০৮ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ০৬:২৬:৩৬ অপরাহ্ন


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-৫
মরুভূমির বুকে ইতিহাসের পদচিহ্ন
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৪-২০২৬
মরুভূমির বুকে ইতিহাসের পদচিহ্ন কাতারের মরুভূমি


কাতারের দোহা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে পাড়ি জমালে চোখে পড়বে আদিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি। সেই রুক্ষ ধূসর বালির বুক চিরে যখন নীল পারস্য উপসাগরের ছোঁয়া পাওয়া যায়, ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে কাতারের একমাত্র ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-আল জুবাহার আর্কিওলজিক্যাল সাইট। আজ আমরা যাচ্ছি ওখানে। আমার সঙ্গে আছেন স্থানীয় গাইড-নূরা।

গাড়ি যখন দোহার ব্যস্ততা ছেড়ে উত্তরের দিকে এগোতে লাগলো, শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল বালুর নীরবতায়। রাস্তার দুপাশে শুধু সোনালি বালির ঢেউ, মাঝে মাঝে দূরে উটের ছায়া-এক অদ্ভুত নিসর্গ সৌন্দর্য। নূরা জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো, তুমি কি জানো এ নির্জন মরুভূমির মাঝেই একসময় ছিল এক সমৃদ্ধ নগরী?

আমি তাকালাম তার দিকে। বললাম, জানি না। তবে সে গল্প শুনতে চাই। গাড়ি থামলো জুবারা দুর্গের সামনে। বাতাসে হালকা লবণাক্ত গন্ধ-সমুদ্র খুব দূরে নয়। দূরে ধূসর দেওয়াল, ভাঙা ইটের স্তূপ আর ইতিহাসের নিঃশব্দ উপস্থিতি। আমরা হেঁটে ঢ়ুকে পড়লাম সেই প্রাচীন শহরের ভেতরে। নূরা ধীরে ধীরে বলতে লাগলো, ১৮শ শতকে এই শহর ছিল উপসাগরের অন্যতম বড় বাণিজ্যকেন্দ্র। মুক্তা আহরণ আর বাণিজ্যের জন্য সারা আরব থেকে জাহাজ আসতো এখানে। কল্পনা করো, এই নির্জন জায়গাটা একসময় ছিল কোলাহলে ভরা, বাজারের ডাক আর নাবিকদের হাঁকডাকে সরগরম।

আমি চোখ বন্ধ করলাম। যেন শুনতে পেলাম সেই কোলাহল, বাতাসে ভেসে আসা পুরোনো দিনের গন্ধ। নুরা একটু থেমে বললো, কিন্তু সবকিছু হারিয়ে গেলো।সময়, যুদ্ধ, আর প্রকৃতির কাছে হার মেনেছে এই শহর, যা এখন শুধুই স্মৃতি। আমি তার দিকে তাকালাম। বললাম, তারপরও কেমন চমৎকার সুন্দর। এই নীরবতাও যেন কথা বলে। নূরা একটু হাসলো।

আমরা একটি ভাঙা দেওয়ালের পাশে দাঁড়ালাম। সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়ছে। সোনালি আলোয় জুবারা যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠলো মনে হলো, এই তো একটু আগেও এখানে মানুষ ছিল, জীবনের ছন্দ ছিল এখানে। আমি নূরাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কাছে কি মনে হয়, এই শহর আবার ফিরে আসতে পারে জীবন্ত হয়ে? সে মৃদু মাথা নেড়ে বললো, ইতিহাস কখনো ফিরে আসে না, কিন্তু মানুষ তাকে মনে রাখে-এটাই তার পুনর্জন্ম।

নুরা বললো, ১৮শ শতাব্দীর এই প্রাচীন শহরটি এক সময় ছিল মুক্তা শিকারি আর বণিকদের প্রধান কেন্দ্র। দুর্গের বিশাল দেওয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নুরা যখন এর ইতিহাস ব্যাখ্যা করছিল, আমি তখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। সে বলছিল-জানো, এই জুবাহার কিন্তু কেবল একটি দুর্গ নয়, এটি ছিল একটি সুরক্ষিত বাণিজ্য বন্দর। এই চুন আর কোরাল পাথর দিয়ে তৈরি দেওয়ালগুলোই শহরকে রক্ষা করতো।

দুর্গের ধুলোবালি মাখা ইতিহাস দেখা শেষে যখন দুপুরের রোদে তৃষ্ণা পাচ্ছিলো, সে আমাকে নিয়ে গেল স্থানীয় একটি ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয়। কাতারের আতিথেয়তা জগৎজুড়ে বিখ্যাত, আর তার প্রমাণ পেলাম টেবিলে খাবার আসতেই। আমাদের সামনে সাজানো হলো কাতারের জাতীয় খাবার ‘মাজবুস’ (Machboos)। সুগন্ধি বাসমতী চালের সঙ্গে মচমচে ভাজা মাংস আর বিশেষ মশলার সেই স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো। সঙ্গে ছিল ‘হামুস’ আর তাজা সালাদ। সে নিজের হাতে আমার প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বললো, এ খাবারের মসলাগুলো যেমন খাঁটি, আমাদের বন্ধুত্বটাও যেন তেমনই অটুট থাকে।

আমি হেসে উত্তর দিলাম-এমন চমৎকার আতিথেয়তা পেলে তো আমি কাতার ছেড়ে যেতেই চাই না। নুরা মৃদু হাসলো। বিকেলের সূর্যটা যখন একটু নরম হয়ে এলো, আমরা গিয়ে বসলাম সমুদ্রের ধারের এক ছিমছাম ক্যাফেতে। আরব দেশগুলোতে বিকেল মানেই এক কাপ গরম ‘ক্যারাক চা’ (Karak Tea)। এলাচ আর আদার সুঘ্রাণে ভরা সেই ঘন দুধ-চা হাতে নিয়ে আমরা সূর্যাস্ত দেখছিলাম। নুরা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললো, জুবাহার মানে তো একসময় ছিল মুক্তার দেশ। আজ তোমার কি মনে হচ্ছে? আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, মুক্তা তো আমি পেয়েই গেছি। এই যে সমুদ্রের হাওয়া, এই পড়ন্ত বিকেলের চা আর পাশে তুমি-এর চেয়ে বড় সম্পদ আর কী হতে পারে?

সে একটু লজ্জা পেলো। সূর্যাস্তের লাল আভা তার মুখে পড়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্য তৈরি করেছিল। ফেরার পথে মনে হলো, ইতিহাস কেবল ধ্বংসাবশেষে থাকে না; তা বেঁচে থাকে এমন কিছু স্বাদে, গন্ধে আর ভালোবাসার প্রিয় মুহূর্তে।

শেয়ার করুন