২২ জুন ২০১২, শনিবার, ০৩:৪৩:৩৪ অপরাহ্ন


জামায়াত নিয়ে কি ম্যাসেজ মির্জা ফখরুলের?
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৫-০৬-২০২৪
জামায়াত নিয়ে কি ম্যাসেজ মির্জা ফখরুলের?


মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরোধীতাকারী মৌলবাদি সাম্প্রদায়িক সংগঠন জামায়াতে ইসলামী’কে নিয়ে দেয়া একটি বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। এমন বক্তব্যকে কেউ কেউ মনে করেন সামনের দিনে বিএনপি’র সাথে জামায়াতের সম্পর্কটি আসলে কেমন হবে তার একটি আভাস মেলে। আবার কারো কারো মতে, মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাথে জামায়াতে ইসলামী’র সম্পর্কটা কতটা হালকা তার-ই জানান দেয়া হয়েছে মির্জা ফখরুল মেসেজে। 

কি বলেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর?

অনুষ্ঠানটি ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম) ৪৩তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভার। ২ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা অনুষ্ঠানে সবাই অধীর আগ্রহে ছিল সরকার ও বর্তমান রাজনীতির পাশাপাশি দলের আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে কি বলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর? কিন্তু সব ছাপিয়ে বলে ফেলেন ‘আমি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি সমর্থন করি না। যা নিয়েই মূলত তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। এর পরে অবশ্য আরো কিছু কথা বলেছেন তিনি। বলেছেন, ‘কিন্তু তাদের রাজনীতির যে কৌশল, তা অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। ঠিক কমিউনিস্ট পার্টির মতো।’

এর জবাবে ওবায়দুল কাদের যা বললেন...

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আওয়ামী লীগকে লক্ষ্য করে কোনো বক্তব্য দেননি। কিন্তু তারপরেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেয়া বক্তব্যের সূত্র ধরে মন্তব্য বা জবাব দেন। আবাক কাণ্ড আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়ার সই করা গণমাধ্যমে পাঠানো হয় ওবায়দুল কাদেরের বিবৃতিটি। এতে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তি জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে এসব কথা আবারও প্রমাণিত হয়েছে যে, তারা যেখানেই যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতসহ সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে বিএনপির গভীর বন্ধন রয়েছে। বিএনপির মহাসচিবের ওই বক্তব্যের জবাব দিতেই ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, ‘জামায়াত নিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা সুস্পষ্টভাবে অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক। জামায়াতের রাজনীতি বাংলাদেশের মূল চেতনা, মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও স্বাধীনতার মূল্যবোধের পরিপন্থী। রাজনীতির এই ধারা বারবার দেশবিরোধী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক কখনোই ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রচিত সংবিধান ও রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনাবিরোধী রাজনীতিকে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দিতে পারে না। যাদের রাজনীতি দেশের ভিত্তিমূলে আঘাত হানে, তাদের কৌশলও কখনো বিজ্ঞানসম্মত বা যৌক্তিক হতে পারে না।’ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অভিযোগ করেন, মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে প্রগতিশীলতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখা তাঁর আসল চেহারা উন্মোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে উসকানি দেওয়ার দুরভিসন্ধি প্রকাশিত হয়েছে।

বিশ্লেষণ কি বলে

মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতে ইসলামী সর্ম্পকে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে থেকে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে কেউ কেউ তার এমন বক্তব্যকে হেডিং করেছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় ‘জামায়াতের রাজনীতির প্রশংসা করলেন ফখরুল’। কেউ বলেছেন, জামায়াতের রাজনীতি সমর্থন না করলেও প্রশংসা করলেন ফখরুল”। আবার কারো নিউজের হেডিং ছিল ‘জামায়াতের রাজনীতি সমর্থন না করলেও কৌশলে প্রশংসা মির্জা ফখরুলের’। কেউ হেডিং দিয়েছে,‘ জামায়াত-শিবিরের জ্ঞানচর্চা প্রশংসার দাবিদার : ফখরুল’। প্রশ্ন হচ্ছে বিষয়টি কি আসলেও ছিল তাই? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোটেও না। এমনকি কৌশলী বক্তব্য না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যটি সামনের দিনের বাংলাদেশের রাজনীতির একটা ধারণা পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট করে দেয়া হলো যে বিএনপি কোনোভাবেই জামায়াতের রাজনীতি পছন্দ করে না, আর করতে যাচ্ছে না, অন্ততপক্ষে দলের হাই কমান্ডের মতে। এর পাশাপাশি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপি’র মৃদু সমালোচনা করে হলেও এটি বুঝিয়ে দিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরোধীতাকারী মৌলবাদি সাম্প্রদায়িক সংগঠন জামায়াতে ইসলামী’কে কিভাবে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। বুঝিয়ে দিলেন, স্টাডি সেল, লেখাপড়া, বইপত্র পড়ার পাশাপাশি জ্ঞানের চর্চা যদি না থাকে, জ্ঞানচর্চা ছাড়া কখনো সফল হতে পারবেন না।’ কখনো সফল মানে বুঝিয়েছেন জামায়াতের বিরোধীতা এভাবেই করতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরো মনে করেন মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেবল জামায়াতে ইসলামী’র কথা বলেননি। বলেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কথা। তাছাড়া কেউ যদি প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত অই আলোচনা অনুষ্ঠানটি লক্ষ্য করে তাহলে মির্জা ফখরুলের বডি লেংগুইজটি অনুসরণ করলে দেখা যাবে আসলে তিনি (মির্জা ফখরুল) কি বোঝাতে চাইলেন। এধরনের বক্তব্য দেয়ার সময় মির্জা ফখরুলের বডি লেংগুইজটি ছিল খুবই ভিন্ন মাত্রায়। স্পষ্টত বোঝা যায় যে জামায়াতে ইসলামী’র রাজনীতি তিনি বা তার দলের অবস্থান আসলে নেতিবাচকই। কেননা এবছরে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে রমজান মাসে আট বছর পর কেন্দ্রীয়ভাবে যে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়, তাতে আমন্ত্রিত হয়েও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন না। কারো কারো মতে মির্জা ফখরুল কোনোভাবেই জামায়াতের পক্ষের লোক না। শোনা যায়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই প্রথম ব্যক্তি যিনি জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্যে ঐক্যের বিরোধীতা করেছিলেন। কাজেই এই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারো পরামর্শে বা কোনো ধরনের চাপে বা কৌশলে জামায়াতের রাজনীতির প্রশংসা করবেন, তা ভাবাই যায় না। কারো কারো মতে, সম্প্রতি ‘দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা নির্মূল হবে, তাদের পদচিহ্নও থাকবে না’- রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এর এমন বক্তব্য নিয়েও বিএনপি’র ভেতরে একটা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরোধীতাকারী মৌলবাদি সাম্প্রদায়িক সংগঠন জামায়াতে ইসলামী নামের দলটিকে নিয়ে সরকার আবারো কোনো ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। সেক্ষেত্রে যদি জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার না করেন তাহলে বিএনপি’র সাথে গড়ে উঠা প্রগতিশীল উদার গণতন্ত্রমনা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দলগুলি সরে পড়তে পারে। আবারো পুরোনো বির্তকে বিএনপি’র মুক্তিযুদ্ধের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 

শেষ কথা

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কি কারণে এধরনের বক্তব্যটি দেয়া হয়েছে তার চুলচেড়া বিশ্লেষণ না করে একেক জন একেকজনের মতো করে তাদের পক্ষে নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড়ো ঘটনা হলো কেনো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এতো তড়িং গতিতে জামায়াত সম্পর্কে মির্জা ফখরুলের এমন বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতেই বোঝা যায় যে, বিয়য়টি আসলে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। অন্যভাবে বলতে গেলে বলা যায় এটা আসলে কা-কে আক্রমণ করেছে। পুরো বিষয়টির ফলো আপই দেখা যাবে আগামীতে রাজনীতির মাঠে-এমনটাই ধারণা বিশ্লেষকদের। কেননা অনেকে মনে করেন, প্রায় দীর্ঘ বছর ধরে জামায়াতে ইসলামী’কে একপ্রকার বাদ দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যাচ্ছে। বিএনপি আন্দোলনে মাঠে প্রগতিশীল উদার গণতন্ত্রমনা এমনকি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ইসলামী দলগুলির সাথে একধরণের কৌশলী সমর্থন নিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাঠে আছে। এটা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য একটা ঈর্ষণীয়। আর একারণে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতসহ সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে বিএনপির গভীর বন্ধন রয়েছে-এমন পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে আন্দোলনের মাঠে প্রগতিশীল উদার গণতন্ত্রমনাও পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ইসলামী দলগুলির বিভ্রান্ত করতে তাৎক্ষণিকভাবে বিবৃতি দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। 

শেয়ার করুন