শেখ হাসিনা
“আমি দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব। মাথা উঁচু করে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর গর্ব নিয়েই ফিরব।” এমন বক্তব্য বাংলাদেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনার। কলকাতার একটি বাংলা পত্রিকায় এই বক্তব্য ছাপা হয়েছে। তার এমন বক্তব্য নিয়ে জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। আসলেই কি তিনি দেশে ফিরবেন বা ফিরছেন? না-কি তার এই বক্তব্য তিনি দেন-ই নি। না এসন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে অন্য কেনো বার্তা দেওয়া হচ্ছে?
ঝটিকা মিছিল বেড়ে গেছে
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরপরই বাংলাদেশে তার দল আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে গোপন তৎপরতা। চলছে বিভিন্ন ধরনের গোপন ও কৌশলী কর্মকান্ড। পতিত আওয়ামী লীগের কর্মকান্ড যে চলছে তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। তিনি সম্প্রতি বলেছেন ‘গত ৫ আগস্ট যাদের দেশের মানুষ বিতাড়িত করে দিয়েছিল, খবর নিয়ে দেখেন- এখন যারা দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে, তারা তলে তলে ওই বিতাড়িত হওয়াদের সঙ্গে খাতির তৈরি করছে। ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে যেভাবে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, এখন তাদের সঙ্গে একটি সুন্দর ‘ছোট লেজ’ গজিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এমন বক্তব্যের নেপথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন মাঠে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত গোপনে ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতার মসনদে বসতে চান বা তাদের অন্য কোনো লক্ষ্য আছে। এব্যাপারে তিনি ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের প্রসঙ্গে টেনে এনেছেন। ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের ব্যাপারে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলের ঐকমত্য থাকলেও শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী পৃথকভাবে সেই নির্বাচনে অংশ নেয়। আবার ১৯৯৬ সালে জামায়াতের ওপর ভর করে আ. লীগ আন্দোলন করে এবং ক্ষমতায় এসেছিল। তাই কারো কারো মতে, শেখ হাসিনার ওই বক্তব্য আর মাঠের বর্তমান খেলাধুলা কি আগের পদ্ধতি কি-না?
আসলেই কি এটা শেখ হাসিনার বক্তব্য
মাঠে ১৯৮৬ কিংবা ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতেই কি শেখ হাসিনা এমন বক্তব্য দিযেছেন যে তিনি বলে ফেল্লেন, মাথা উঁচু করে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর গর্ব নিয়েই ফিরব? কারো কারো মতে, বিষয়টি এমন না। এর ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে এর পেছনে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও রাজনীতি। কেননা বিজেপি নেতা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বৈধ মন্ত্রী। একদিন বীরের বেশে শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। জনগণ তাকে স্যালুট দিয়ে বরণ করে নেবে। কিন্তু বর্তমানে শুভেন্দু অধিকারী সে-ই বক্তব্যের কোনো এমন আলামত দৃশ্যমান হচ্ছে না। তবে অনেকের মতে, তা-র এই বক্তব্য ওই সময়ে দেয়া হয়েছিল বিশেষ কারণে। কেননা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ‘বাংলাদেশ’ ইস্যু বিভিন্ন কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠে প্রার্থীদের নানান ধরনের প্রচারণা কারণে।
বলা যায় এটি একটি ট্রাম্প কার্ড। নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ ইস্যুকে শুভেন্দু অধিকারী কৌশলে চালিয়েছেন সেসময়ের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। এতে কাজও হয়েছে। আর তা-র এই কৌশলটিকে চাঙ্গার পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্য রাখতে বর্তমানে শেখ হাসিনার নাম ব্যবহার করে ‘মাথা উঁচু করে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর গর্ব নিয়েই ফিরে আসার বক্তব্যটি প্রকাশ করা হয়। এই ব্যাপারে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতে, বাংলাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতের অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তায় আছেন।
একারণে তার সাক্ষাৎকারটি সংগ্রহ করে প্রকাশ করা খুব সহজ না। আর যে পত্রিকায় এটি প্রকাশিত হয়েছে অতীতে তাদের ব্যাপারেও নানান ধরনের মুখরোচক কৌশল বা রং চং লাগিয়ে সংবাদ পরিবেশণের ইতিহাস আছে। তা-ই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজয়ের পরপরই একটা রাজনৈতিক সুযোগ ও কৌশলে শুভেন্দু অধিকারীকে একটি পথ করে দিতে ওই পত্রিকাটি এমন খবর পরিবেশন করে থাকেত পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া এমন অভিযোগও আছে ওই পত্রিকাটির বিরুদ্ধে যে তারা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল তরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুণর্কীতন গাইতেন, করতেন বেশ তোয়াজ।
সে কালিমা মুছতে ও নির্বাচনের আগে ভারতে আশ্রয় পাওয়া শেখ হাসিনাকে নিয়ে দেওয়া শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যকে তার পক্ষে টেনে নিয়ে জায়েজ করতে এমন সংবাদ পরিবেশন করে পাঠককে খাওয়ানো হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কেননা প্রকৃত অর্থেই শেখ হাসিনা আসলেই ভারতের কোন স্থানে, কিভাবে আছেন কিংবা তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ে কেনো ‘বর্তমান ছবি’ দেখানো হয় না তা নিয়ে নানান ধরনের ব্যাখা বাজারে প্রচলিত আছে।
তাহলে এই বার্তা কারপক্ষে
কারো কারো মতে, আমি দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব। মাথা উঁচু করে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর গর্ব নিয়েই ফিরব।- এমন বক্তব্যের নেপথ্যে আরও কিছু থাকতে পারে। কেউ কেউ ধারণা করছেন, যদি সত্যিই সাবেক প্রধানমন্ত্রী এমন বক্তব্য দিয়েও থাকেন তাহলে এখানে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটেই তিনি দিয়েছেন। অনেকে মনে করেন যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে নির্বাচিত করার ব্যাপারে অনেক এলাকায় দলটিকে আওয়ামী লীগ গোপনে বড়ো ধরনের সাহায্য করেছিল। কেননা সেসময়ে জামায়াত এনসিপির একটা বড়ো প্লান ছিল ভোট কেন্দ্রে তাদের ভোটারদের ঢল নামানো। কারণ জামায়াত এনসিপির পরিকল্প্ননায় ছিল পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভোট দিতে ভোট কেন্দ্রেই আসবেন না।
সেক্ষেত্রে ভোটার উপস্থিতি কম হলে তার ঘাটতি জামায়াত এনসিপি পূরণ করে বিজয় তাদের পক্ষে নিয়ে নেবে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন নির্বাচনী আসনে জামায়াত এসসিপির ওই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। দেখা যায় অনেক নির্বাচনী এলাকায় দুপুরের পর জামায়াত এনসিপির পরিকল্পনা ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিতে আওয়ামী লীগের একটি বড়ো অংশ মাঠে নেমে যায়। আওয়ামী লীগের হিসাব ছিল জামায়াত এনসিপিকে বিজয়ের মাথা তুলে দিলে তাদের অস্তিত্ব একেবারেই শেষ। মন্দের ভালো হিসাবে তারা বিএনপিকে ভোট দেয় বলে শোনা যায়। কারো কারো মতে, এব্যাপারে পতিত আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের নেপথ্য ভূমিকা ছিল। অনেকের মতে, একারণে সেসময়ে হয়তবা আওয়ামী লীগ আশা করেছে যে খুব দ্রুত তাদের ওপর থেকে নিষিদ্ধ করার আদেশটি বাতিল করে দিতে বিএনপি তৎপরতা দেখাবে।
ফিরিয়ে দেওয়া হবে রাজনীতি করার অধিকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিএনপি সেপথে না যাওয়ায় ‘আমি দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব’- শেখ হাসিনার মুখে ওইভাবে চলে এসেছে। তবে একথা বলা যায় যে শেখ হাসিনার ভারতে থাকা ও এর পাশাপাশি বাংলাদেশে ফেরার ইস্যুটি আসলে পশ্চিমবঙ্গে অন্যরকম রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তা-র একাটা ইঙ্গিত হতে পারে বা তৈরি করা হচ্ছে। ওই পত্রিকায় এমন খবর প্রকাশের মধ্য দিয়ে সে-ই প্রেক্ষাপট তৈরি করা হচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।