সাধারণ সভায় মঞ্চে সোসাইটির কর্মকর্তাবৃন্দ
প্রবাসের অন্যতম মাদার সংগঠন হিসাবে পরিচিত বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সভা সামান্য বাগ্বিতণ্ডা ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শেষ হয়েছে। এই সামান্য বাগ্বিতণ্ডাও হতো না, যদি সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী তার রিপোর্টে বিগত কমিটির ওপর ক্ষেত্রবিশেষে দুভাবে দোষ চাপানোর চেষ্টা না করতেন। এই দোষা চাপানোর চেষ্টাকে কেন্দ্র করেই তর্ক- বিতর্ক হয়েছে। বিগত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী তার ওপর চাপানো দোষ খণ্ডনের চেষ্টা করেছেন। কোষাধ্যক্ষ নওশাদ হোসেন দোষ খণ্ডনের চেষ্টা করেছেন আবার বর্তমান কমিটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী এবং কোষাধ্যক্ষ মফিজুর রহমান ভূঁইয়া রুমি তাদের রিপোর্ট সত্য প্রমাণ করতে ছিলেন মরিয়া। কিন্তু ঘি ঢেলে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন। তিনি যার বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তার বা তাদের বক্তব্য না শুনেই তাদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। সেই কাজটি করতে গিয়ে অডিয়েন্স থেকে প্রতিবাদ আসে। শেষ পর্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণভাবেই শেষ করেন এই পর্ব। এই সাধারণ সভায় বাংলাদেশ সোসাইটির গত এক বছরের হিসাব উপস্থাপন করা হয়। তাতে দেখা যায় এই এক বছরে বাংলাদেশ সোসাইটির আয় হয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৭০৩ ডলার এবং খরচ হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৯৯৫ ডলার। অর্থাৎ লস হয়েছে ৬৪ হাজার ২৯১ ডলার। আরো কিছু স্বজনপ্রীতির বিল দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আয় এককভাবে দেখানো হলেও বড় কয়েকটি অনুষ্ঠানে ব্যয় একসঙ্গে দেখানো হয়েছে। যার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ৯০৯ ডলার। কিন্তু কেন? বাংলাদেশ সোসাইটির ব্যাংকে রয়েছে ৭১ হাজার ৩৮২ ডলার। তারা ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৪ ডলার। বাংলাদেশ সেমিট্রি থেকে কবর ক্রয়ের ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ফেরত দেওয়ার জন্য বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম। অন্যদিকে সাধারণ সভাটি পরিকল্পিত ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেল হাসান জিলানীর কর্মকাণ্ডে। রুহুল আমিন সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে যেহেতু অভিযোগের তীর, প্রথমেই তিনি দাঁড়ালেন, কিন্তু তাকে মাইক না দিয়ে সাধারণ সম্পাদক অন্যকে দেয়ার চেষ্টা করেন। অডিয়েন্স প্রতিবাদ করলে, সাবেক অন্য আরেক সাধারণ সম্পাদককে দেয়া হয়। তারপরও রুহুল আমিন সিদ্দিকী দেওয়া হচ্ছিল। রুহুল আমিন মাইক নেওয়ার চেষ্টা করলে হাসান জিলানী মাইন নিয়ে অন্যদিকে চলে যান, তাও প্রকাশ্যে, সবার সামনে। পরে সভাপতি ধমক দিয়ে বললে মাইন দেন হাসান জিলানী।
বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সভাটি গত ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় উডসাইডের কুইন্স প্যালেসে অনুষ্ঠিত হয়। সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিমের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর পরিচালনায় মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও গোল্ডেন এজ হোম কেয়ারের প্রেসিডেন্ট শাহ নেওয়াজ, গঠনতন্ত্র সংশোধনী কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন খান, বাংলাদেশ সোসাইটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দিন দেওয়ান, ভাইস প্রেসিডেন্ট কামরুজ্জামান কামরুল, কোষাধ্যক্ষ মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া রুমি, সহ-সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম ভূইয়া।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন-বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সভাপতি ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম আজিজ, বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য আব্দুর রহিম হাওলাদার, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সভাপতি আজমল হোসেন কুনু, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন, রুহুল আমিন সিদ্দিকী, ফখরুল আলম, সাবেক কোষাধ্যক্ষ নওশাদ হোসেন, সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক বাবুল চৌধুরী, সাবেক কর্মকর্তা কাজী তোফায়েল আহমেদ, জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বদরুল হোসেন খান, বৃহত্তর কুমিল্লা সমিতির সভাপতি ইউনুছ সরকার, মেহেদী হাসান, সাবেক কর্মকর্তা জামান তপন, সন্দ্বীপ সোসাইটির সভাপতি ফিরোজ আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রানা ফেরদৌস চৌধুরী, সাবেক কর্মকর্তা ফারুক হোসেন মজুমদার প্রমুখ।
আতাউর রহমান সেলিম সবাইকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে এই সংগঠন যারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। তিনি বলেন, এক বছর আগে আপনারা আমাদের যে দায়িত্ব দিয়েছেন আমরা তা পালন করার চেষ্টা করছি। নির্বাচনের সময় আপনাদের আমরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা পালনের চেষ্টা করছি। সোসাইটির ৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান করেছি। আমরা কমিউনিটি সেন্টারের জন্য ৪.৯ মিলিয়র ডলারে একটি ভবন ক্রয়ের জন্য চুক্তি করেছি। আমাদের আইনজীবীরা এখন সব কিছু পরীক্ষা করছে। সব ঠিক থাকলে আমরা এই ভবন ক্রয় করবো।
সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী তার রিপোর্ট পেশ করেন। যারা মধ্যে উল্লেখ রয়েছে অভিষেক ও শপথ গ্রহণ, কার্যকরি পরিষদের প্রথম সভা, কার্যকরি কমিটি ও ট্রাস্টি বোর্ডের সভা, ইমিগ্রেশন বিষয়ক সেমিনার, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন, মামুন রশীদের উপর হামলার প্রতিবাদ বিক্ষোভ, ইফতার ও দোয়া মাহফিল, গ্রেসি ম্যানসনে বাংলাদেশ হ্যারিটেজ ডে পালন, বাংলাদেশ ডে প্যারেডের আয়োজন, ট্রাস্টি বোর্ড গঠন, কনস্যুলেটে ফি কমানোর দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান, বাংলাদেশ সোসাইটির কমিউনিটি সেন্টার, স্মল বিজনেস সার্ভিসেস ওয়ার্কশপ, পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলাম ও বাংলাদেশে মাইনস্টোনে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্য শোকসভা ও দোয়া মাহফিল, কন্স্যাল জেনারেলের সঙ্গে মতবিনিময়, সিটি, স্টেট ও ফেডারেল ফান্ড প্রাপ্তির লক্ষ্যে সভা, টি-২০ ক্রিকেপ টুর্নামেন্টের আয়োজন, এনআইডি বিষয় সেমিনার, আজীবন সদস্য সংগ্রহ, ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন, বিজয় দিবস ও থ্যাংকসগিভিং উদযাপন, কবরস্থান সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য, সোসাইটির মানবিক কার্যক্রম, চলমান মামলা, ভায়লেস, ট্যাক্স, অনলাইন মেম্বারশিপ আবেদন ব্যবস্থা।
কোষাধ্যক্ষ মফিজুর রহমান ভূঁইয়া রুমির রিপোর্টের প্রশ্ন উত্তর পর্ব শুরু হয়।
ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ বলেন, বাংলাদেশ সোসাইটির কর্মকর্তারা এমন কোন কাজ করবে না, যা সোসাইটির জন্য ক্ষতির কারণ হয়। এই ভবন যদি আমাদের জন্য সমস্যা হয়, তাহলে আমরা এটি ক্রয় করবো না। অর্থ ফেরত নেবো। আমাদের আইনজীবীরা কাজ করছেন। তিনি আরো বলেন, ১ লাখ ২০ হাজার ডলার সোসাইটির ভবনের জন্য দিয়েছি, প্রয়োজনে আরো দেবো।
সাবেক ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম আজিজ বলেন, আমরা এই সংগঠন পরিচালনা করেছি, অভিষেক অনুষ্ঠানসহ ছোট ছোট অনুষ্ঠান আমরা নিজেদের অর্থে করেছি কিন্তু আপনারা তা না করে সোসাইটির ফান্ড কেন খরচ করছেন। তিনি নতুন ভবন নিয়ে বলেন, এমন কোন কাজ করবেন না, যাতে সোসাইটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত দোয়া পরিচালনা করেন সমাজকল্যাণ সম্পাদক জামিল আনসারী। গীতা পাঠ করেন গণেশ কীর্ত্তনিয়া। প্রচার করা হয় বাংলাদেশ ও আমেরিকার জাতীয় সংগীত। ১ মিনিট দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো হয় সকল মুক্তিযোদ্ধাদের যারা জীবন দিয়েছেন এবং সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন।