ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা
যুক্তরাষ্ট্রে অনথিভুক্ত অভিবাসী শিশুদের সরকারি স্কুলে পড়ার অধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালে টেনেসি, টেক্সাস, ওকলাহোমা, ইন্ডিয়ানা ও নিউ জার্সিসহ কয়েকটি স্টেটে এমন কিছু আইন ও প্রস্তাব সামনে এসেছে, যেগুলো অনথিভুক্ত শিক্ষার্থীদের সরকারি শিক্ষায় প্রবেশাধিকার, অভিবাসন-অবস্থা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং শিক্ষার জন্য অর্থ নেওয়ার বিষয়কে সামনে এনেছে। কোনো কোনো প্রস্তাবে স্কুলগুলোকে শিক্ষার্থীদের অভিবাসন-অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। আবার কোথাও বৈধ অভিবাসন-অবস্থার প্রমাণ দিতে না পারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন নেওয়া বা সরকারি স্কুলে ভর্তি সীমিত করার প্রস্তাব এসেছে। এসব উদ্যোগের কারণে চার দশকের বেশি সময় ধরে বহাল থাকা সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় আবারও জাতীয় আলোচনায় এসেছে।
১৯৮২ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্লাইলার ভার্সেস ডো মামলায় টেক্সাসের একটি আইন নিয়ে রায় দেয়। ওই আইনে বৈধ অভিবাসন-অবস্থার প্রমাণ দিতে না পারা শিশুদের সরকারি স্কুলে ভর্তি সীমিত করা এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে টিউশন নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাঁচ-চার ভোটের সিদ্ধান্তে সুপ্রিম কোর্ট ওই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আদালত চতুর্দশ সংশোধনীর ইকুয়াল প্রোটেকশন ক্লজের আলোকে সিদ্ধান্ত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কোনো শিশুকে শুধু তার অভিবাসন-অবস্থার কারণে বিনামূল্যের সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এরপর থেকে প্লাইলার ভার্সেস ডো রায় অনথিভুক্ত শিশুদের কে-টু-টুয়েলভ সরকারি শিক্ষার অধিকার রক্ষার অন্যতম প্রধান আইনি ভিত্তি হয়ে আছে।
নতুন প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কিছুতে স্কুলগুলোকে শিক্ষার্থীদের অভিবাসন-অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও সরকারি কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু প্রস্তাবে বৈধ অভিবাসন-অবস্থার প্রমাণ দিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন আরোপের কথা বলা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের সমর্থকেরা অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য জানা এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর নিজস্ব নীতি নির্ধারণের সুযোগ থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে বিরোধীরা আশঙ্কা করছেন, স্কুলে অভিবাসন-অবস্থা নিয়ে তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা অভিবাসী পরিবারগুলোকে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
ওকলাহোমায় শিক্ষার্থীদের অভিবাসন-অবস্থা সংগ্রহ ও রিপোর্ট করার উদ্যোগ নিয়ে ২০২৬ সালে ব্যাপক বিতর্ক হয়। গভর্নর কেভিন স্টিট এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ছোট শিশুদের ঠিকানা ও অভিবাসন-অবস্থা সংগ্রহকে জননিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। স্টিটের মতে, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয় যার কারণে শিশুরা স্কুলে যেতে ভয় পায়। শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ এবং একই ধরনের বিধান থাকা একটি বিল অনুমোদিত হয়নি।
অনথিভুক্ত শিশুদের শিক্ষার অধিকার সীমিত করার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নয়। ১৯৯৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রপোজিশন ১৮৭ নামে একটি উদ্যোগ অনুমোদিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিভিন্ন সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করা হয়। শিক্ষার বিষয়টিও এর আওতায় ছিল। পরবর্তীতে ফেডারেল আদালতে এসব বিধান চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হয়।
২০১১ সালে আলাবামা এইচবি ৫৬ নামে একটি আইন পাস করে। এর একটি বিধানে স্কুল প্রশাসকদের কিছু নতুন শিক্ষার্থীর বৈধ অভিবাসন-অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও রিপোর্ট করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পরে ফেডারেল আপিল আদালতের আইনি প্রক্রিয়ায় ওই বিধান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০১৩ সালের একটি সমঝোতার মাধ্যমে আলাবামা ওই বিধান পরিত্যাগ করে।
অনথিভুক্ত শিশুদের সরকারি শিক্ষা দেওয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও মতভেদ রয়েছে। শিক্ষার পক্ষে করা বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকারি কে-টু-টুয়েলভ শিক্ষা পাওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে কর্মশক্তিতে যোগ দিতে পারে এবং কর প্রদানসহ অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি, পরিবহন ও অন্যান্য খাতে শিক্ষিত কর্মীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে-এমন যুক্তিও তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় অতিরিক্ত ব্যয় এবং সীমিত সরকারি সম্পদের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।ফলে বিতর্কটি শুধু সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রাজ্য সরকারের ব্যয়, কর-অবদান, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাবও জড়িত।
বর্তমানে প্লাইলার ভার্সেস ডো রায় যুক্তরাষ্ট্রে অনথিভুক্ত শিশুদের কে-টু-টুয়েলভ সরকারি শিক্ষার অধিকারের প্রধান আইনি ভিত্তি হিসেবে বহাল রয়েছে। তবে নতুন স্টেট আইন ও প্রস্তাবগুলো এই অধিকারের সীমা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষার্থীদের অভিবাসন-অবস্থা কতটা সংগ্রহ করা যাবে, সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা যাবে এবং অভিবাসন-অবস্থার ভিত্তিতে সরকারি শিক্ষায় কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা যাবে কি না ,এসব বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।নতুন কোনো আইন কার্যকর হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তখন সুপ্রিম কোর্টের ১৯৮২ সালের রায় এবং চতুর্দশ সংশোধনীর ইকুয়াল প্রোটেকশন ক্লজের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনথিভুক্ত শিশুদের সরকারি শিক্ষার অধিকার নিয়ে বর্তমান বিতর্ক তাই শুধু অভিবাসননীতির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংবিধানিক অধিকার, অঙ্গরাজ্য সরকারের ক্ষমতা, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব। চার দশকের বেশি সময় ধরে বহাল থাকা প্লাইলার ভার্সেস ডো রায়ের ভবিষ্যৎ প্রয়োগ নিয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর নতুন উদ্যোগ সেই বিতর্ককে আরো সামনে নিয়ে এসেছে।