২২ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ০৫:২৩:১৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
অবৈধ ট্যারিফ ফেরতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন পোর্টাল চালু হার্ভার্ডে ঈদ উদযাপনের পোস্টকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক মার্কিন কংগ্রেসে লড়ছেন বাংলাদেশি আমেরিকান সিনেটর সাদ্দাম সেলিম মদ্যপানের খবরে দ্য আটলান্টিকের বিরুদ্ধে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মামলা কাশ প্যাটেলের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর কারা পেলেন মনোনয়ন উজ্জীবিত নববর্ষ উদযাপন যে বার্তা দিয়ে গেল ২০২৬ সালের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে ১৬ মিলিয়ন অভিবাসী ভোটার আইএমএফ’র শর্তের নেপথ্যে রাজনীতি না অন্যকিছু জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দিলেও ‘কিছু রাজনৈতিক দল’ জনগণকে বিভ্রান্ত করছে - তারেক রহমান মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন সেই শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী


আইএমএফ’র শর্তের নেপথ্যে রাজনীতি না অন্যকিছু
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২২-০৪-২০২৬
আইএমএফ’র শর্তের নেপথ্যে রাজনীতি না অন্যকিছু


আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার গ্যাড়াকলে পড়েছে। কেননা আইএমএফের বাড়তি ঋণ পেতে বেশকিছু শক্ত শর্ত দিয়েছে। আর এসব শর্ত জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার মানতে রাজি হচ্ছে না। এতে করে চলমান ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি বর্ধিত সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি বিএনপি সরকারের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ও বিব্রতকরও বটে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানান ধরনের প্রশ্ন-ও উঁকি দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে আইএমএফ’র কঠিন শর্তের নেপথ্যে রাজনীতি না অন্যকিছু? কেননা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অনেকাংশেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক মাঠে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বেশ কয়েকটি ইস্যুতে বির্তক জমে উঠেছে। 

আইএমএফ নিয়ে খবরে যা আছে

বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলি আইএমএফ নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরে সংবাদ প্রকাশ করে আসছে। এতে জানা যায় যে, ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা, যার মধ্যে বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। তখন এব্যাপারে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, নির্বাচনের পরে এনিয়ে বোঝাপড়া হবে নির্বাচিত সরকারের সাথে। সে হিসাবে আগামী জুন মাসে ঋণের ষষ্ঠ কিস্তি পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সর্বশেষ খবরে দেখা গেলো আইএমএফের সাথে কঠিন দরকষাকষিতে নেমে গেছে, যা কিছুটা রহস্যও ঠেকেছে অনেকের কাছে। অভিযোগ উঠেছে আইএমএফ শর্ত পূরণে রাজস্ব খাত সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে। বলা হচ্ছে এই খাতে আইএফের সার্টিফিকেট অনুযায়ী সংস্কার হয়নি। রাজস্ব আদায় ও নীতি আলাদা বিভাগ করার বিষয়টি নাকি সরকার কৌশলে বাস্তবায়ন করেনি বা পারছেই না। অন্যদিকে করছাড় কমিয়ে আনার বিষয়েও অগ্রগতি কম। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে গত ১৩ থেকে ১৮ এগ্রিল অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসস্তকালীন বৈঠক হয়েছে। এতে অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল চলমান ঋণ কর্মসূচি এবং অতিরিক্ত ঋণ পাওয়ার বিষয়ে আইএমএফের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়। তবে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে কয়েকটি কঠোর শর্ত দেওয়ায় বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার। খবরে দেখা যাচ্ছে শর্তের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছাড়া সব ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রত্যাহার, করছাড় বাতিল এবং ভ্যাটের অভিন্ন হার চালু করা। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের কাঠামোগত সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে। 

সরকার কেনো বেকায়দায়?

তবে আইএমএফের এসব শর্ত নির্বাচিত সরকার মানতে রাজি নয়। প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার কেন্ োএসব শর্ত মানতে চাচ্ছে না? এর কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বাধ্যবাধকতা আছে। আর তা বাস্তবায়নে ব্যাপক ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে আইএমফের পরামর্শে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হার চালু করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। তাছাড়া সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে। এটা বর্তমানে চলমান বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। কিন্তু এইব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনাতেও আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ। তাই সরকার বিষয়টি নিয়ে বেশ বেকায়দায় রযেছে। তবে এগুলো হচ্ছে আর্থিক দিক থেকে সরকারের বেকায়দায় থাকার খবর। 

শুধু বেকায়দায়ই নয়, নেপথ্যে অন্যকিছু

কিন্তু আই এম এফের বর্তমান আচরণে সরকার অন্যকারণে চিন্তিত। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরেই রাজনৈতিক মাঠ গরম হয়ে উঠছে। নির্বাচনের আগে এনিয়ে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি মুখে কুলুপ এ্যাঁটেছিল। এখন খুলছে খুব কৌশলে, ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদসহ অনেক বিস্ময়ের পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। বর্তমান জাতীয় সংসদে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছেন তিনি। এই চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকার দেশের আর কী কী ‘সর্বনাশ’ করেছে, সেটির বিষয়ে তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা ও অপরাধীদের বিচারের দাবি তুলেছেন তিনি। 

রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছেই

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিএনপি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে, যেখানে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেছেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের সাথে কোনো আলোচনা করেনি। তবে এখন যদিও চাপ তৈরি করা হচ্ছে কিন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কয়েকদিন আগে প্রকাশেই বলেছিলেন যে, বাণিজ্য চুক্তি করার আগে বিএনপি ও জামায়াতের সাথে আলোচনা করা হয়েছে এবং তাদের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে এই চুক্তিটি অসম ও বৈষম্যমূঔশ দাবি করে এদের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এটি বাতিলের জন্য চাপ তৈরি করা হচ্ছে। চলছে তুমুল বির্তক এবং এটি বাতিলের দাবিতে মাঠে বিভিন্ন কর্মসূচিও দেখা গেছে। এদিকে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট-এর পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সম্পাদিত অসম বাণিজ্য চুক্তিসহ জাতীয় স্বার্থ বিরোধী সকল চুক্তি বাতিল, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা প্রতিবাদে এর বিরুদ্ধে প্রচার ও গণসংযোগ সপ্তাহের পঞ্চম দিন পালন করেছে গত ২০ এপ্রিল সোমবার। 

একারণেই কি আইএমএফ কঠিন শর্তের বেড়াজাল?

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইএমএফের বাড়তি ঋণ পেতে বর্তমানে বেশকিছু শক্ত শর্ত দেশের সমসাময়িক পরিস্থিতিতে বেশ ইঙ্গিতবহ। যদিও বাংলাদেশ সরকার মনে করেন যে, আইএমএফের বাড়তি ঋণের জন্য কঠোর শর্ত মানলে অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও জনদুর্ভোগ বাড়ার বড় ঝুঁকি থাকে। বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ভর্তুকি ছাঁটাই এবং করের বোঝা বাড়লে উৎপাদন খরচ ও পণ্যের দাম বাড়ে, যা সাধারণ মানুষের আয় কমায়। কিন্তু আইএমএফ আন্তরিকভাবে বলা চলে হিসাব নিকাশে করে বিশ্বাস করলেও মুখে তা স্বীকার করবে কি-না সন্দেহ। কেননা এই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অনেকাংশেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আইএমএফ-এর বৃহত্তম আর্থিক দাতা (প্রায় ১৭% ভোটাধিকার)। এছাড়া, আইএমএফ-এর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ৮৫% সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ভেটো ক্ষমতা দেয়। ওয়াশিংটনে সদর দপ্তর অবস্থিত এবং সাধারণত আমেরিকানরা এর প্রধান পদগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আইএমএফের শর্ত আরোপ বেশ ইঙ্গিতবহ। অপরদিকে বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন বার্তা দিয়েছেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পাশাপাশি তিনি বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও প্রতিরক্ষা চুক্তি করার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। ফলে বর্তমানে রাজনৈতিক মাঠে বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তপ্ত পরিস্থিতির বিপরীতে ‘আইএমএফের কঠিন শর্ত’ দেওয়া হচ্ছে কি-না তা সময়ই বলে দেবে। 

শেয়ার করুন