২২ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ০৫:৪২:৪৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
অবৈধ ট্যারিফ ফেরতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন পোর্টাল চালু হার্ভার্ডে ঈদ উদযাপনের পোস্টকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক মার্কিন কংগ্রেসে লড়ছেন বাংলাদেশি আমেরিকান সিনেটর সাদ্দাম সেলিম মদ্যপানের খবরে দ্য আটলান্টিকের বিরুদ্ধে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মামলা কাশ প্যাটেলের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর কারা পেলেন মনোনয়ন উজ্জীবিত নববর্ষ উদযাপন যে বার্তা দিয়ে গেল ২০২৬ সালের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে ১৬ মিলিয়ন অভিবাসী ভোটার আইএমএফ’র শর্তের নেপথ্যে রাজনীতি না অন্যকিছু জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দিলেও ‘কিছু রাজনৈতিক দল’ জনগণকে বিভ্রান্ত করছে - তারেক রহমান মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন সেই শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-৭
দুর্ভেদ্য রোহতাস দুর্গ
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ২২-০৪-২০২৬
দুর্ভেদ্য রোহতাস দুর্গ ঝিলমের রোহতাস দুর্গ ও রোহতাস দুর্গের ভেতরে লেখক


পাকিস্তানের ঝিলম শহর থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। গন্তব্য- ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, সম্রাট শেরশাহ সূরির অমর কীর্তি ‘রোহতাস দুর্গ’। ঝিলম শহর থেকে বেরোতে বেরোতে সকাল সাড়ে ৯টা বেজে গেল। গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড ধরে গাড়ি ছুটছে পশ্চিমে। রাস্তার দুপাশে সরিষার হলুদ মাঠ, মাঝে মাঝে খেজুরের সারি। শীতের শেষ আলো তখনো নরম, কুয়াশার একটা পাতলা চাদর ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে রোদের আঙুলে।

ঝিলম থেকে রোহতাস দুর্গের দূরত্ব মাত্র ৩৭ কিলোমিটার। GT Road ধরে কিছুটা গিয়ে ডানে মোড় নিতে হয় দিনা শহরের কাছে। তারপর একটা সরু পিচের রাস্তা সোজা উঠে গেছে পোঠোহার মালভূমির দিকে। পথ চেনা থাকলে ঘণ্টাখানেকের বেশি লাগে না। কিন্তু সেদিন পথ চেনার দায়িত্ব আমার ছিল না। আমার সঙ্গে ছিল স্থানীয় গাইড সারা। হালকা নীল সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে একটা চামড়ার ঝোলা ব্যাগ, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। ইতিহাসের ছাত্রী, পেশায় গাইড, মেজাজে কবি—এ তিনটে পরিচয় তার মধ্যে এভাবে মিশে আছে যে আলাদা করা মুশকিল। গাড়ি চলতে শুরু করতেই সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বললো, দুর্গ দেখতে যাচ্ছ, কিন্তু দুর্গের মেজাজটা বোঝা দরকার আগে।

কেমন মেজাজ?

একটু গম্ভীর। একটু একাকী। যেন কাউকে অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করাচ্ছে। আমি হাসলাম। তোমার মতো? সে চশমার ফাঁক দিয়ে একটা চাহনি ছুড়ে দিলো, উত্তর না দেওয়াটাই যার উত্তর। দিনার কাছে GT Road ছেড়ে যখন পাহাড়ি পথে উঠলাম, চারপাশের চেহারা বদলে গেল একদম। সবুজ কমে গেল, পাথর বাড়লো। মালভূমির রুক্ষ সৌন্দর্য—যাকে সুন্দর বলা যায় না, কিন্তু চোখ সরানোও যায় না।

দুর্গের বিশাল ‘সোহেল গেট’ দিয়ে ঢোকার সময় সারা বলতে শুরু করলো, শেরশাহ সুরি যখন মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে হারিয়ে ভারতছাড়া করলেন, তখন তার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল পোটোয়ার অঞ্চলের লড়াকু গাক্কার উপজাতিদের। তারা ছিল মুঘলদের অন্ধ ভক্ত। তাদের রুখতে এবং আফগান থেকে মুঘলদের ফেরার পথ বন্ধ করতে ১৫৪১ সালে তিনি পাহাড়ের বুকে গড়ে তোলেন এক অজেয় দুর্গ। সে একটি উঁচু বুরুজের দিকে আঙুল তুলে বললো জানো এর প্রাচীরগুলো গড়ে ৩০ ফুট চওড়া! কোনো কামান একে ভেদ করতে পারতো না। ১২টি বিশাল ফটক আর ৬৮টি বুরুজ নিয়ে দুর্গটি সামরিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। শেরশাহ সুরি একে ভালোবেসে বিহারের রোহতাসগড়ের নামে নাম রেখেছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ১৫৪৫ সালে তিনি মারা যান, আর এর ঠিক দশ বছর পরই হুমায়ুন আবার দুর্গ দখল করে ভারতে মুঘল শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

গাড়ি যখন দুর্গের প্রধান ফটক- শিশি দরওয়াজার সামনে এসে থামল। শিশি দরওয়াজা—কাচের দরজা। নামটা এসেছে দরজার গায়ে লাগানো নীল টাইলসের কাজ থেকে, যা এককালে রোদে ঝিকমিক করত কাচের মতো। এখন সেই টাইলসের বেশিরভাগ খসে গেছে, তবু খিলানের গড়নে সেই সময়ের দাপট টের পাওয়া যায়। দুর্গের মোট বারোটি দরজা। প্রাচীর চার কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা। পুরুত্ব জায়গায় জায়গায় চার মিটার।

এত বড় দুর্গ মাত্র দু’বছরে? আমি অবাক হয়ে বললাম। সারা একটু হাসলো। শের শাহের কাছে সময় ছিল না বেশি। হুমায়ুন যেকোনো মুহূর্তে ফিরে আসতে পারে, ভয়টাই এত দ্রুত কাজ করিয়েছিল তাকে। আমরা হাঁটছিলাম কাবুলি দরওয়াজার দিকে। পায়ের নিচে অমসৃণ পাথর। সারা ব্যাগ থেকে একটা নোটবই বের করলো, হাতে লেখা তথ্যে ভরা। তুমি এখনো নোট বইয়ে লেখো? জিজ্ঞেস করলাম। ফোনে লেখা তথ্য, নোটবইয়ে লেখা অনুভূতি—সে বললো। দুটো আলাদা জিনিস।

প্রাচীরের ওপর থেকে দেখা যাচ্ছে কাশ নদী—শান্ত, সরু, নিচের উপত্যকায় রুপোর সুতোর মতো। দূরে পোঠোহার মালভূমির ঢেউ খেলানো সবুজাভ বাদামি রং। এ দৃশ্যটা ৫০০ বছর আগেও এরক ছিল। সারা বললো। মানুষগুলো ছাড়া। মানুষগুলো সবচেয়ে কম টেকে। একটু থেমে সে যোগ করলো, পাথর টেকে। স্মৃতি টেকে। আমি তার দিকে তাকালাম। সে তখনো দূরে তাকিয়ে। তুমি কি সবসময় এত দার্শনিক, নাকি পেশাগত কারণে? আমি বললাম। সে ঘুরে তাকালো। তুমি কি সব সময় এত প্রশ্ন করো, নাকি আমাকে বিরক্ত করার জন্য?

হাওয়ায় একটা হাসি ভেসে গেল—কার, বলা মুশকিল। দুর্গ ঘুরতে ঘুরতে দুপুর গড়িয়ে গেল। ফেরার পথে দিনা বাজারে সারার চেনা একটা ছোট রেস্তোরাঁ—মিঞা হোটেল। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী আছে। রং-ওঠা দেওয়াল, কাঠের চেয়ার-টেবিল, ছাদ থেকে ঝোলানো একটা পুরনো পাখা।

কিন্তু খাবার। পোঠোহারি ঐতিহ্যের সারাংশ যেন ঢেলে দিয়েছে একটা থালায়। মাটির পাত্রে সরষের তেলে রান্না গোশত কারাহি, সঙ্গে মোটা তন্দুরি রুটি যার গায়ে এখনো চুলার আঁচ লেগে। ডালে পোড়া লংকার ধোঁয়ার গন্ধ। পাশে সবুজ চাটনি, কাঁচা পেঁয়াজ। সারা রুটি ছিঁড়ে কারাহিতে ডুবিয়ে বললো, রোহতাস দুর্গের সৈন্যরাও এরকম খাবার খেত। শুধু মাটির পাত্রটা একটু বড় ছিল।

আর সঙ্গী? সঙ্গী নিশ্চয়ই অত ভালো ছিল না। এবার আমি চশমার ফাঁক দিয়ে চাহনি ছুড়ে দিলাম। সে হেসে মুখ ফেরালো। ফেরার পথে GT Road ধরে আসতে আসতে সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। রাস্তার ধারে একটা পুরোনো ধাবা চায়ে খানা লাল ইটের ছোট্ট বারান্দায় কাঠের বেঞ্চ পাতা, সামনে একটা পুরোনো কেটলি সারাক্ষণ গুনগুন করছে। চা এলো মাটির কুলুড়িতে। দুধ-আদা-এলাচের মিঝিাঁজালো গন্ধ। সঙ্গে রস-মালাই মিষ্টি-সারার পছন্দের। আলো তখন কমলা হয়ে এসেছে। রাস্তায় ট্রাকের ভোঁ, দূরে একটা মসজিদ থেকে আসর নামাজের আজান ভেসে আসছে।

আজকের দিনটা কে লাগল? সারা জিজ্ঞেস করলো। চায়ের কুলুড়িটা হাতে নিয়ে একটু ভাবলাম। দুর্গের পাথর, প্রাচীরের ওপর থেকে দেখা নদী, দুপুরের কারাহির ধোঁয়া, আর পাশ থেকে ভেসে আসা ইতিহাসের গল্প—‘পাথরে খোদাই হয়ে গেল।’ সারা একটু চুপ করে রইল। তারপর বললো, সেটাই চেয়েছিলাম। বাইরে আলো আরো কমে এলো। কমলা হলো লাল, লাল হলো বেগুনি। ঝিলম তখনো আধঘণ্টা দূরে। কিন্তু সেই মুহূর্তে ফিরে যাওয়ার কোনো তাড়া ছিল না।

জিপ যখন আবার ঝিলম শহরের ব্যস্ততার দিকে ছুটলো, আয়নায় দেখা যাচ্ছিলো রোহতাসের বিশাল প্রাচীর ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। পেছনে পড়ে রইলো এক বীর সম্রাটের অপূর্ণ স্বপ্ন আর ইতিহাসের এক দীর্ঘশ্বাস।

শেয়ার করুন