০৮ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ০৬:২৬:১৪ অপরাহ্ন


সংসদে সংবিধান সংস্কার কোন পথে
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৪-২০২৬
সংসদে সংবিধান সংস্কার কোন পথে


ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যখন চতুর্মুখী সংকটের কবলে দেশ তখন নির্বাচনের মাধ্যমে নবগঠিত সংসদের প্রথম অধিবেশনেই কতগুলো মৌলিক বিষয় নিয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মতবিরোধ থেকে দেশ আবার রাজনৈতিক সংঘাতের পথে এগিয়ে চলেছে। সরকাার দলের সংসদ সদস্যরা তাদের মতে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচনা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেয় নি। 

অন্যদিকে বিরোধী জোট সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আবার সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে। সংবিধান বিশারদ না হয়েও বলা যায়, একই সংসদে নির্বাচিত সংসদে দুবার শপথ নেওয়া সংবিধান অনুযায়ী শুদ্ধ হয়েছে বলে মনে হয় না। ২০২৪ আগস্টে সরকার পরিবর্তন সংবিধান মেনে হয়নি। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্থান নেই সংবিধানে। আবার সেই সরকার ১৮ মাস সরকারে অবস্থানকালে ১৩৩টি অর্ডিন্যান্স জারি করেছে, যার অনেকগুলো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করে দীর্ঘদিন মূলধারার বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বাদ রেখে অন্যান্যদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করে একটি বিতর্কিত জুলাই সনদ প্রণয়ন করে। সেই সনদে বিএনপিসহ কয়েকটি দল কয়েকটি ধারায় নোট অব ডিসেন্টসহ স্বাক্ষর করে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চাপের মুখে সরকার ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একই দিনে জাতীয় নির্বাচন এবং যুগপৎভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠান করে। বিএনপি জোট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়। যদিও বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী গণভোট অনুষ্ঠানের কোনো এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের ছিল না। 

জাতীয় সংসদের চলমান প্রথম অধিবেশনে সংগত কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার জারি করা ১৩৩ অর্ডিন্যান্স বিবেচনার জন্য উপস্থাপিত হলে একটি সাংসদীয় কমিটি গঠিত হয় অর্ডিন্যান্সগুলো বিচার বিশ্লেষণের জন্য। সে কমিটি গণভোটসহ ২০টি অধ্যাদেশ অনুমোদন না করার সুপারিশ করেছে। এর ফলে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে এগুলো আপনা থেকেই বাতিল হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হলো গণভোট অধ্যাদেশ অনুমোদিত না হলে গণভোট বাতিল হবে। সে ক্ষেত্রে সংবিধান পরিপন্থী কার্যক্রমের জন্য নির্বাচন কমিশন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়বে কি না সংশয় আছে। সব মিলিয়ে সংসদ এখন এসবের পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে গরম। উত্তপ্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে আপাতত দৃষ্টিতে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া ওই সংক্রান্ত বিষয়াদি এখন সংসদে এক রকম বোঝা হয়ে উঠছে। কী হবে সেটাও দেখার অপেক্ষায় মানুষ। বিএনপি তবু বলছে সংস্কার হবে। সেটাও কোথায় কোথায়, কীভাবে সেটা দেখার বিষয়। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনড় বিরোধী দল। ইতিমধ্যে ওই দাবিতে সংসদের বাইরেও মিছিল মিটিং করছেন তারা। হুমকি দিচ্ছেন তারা এ দাবি আদায় করে নেবেন। 

বিএনপি জোট সরকার কিন্তু দীর্ঘদিন থেকেই তাদের ঘোষিত ৩১ দফা কার্যক্রম নিয়ে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে। এখনো কথায় বলে জনগণ তাদের ৩১ দফার ওপর ম্যান্ডেট দিয়েছে। ৩১ দফার ১ নম্বর দফায় আছে জনগণের স্বার্থে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। ২০ নম্বর ধারায় আছে সরকার স্থানীয় সরকারসহ সব ক্ষেত্রেই নির্বাচিত প্রতিনিধি ভোটের মাধ্যমে নিয়োগ করবে। সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকারের গড়িমসি আর স্থানীয় সরকারে নিজেদের দলের অনুগত সদস্যদের পদায়ন করে বিএনপি সরকার, কিন্তু নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়ন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে বিরোধী দল দাবি করছে।

১৯৭২ সংবিধান দেশের স্বার্থ পরিপন্থী এটা মানছি না। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার নিজেদের স্বার্থে সংবিধান কাটা ছেড়া করে সংবিধানকে অনেকাংশে বিকলাঙ্গ করে ফেলেছে সন্দেহ নেই। নির্বাচিত সংসদ একটি কমিশন গঠন করে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সংবিধান সংস্কার করুক সেটি সবাই চায়। কিন্তু কিছু অর্বাচীন মানুষ ৭২ সংবিধান ছুড়ে ফেলবে সেটি যেমন বিবেচনার অযোগ্য তেমনি নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষের জন্য কিছু ক্ষেত্রে সংবিধান মানব কিছু ক্ষেত্রে মানবো না সেটিও অগ্রহণযোগ্য।

যাহোক সর্বশেষ পরিস্থিতি হলো সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মতো বিরোধ রাজপথে দুটি পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। সংসদে দেখছি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মুখ খুলছে না সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী। এমনকি এ বিষয়ে আইন মন্ত্রীও অনেকটা নীরব। সরকারি দলের হয়ে সরব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ফলে কী হয় সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা সাধারণ মানুষেরও।

শেয়ার করুন