জুলাই আন্দোলনের দৃশ্য
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ অধ্যাদেশের ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করে প্রত্যাহার করা হবে। এছাড়া নতুন কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে আইনত বাধা (বারিত) হবে।
রাষ্ট্রপতি ২৫ জানুয়ারি ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছেন বলে আইন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। এর আগে ১৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।
অধ্যাদেশে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতাকে ‘গণঅভ্যুত্থানকারী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করার কারণে করা হয়ে থাকলে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকার নিযুক্ত কোনো আইনজীবী এ প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করবেন। এ আবেদনের পর আদালত ওই মামলা বা কার্যধারা সম্পর্কে আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করবেন না। তা প্রত্যাহার বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিলম্বে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা ক্ষেত্রমতে খালাসপ্রাপ্ত হবেন।
অধ্যাদেশে বলা হয়, এ বিধান সত্ত্বেও কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ থাকলে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করা যাবে এবং কমিশন এই অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে যে ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, সে ক্ষেত্রে কমিশন ওই প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর বর্তমান বা পূর্বে কর্মরত কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন না। তদন্ত চলাকালে আসামিকে গ্রেফতার বা হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করে আগে কমিশনের অনুমোদন নেবেন।
অধ্যাদেশে আরো বলা হয়, যে ক্ষেত্রে কমিশনের তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে অভিযোগে উল্লিখিত কার্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার ছিল, সে ক্ষেত্রে কমিশন সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর আদালত ওই প্রতিবেদনকে পুলিশ প্রতিবেদন সমতুল্য গণ্য করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবেন।
এছাড়া যে ক্ষেত্রে কমিশনের তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে অভিযোগে উল্লিখিত কার্য রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, সে ক্ষেত্রে কমিশন মনে করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে আদেশ দিতে পারবে। এক্ষেত্রে কোনো আদালতে সংশ্লিষ্ট কার্য-সম্পর্কিত কোনো মামলা করা যাবে না কিংবা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাবে না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যে দাবি
এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৪ জানুয়ারি তিন দফা দাবি তুলে ধরে। এর মধ্যে ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতাকে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত সব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। মূলত ওই দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে।
তখনই আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সৈনিকরা জীবনবাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছে। তারা অবশ্যই দায়মুক্তির অধিকার রাখে। আমরা আগে থেকেই এ বিষয়ে কাজ করছি।’ তিনি বলেন, আরব বসন্ত বা সমসাময়িককালে বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানে জনধিকৃত সরকারগুলোর পতনের পর যেসব দেশে এ ধরনের দায়মুক্তির আইন হয়েছে, সেসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হবে। এছাড়া দেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদের আলোকে এবং অতীতে বাংলাদেশে করা এ ধরনের একটি আইন পর্যালোচনা করে আইন মন্ত্রণালয় খসড়া অধ্যাদেশ তৈরি করবে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে উপদেষ্টামণ্ডলীর বৈঠকে।
গত বছরের ৫ আগস্ট জারি করা জুলাই ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব শহিদকে জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে শহিদের পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে প্রয়োজনীয় সব আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।