উচ্ছৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিবেশ, বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, সংঘর্ষে বিপর্যস্ত, ক্রম অবনতিশীল ভঙ্গুর অর্থনীতির বাংলাদেশ নিয়ে এখন সচেতন বাংলাদেশিরা উদ্বিগ্ন। ২০২৪ জুলাই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে সাধারণ জনগণ সমাজে বা রাষ্ট্রীয় জীবনে বৈষম্যবিরোধী এবং সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক নতুন ব্যবস্থা প্রত্যাশা করেছিল, দুঃখজনক হলেও সত্যি তার কিছুই হয়নি। সর্বগ্রাসী দুর্নীতি বন্ধ হয়নি, মামলা-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব বেড়েছে। যোগ হয়েছে মব সন্ত্রাস, বিরুদ্ধ মতকে টুঁটি চেপে হত্যা করার প্রবণতা। পূর্ববর্তী সরকারকে যেসব দোষে দোষী করা হয়েছিল আগস্ট ২০২৪ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সেগুলোর কিছুরই অবসান ঘটেনি। বরং অনির্বাচিত ক্ষণস্থায়ী সরকারের আমলে যেকোনো সময়ে যে কোনো গোষ্ঠী দাবিদাওয়া নিয়ে ঘেরাও থেকে মব সন্ত্রাস সৃষ্টি করে জনজীবন অস্থির করে তুলেছে। সরকার দুর্বল ব্যবস্থাপনা অথবা কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের কারণে নিস্পৃহ থেকেছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দেশ জুড়ে মব সন্ত্রাস অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা আর দুর্বলতার প্রমাণ। হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা বিষয়ে আগাম আভাস থাকলেও সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি হাদির নামাজে জানাজা পরবর্তী দেশব্যাপী লঙ্কাকাণ্ড সামাল দিতেও সরকারের ব্যর্থতা ছিল লজ্জাজনক। এসব বিষয়ে সরকারের কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।
স্মরণীয় যে, আগস্ট পরিবর্তনের পর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে মব সন্ত্রাস চালায়। ভাঙচুর, অগ্নিকাণ্ডের শিকার মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্থাপনা, স্মারক, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে কয়েক দফা চালানো হয় ধ্বংসযজ্ঞ, মব সন্ত্রাস থেকে রক্ষা পায়নি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, মেহেরপুরের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার শপথের ঐতিহাসিক স্থানের স্মারকসমূহ। বিস্মৃত করার অপচেষ্টা হয় ৭ মার্চ, জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধের বীরদের স্মৃতি। এগুলো কাজ সরকার আশ্রিত এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা একটি গোষ্ঠী করছে সন্দেহ নেই। একই গোষ্ঠী হাদির জানাজা অনুষ্ঠান এবং দাফনের দিনে দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে মব সন্ত্রাস চালায়, ছায়ানট ও উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক সংস্থার কার্যালয়ে ভাঙচুর, লুটপাট করে, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রামে ভারতীয় দূতাবাসের কার্যালয়সমূহে আগ্রাসন চালায়। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার জন্য এগুলো অপপ্রয়াস সন্দেহ নেই। মাঠে আছে বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে সেনাবাহিনী। অথচ কেন চেনা গোষ্ঠীর ধ্বংসাত্মক প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না?
সন্দেহ নেই ভারত স্বাধীনতার পর থেকেই নানাভাবে বাংলাদেশকে নিজেদের স্বার্থে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু এটিও ভৌগোলিক বাস্তবতা ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বৈরী অবস্থান সৃষ্টি করে কোনোভাবেই স্বস্তিতে থাকবে না। ভারত ভীতি বা ভারত প্রীতি কোনোটাই কাম্য নয়। কিন্তু জনসাধারণ যেন দেশ থেকে পালানো এবং ২৪-এর পর দেশে ফেরা একটি চিহ্নিত দুষ্টচক্রের প্ররোচনায় পথভ্রষ্ট হয়ে ভারতের সঙ্গে সংঘাত পূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে। ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক অবশ্যই পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর সহমর্মিতাভিত্তিক হওয়া উচিত।
নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার পর প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীন। জানতে ইচ্ছা হয় বাংলাদেশের সর্বকালের সবচেয়ে উত্তম নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করা অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র ৫০ দিনের কম সময়ে অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কতটুকু প্রস্তুত?
এরই মাঝে দেশে ফিরেছেন দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। স্মরণীয় যে ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশ ছেড়ে পরিবারসহ বিদেশে যান তারেক রহমান। আওয়ামী সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে নানা মামলায় যাবৎ জীবন কারাদণ্ডসহ নানা দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ২০২৪ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সব দণ্ড, সব মামলা থেকেই আইনগতভাবে মুক্ত হয়ে তারেক রহমান এসেছেন বাংলাদেশে। বিএনপির চেয়ারম্যান তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় এখনো এভারকেয়ার হসপিটালে চিকিৎসাধীন। অপর প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে জয়ের প্রধান সম্ভাবনাপূর্ণ দল বিএনপি। বিদেশে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফিরে এসে হাল ধরায় বিএনপির নির্বাচনী শক্তি সুসংহত হয়েছে সন্দেহ নেই। সরকার তারেক জিয়ার নিরাপত্তা বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে আশা করি। দেশজুড়ে ধীরে ধীরে নির্বাচনী জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তবে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে সেটি ভবিষ্যৎ বলে দেবে।
যে যেই ধরনের ন্যারেটিভ সৃষ্টি করুক না কেন বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো দুটি মেরু। একটি স্বাধীনতার আদর্শে লালিত রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী অপরটি স্বাধীনতা-বিরোধী গোষ্ঠী। ১৯৭২ থেকে ২০২৪ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির শাসন বা অপশাসন দেখেছে। একাত্তরে স্বাধীনতা আন্দোলনে বিরোধিতাকারী জামায়াত কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। বর্তমানে কিন্তু জামায়াত কৌশলগতভাবে বিশাল শক্তির অধিকারী। ২০২৪ সরকার পরিবর্তনে জামায়াত এবং জামায়াতের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন এবং গুপ্ত সংগঠনের বিশাল ভূমিকা ছিল। বর্তমানে সেনাবাহিনী, সরকারি সংস্থাসহ বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের অনেক শুভাকাক্সক্ষী আছে। আসন্ন নির্বাচন মূলত বিএনপি বনাম জামায়াতের মল্লযুদ্ধ। প্রান্তিক দলগুলো থেকেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট কিন্তু ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। বৈষয়িক চাপে শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আসবে না সেটি নিশ্চিত।
যাক, সেই প্রসঙ্গ নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন এবং সরকারকে অবিলম্বে শান্তি-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাতে হবে, নিরাপত্তা বিষয়ে জনমনে স্বস্তি এবং আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো এবং সুশীল সমাজকেও ভূমিকা নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই আসন্ন নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল, আবার সেখানে গণভোটের বিষয় আছে। আশা করি, নির্বাচনের ট্রেন যথাসময়ে বাংলাদেশকে সঠিক স্থানে পৌঁছে দেবে।