১১ মার্চ ২০২৬, বুধবার, ০৭:২০:৩০ অপরাহ্ন


জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিকীকরণে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-০৩-২০২৬
জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিকীকরণে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব প্রতীকী ছবি


২০১০ সালে সরকার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের দ্রুত বর্ধন (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’ নামে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করে। এতে করে জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। বিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি গড়ে উঠেছে ফলে জ্বালানি খাত এখন অনেক ক্ষেত্রে জনসেবার পরিবর্তে বিনিয়োগকারীর লুণ্ঠনমূলক মুনাফার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা দেশের অর্থনীতির উপর বিরুপ প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর যৌথ উদ্যোগে সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ চুক্তি ও জনস্বার্থ’ - শীর্ষক এক আলোচনা সভায় একথা জানানো হয়। 

বাপা’র সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার এর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিডিবি’র সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এম এ মায়ীদ, লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া এবং সুচনা বক্তব্য রাখেন বাপা’র সহ-সভাপতি মানবাধিকার ও পরিবেশকর্মী জাকির হোসেন।

এ বিষয়ের উপর আলোচনা করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ক্যাব এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম. এম আকাশ, রাজনীতিবিদ রুহিন হোসেন প্রিন্স, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ রাজেকুজ্জামান রতন, এবং ক্যাব যুব সংসদ এর সদস্য নাজিফা তাজনূর, যুব আন্দোলনের খান আসাদুজ্জামান মাসুম প্রমুখ।

এতে উপস্থিত ছিলেন বাপা’র সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান, কোষাধ্যক্ষ আমিনূর রসুল, সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিম দাদ খান, হুমায়ুন কবির সুমন, জাভেদ জাহান, নির্বাহী সদস্য হাজী শেখ আনসার আলী, তিতলি নাজনিন, জাতীয় কমিটির সদস্য আরিফুর রহমানসহ গ্রীনভয়েস বিভিন্ন শাখার সদস্যবৃন্দ। 

মূল প্রবন্ধে পিডিবি’র সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এম এ মায়ীদ বলেন, দেখা যায়, ‘বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বিদ্যৎ উৎপাদন নীতি ১৯৯৬ (সংশোধিত ২০০৪)’ হল আইপিপি নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি নিখুঁত ক্রয় নীতি। এই নীতির অধীনে স্বাক্ষরিত পিপিএ চুক্তিগুলি ন্যায্য ছিল এবং উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক পরিস্থিতির সাথে প্রতিযোগিতামূলক শুল্কের ফলাফল ছিল। তবে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করার নামে, ২০১০ সালে সরকার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের দ্রুত বর্ধন (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’ নামে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করে। এই আইনে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়ার বিধান মওকুফ করা হয়েছিল। পিপিএ শুল্ক আলোচনার শর্তে নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়ই চুক্তি প্রদানের প্রক্রিয়া, অন্যায্য চুক্তি এবং স্ফীত ব্যয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে; যার ফলে প্রতিযোগিতা ও ন্যায্যতার অভাব দেখা দেয়। এর ফলে আদানীর মত চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়। জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। বিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি গড়ে উঠেছেফলে জ্বালানি খাত এখন অনেক ক্ষেত্রে জনসেবার পরিবর্তে বিনিয়োগকারীর লুণ্ঠনমূলক মুনাফার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা দেশের অর্থনীতির উপর বিরুপ প্রভাব পড়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, নিরবচ্ছিন্ন ও সুলভে বিদ্যুৎ জনগনকে সরবরাহের জন্য দেশের জ্বালানি খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। বিদেশী নির্ভরতা পরিহার ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের দিয়ে জাতীয় স্বার্থকে সবোর্চ অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিগত সরকারের আমলে নেওয়া অসম চুক্তি জনগণের সামনে প্রকাশ করে সেগুলো বাতিল করতে হবে। জাতীয় সক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেশের স্বার্থে জনকল্যাণমুখী জ্বালানিনীতি বাস্তবায়নের দাবি জানান সরকারের প্রতি। তিনি নবায়ণযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দেশের গ্যাস উত্তোলন ও ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, আমরা সহানুভূতি চাই না অধিকার চাই। বিদুৎ গ্যাস আমাদের অধিকার। সেই অধিকারকে বিদেশীদের হাতে দিয়ে আমাদেরকে তারা জিম্মি করে রেখেছে। যেই চুক্তি দেশের মানুষের কল্যাণের বিরোধী সেই চুক্তি অবশ্যই বাতিল করতে হবে। আদানি চুক্তি ছিল একটি অসম চুক্তি। আমরা অনতি বিলম্বে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এই চুক্তি বাতিল করে জ্বালানি নীতির আমূল পরিবর্তন করে জনমূখী চুক্তি করার দাবি জানাচ্ছি।

অধ্যাপক এম. এম আকাশ বলেন দেশের গ্যাস উত্তোলনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ অন্যখাতে ব্যবহার করা হয়েছে। যার ফলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হয়নি। এর পরিবর্তে ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক স্বার্থে বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনে দেশের জনগণের টাকা হরিলুট করা হয়েছে।

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমরা শুনতে পাচ্ছি বাসগুলোর জন্য রেশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু পেনিক তৈরি করে এই রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হলে জনগণ তা প্রত্যাখান করবে। দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ জনগণের সাথে বসে আলোচনা করে জনবান্ধব বিদ্যুৎ ক্রয়নীতির দাবি জানান তিনি।

জাকির হোসেন বলেন, যেই সরকার ক্ষমতায় আসেই সেই সরকারই বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতে নিজেদের লোক বসায় আর্থিক সুবিধা দেওয়া ও নেওয়ার জন্য। তারা এই খাতকে টাকা কামানোর একটা উপায় বা মাধ্যম বানিয়েছে। এই ধারা থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। 

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, মানুষের যেই জিনিসের বেশি প্রয়োজন সেটিই বেশি সহজলভ্য করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এর উল্টোটা দেখছি। বিদ্যুৎ মানুষের অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য এটিকে সহজলভ্য ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

আলমগীর কবির বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে জনবান্ধব করতে হলে অবশ্যই দেশের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা একটি জ্বালানি নীতি তৈরি করতে হবে।

আলোচনা সভা থেকে দেশের জ্বালানিখাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বেশ কয়েকটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হয়। বলা হয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে পুনরায় মুনাফামুক্ত সেবাখাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিযোগিতাহীন বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনা ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতির বিচারের পাশাপাশি বি ই আর সির স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ-উভয়কে কেবলমাত্র আপস্ট্রিম রেগুলেটরের দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে স্বার্থসংঘাত মুক্ত করা দরকার।

শেয়ার করুন