলেও সেসব জায়গায় বিনিয়োগ করবার আগ্রহ দেখায়নি বিগত সরকারগুলো। বিপরীতে এসটিপিতে ৬০ কিমি এর তিনটি মেট্রোরেল এর প্রস্তাবনা থাকলেও পরবর্তীতে সংশোধিত এসটিপিতে ৬ টি মেট্রোরেল এর ১৪০ কিমি এর বেশি প্রস্তাবনাা দেয়া হয়েছে। সরকার মেট্রোরেল এর মেগা প্রকল্প নিয়ে অতি আগ্রহ আছে, অথচ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে ব্যয় সাশ্রয় করতে উদাসীনতা দেখাচ্ছে। এত বড় প্রকল্প নিয়ে রাজনীতিবিদ, পেশাজীবি ও গণমানুষের সাথে মতবিনিময় ছাড়াই প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। অথচ ঋণের টাকা ও ভর্তূকি দিতে হবে জনগণকেই।

এদিকে আইপিডির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে এমআরটি ৫ (দক্ষিণ) এ প্রতি কিমি ২৬৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে জাইকার অর্থায়নে কিমিপ্রতি এমআরটি ১ এর ব্যয় ৩৬৬১ কোটি ও এমআরটি ৫ (উত্তর) এর ব্যয় ৪৪৯২ কোটি টাকা। ব্যয়ের এই তারতম্য প্রতিযোগিতার অভাবে দেশের ক্ষতির বিষয়টি স্পষ্ট করেছে বলে মনে করে আইপিডি। একই সাথে একনেক এর কার্যতালিকায় না থাকবার পরেও তড়িঘড়ি করে এমআরটি ১ ও এমআরটি ৫ (উত্তর) এর অনুমোদনকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি কমলাপুর-এয়ারপোর্ট-জয়দেবপুর রেলপথে দ্রুতগতির কমিউটার ট্রেন চালু করবার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্বেও এই লাইনকে সেভাবে কার্যকর করা হয়নি। অথচ এই লাইনের সমান্তরালেই লক্ষ কোটি টাকার অধিক পাতাল মেট্রোরেল করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মত সীমিত আর্থিক সক্ষমতার দেশের জন্য পরিকল্পনাগত দৃষ্টিতে উদ্বেগজনক। কুড়িল-পূর্বাচলে ব্যয়সাশ্রয়ী বিআরটি করবার সুযোগকেও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এভাবে ঢাকার মেট্রোরেল এর অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিকল্প বিআরটি, এলআরটি বা লাইট রেল ট্রানজিট, মনোরেল, কমিউটার রেল, বাস রুট রেশনালাইজেশন ও উন্নত বাস সার্ভিস- এই ধরনের বিকল্পগুলো বিবেচনায় না নিয়েই ব্যয়বহুল মেট্রোরেল প্রকল্প একের পর এক পরিকল্পনা ও অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। ফলে লংঘিত হচ্ছে পরিবহন পরিকল্পনার ভারসাম্য। 

আইপিডির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, দেশের আড়াই লক্ষ টাকার মেট্রোরেল যখন অনুমোদন দেয়া হচ্ছে, তখন রেলের ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ সংকট এর কারণে একের পর এক লোকাল ট্রেন ও মেইল ট্রেন বন্ধ হচ্ছে। ইঞ্জিন এর অভাবে মালবাহী ট্রেনগুলো পর্যন্ত ঠিকমতো চলাচল করতে পারছে না। দেশের রেলকেন্দ্রিক উন্নয়ন এর এই পরিকল্পনা বৈষম্যপূর্ণ এবং ভারসাম্যহীন। 

আইপিডির অনুষ্ঠানের আলোচক পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, মেট্রোরেল কোথায় করা হবে, কখন করা হবে এবং কোথায় গিয়ে এর সম্প্রসারণ থামানো হবে-এসব বিষয় ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (STP) নথিতেই উল্লেখ ছিল। তাঁর মতে, মেট্রোর পাশাপাশি বাস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন জরুরি। শহরের প্রয়োজন অনুযায়ী মেট্রোরেল করা যেতে পারে, তবে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে মেট্রোকে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

বিআইপি সভাপতি ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বা competitive bidding নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, কোনো প্রকল্পে যে ব্যয় অনুমোদন করা হচ্ছে, সেটি প্রকৃতপক্ষে যৌক্তিক ও ন্যায্য কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

আইপিডির রিসার্চ ফেলো ও স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষককে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, “মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে এত ব্যাপক ব্যয় বৃদ্ধি নিছক আর্থিক সমন্বয় নয়; এটি আমাদের প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় প্রাক্কলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। জনগণের অর্থ ও বৈদেশিক ঋণে পরিচালিত প্রকল্পে বারবার ব্যয় সংশোধনকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।

শেয়ার করুন