০১ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ০৯:৫৮:১৪ অপরাহ্ন


লন্ডন ও গুলশান-ওয়ালাদের খবরদারিতে রাজশাহী বিএনপিতে ক্ষোভ
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০১-০৪-২০২৬
লন্ডন ও গুলশান-ওয়ালাদের খবরদারিতে রাজশাহী বিএনপিতে ক্ষোভ বিএনপির লগো


দলের জন্য আজীবন নিবেদিত ত্যাগিদের মূল্যায়ন না করায় রাজশাহীর বিভাগ বিএনপিতে ক্ষোভ হতাশা বাড়ছে। এই বিভাগেও এখন লন্ডনভিত্তিক আঞ্চলিকতার পাশাপাশি গুলশান কেন্দ্রিক খবরদারির খেসারত দিতে হচ্ছে দলকে। আর এমন পরিস্থিতিতে লাভের ভাগিদার হচ্ছে জামায়াত। এসব তথ্য মিলেছে বিভাগের বিএনপির ত্যাগী পরীক্ষিত রুচিশীল মার্জিত ক্লিন ইমেজের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে। 

এক শাহিন শওকতের কথা

সৈয়দ শাহিন শওকত। একে-তো তাকে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় জাতীয় সংসদে রাজশাহী বিভাগে সব ক’টি আসনে জয়ী হতে কেন পারেনি তার পরামর্শও নেওয়া হয়নি। আবার এখন দলের জন্য ত্যাগ করেও অবহেলিত থেকে গেলেন। রাজনৈতিক জীবনের শেষ সময়ে বিএনপি’র জন্য ত্যাগ স্বীকারের পরও অন্য কোথাও কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী সহজ-সহজ নেতাকর্মীদের মনেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 

কে এই সৈয়দ শাহিন শওকত?

উত্তরবঙ্গের রাজশাহীতে দলে একজন কৃতি সন্তান জনপ্রিয় সংগঠক হিসাবে সৈয়দ শাহিন শওকতের নাম প্রথমে আসবেই। শাহীন শওকতের শিক্ষাজীবন অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি এবং নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার এবং আইন বিভাগ থেকেও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তার পারিবারিক পটভূমিও শিক্ষাবান্ধব- মা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক এবং বাবা অগ্রণী ব্যাংকের এজিএম ছিলেন।

কৈশোর থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত শাহীন শওকত ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৮৮ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে সরাসরি ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯-৯০ সেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসু নির্বাচনে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর ভোটে তিনি সিনেটর নির্বাচিত হন, যা তার ছাত্রনেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ( রাজশাহী বিভাগ) সাবেক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট মেম্বার ও আইন পেশায় জড়িত। বিভাগে একজন উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র, সৎ মানবিক, গণমানুষের নেতা তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, বিগত আন্দোলন সংগ্রামে তিনি তার সর্বোচ্চ দিয়ে রাজপথে থেকেছেন। আন্দোলন সংগ্রামে বিএনপি'র তারুণ্যের সংগঠনগুলোকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন, নিয়েছেন ঝুঁকি। স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে রাজপথে থেকে শ্লোগানে শ্লোগানে অনুপ্রাণিত করেছিলেন ছাত্র-জনতাকে। 

তার রাজনৈতিক সততা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দলের প্রতি নিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে বিএনপির চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া তাকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মনোনীত করেন। ২০০৮ সালের পর বিএনপির কঠিন সময়ে দল পুনর্গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার পর ২০২৪ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেন। বর্তমানে তিনি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সংগঠনকে শক্তিশালী করা, ইউনিটগুলোকে সক্রিয় করা এবং আন্দোলনকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।

কিন্তু ফলাফল শূণ্য

রাজশাহীর বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সবসময়ের সংগ্রামের রাজনীতি করতে দেখে আসা নেতাকে এখন দলের বিজয়ের সময়ে কোথাও সম্মানজনক অবস্থায় দেখা যাচ্ছে না। রাজশাহী ও উত্তর জনপদের মানুষের প্রত্যাশা যে তার মতো একজন শিক্ষিত, যোগ্য ও স্মার্ট নেতৃত্বকে সামনে আনা হোক, যার মাধ্যমে রাজশাহী গড়ে উঠতে পারে আরও উন্নত, নিরাপদ ও কর্মমুখী শহর হিসেবে। কারো মতে, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ ও জয়পুরহাটসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করছেন, তার অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও সাংগঠনিক দক্ষতা বিভাগীয় উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বর্তমানে বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য না থাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন, রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে শাহীন শওকত টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হলে তা জেলার রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে এবং বিভাগীয় উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

দলের আরও শাহিন শওকত আছে

এবারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ২৮টি। এই বিভাগের আটটি জেলা হলো রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা। বিএনপি আসন বেশি পেলেও ভোটে এগিয়েছে জামায়াত। কেননা জামায়াত পেয়েছে ১১টি। অতীত ঘেটে দেখা গেলা এই বিভাগে ২০০১ সালে চারদলীয় জোটে গিয়েও জামায়াত মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল। আর ২০০৮ সালে জামায়াতের কোনো আসনই কপালে জোটেনি। ১৯৮৬ সালে রাজশাহী-১ আসনে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জিতেছিলেন।

সে-ই জায়গা থেকে জামায়াত কি করে ১১টি আসনে জয়ী হয়ে গেলো তা নিয়ে এখনও পর্যন্ত চুলচেরা বিশ্লেষণ নেই। অন্যদিকে জামায়াতের জয়ীদের ১০জনই নতুন মুখ। যারা সহজেই এলাকার জনগণের কাছাকাছি চলে যেতে পেরেছে বা শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি দাঁড় করতে সক্ষম হয়েছেন বলে শোনা যায়। তবে রাজশাহীতে জামায়াতের এমন বিজয়ে নারী সদস্যদের কেউ কেউ ধন্যবাদ দিচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল জামায়াত যে-ই আসনগুলিতে জয়ী হয়েছে সেখানে বিএনপি সিলেকশন ভুল ছিল। এখানে সিলেকশানের ক্ষেত্রে লন্ডন আর গুলশান কেন্দ্রিক একটি মহলের তদরিব ও কারো কারো অতিরিক্ত খবরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। কারো কারো মতে, এলাকায় যাকে কেউ দেখেননি এমন লোকদের মনোনয়ন দিয়ে দলের বিপর্যয় ডেকে আনা হয়েছে । অপরদিকে মনোনয়নবঞ্চিতদের ক্ষোভ হতাশা জানার পরও তা সামাল দিতেও কেন্দ্র ব্যবস্থা নেয়নি। কারো অভিযোগ যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকেই নির্বাচনের আগে হেরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হচ্ছে টের পেয়ে-ও আওয়ামী স্টাইলে ভোট হবে এবং তা-কে কার বিজয় নিশ্চিত বলে স্বপ্নে বিভোর ছিল। আর এদের এমন দিবা স্বপ্নের জন্য লন্ডন ভিত্তিক ইজমই কাজ করেছে বেশি বলে কারো অভিযোগ। কারো মতে, দলে ভিড়িয়ে আবার তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াতেও অনেক আসনে ভরাডুবি হয়েছে। যেমন সাবেক তথ্য মন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ যিনি যোগ দিয়েছিলেন বিএনপিতে। কিন্ত তাকে মনোনয়ন না দেওয়াটা চরম ভুল ছিল বলে কারো কারো অভিমত। ফলে সেখানে জামায়াত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। আবার কোনো আসনে দেয়া প্রার্থীরা অতিরিক্ত অহমিকাও দল নিজের তেরে যাবার পক্ষে কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারো কারো মতে, এছাড়াও দলের ত্যাগি সম্ভাব্য বিজয়ী হতে অনেকই পারতো কিন্তু মনোনয়ন না দিতে বিভিন্ন জনের ভুল পরামর্শে জামায়াতের বেশি আসন পাওয়া নিশ্চিত করেছে। যেমন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৩ আসনে বিএনপি’র ত্যাগি নেতা আনোয়ারুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তা-ই এসব কারণে অনেকে মনে করেন সঠিকভাবে বাছাই করলে ও লন্ডনভিত্তিক আঞ্চলিকতার পাশাপাশি গুলশান কেন্দ্রিক খবরদারির পাশ কাটাতে পারলে রাজশাহীর পুরোটাই বিএনপির নেতৃত্বে চলে আসতো।

শেয়ার করুন