রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা
দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিকূলতা নিয়ে সম্প্রতি সরব হয়েছেন কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। রাজনীতিতে নিজের ত্যাগ, দলের প্রতি আনুগত্য ও সমসাময়িক বিতর্ক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত পাঠকপ্রিয় দেশ পত্রিকার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলমগীর কবির
প্রশ্ন: সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়ার পর আপনি ফেসবুকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখেছেন। এই শুকরিয়া জ্ঞাপনের পেছনের প্রকৃত কারণ কী?
কনকচাঁপা: দেখুন, আমি জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতেই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলি। এটা আমার বিশ্বাসের জায়গা। আমি বিশ্বাস করি সবই আল্লাহর ফয়সালা। আমি সরাসরি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য লড়াই করেছি, তখনও মনোনয়ন না পেয়ে নির্দ্বিধায় আলহামদুলিল্লাহ বলেছি। এবার গ্রামের মানুষের প্রবল চাহিদাহেতু সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। সেখানেও আমাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। তবে আমি ভেঙে পড়িনি। নিশ্চয়ই এর মধ্যে আল্লাহর কোনো মঙ্গল নিহিত আছে। জীবন তো আর মনোনয়ন পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
প্রশ্ন: আপনার পোস্টে একটি ইঙ্গিত ছিল যে, দলের ভেতর থেকেই একটি পক্ষ আপনার বিরুদ্ধে সক্রিয়। এ বিষয়ে যদি পরিষ্কার করে কিছু বলতেন?
কনকচাঁপা: এটা এখন অনেকটা স্পষ্ট। যারা গত জাতীয় নির্বাচনেও চায়নি যে আমি মনোনয়ন পাই, তারাই এখনো সেই অপচেষ্টায় লিপ্ত। আমি বছরজুড়ে দলের ভেতরের নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে নিরলস কাজ করেছি। দল আমাকে মনোনয়ন দেয়নি, সেটা আমি মেনে নিয়েছি কারণ দলের প্রতি আমার আনুগত্য শতভাগ। কিন্তু আমাকে যেভাবে মিথ্যাচার করে হেয়প্রতিপন্ন করার হীনপ্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তা দুঃখজনক এবং একটি দুরভিসন্ধি।
প্রশ্ন: দলীয় কার্যালয়ে মনোনয়ন ফরম তোলার সময় আপনার রাজনৈতিক ত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে আপনাকে তোপের মুখে পড়তে হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
কনকচাঁপা: ব্যক্তিগত অপমানের চেয়েও বড় কথা হলো গণতন্ত্র এবং শিষ্টাচার। দলের যে কারোরই অধিকার আছে মনোনয়ন চাওয়ার এবং নিজেকে যোগ্য মনে করার। মনোনয়ন ফরম কেনার দুয়ার সবার জন্যই খোলা। সেখানে আমাকে যেভাবে তোপের মুখে পড়তে হয়েছে বা আমাকে নিয়ে যে ভাষায় কথা বলা হয়েছে, তা কাম্য ছিল না। আমি মনে করি, এ ধরনের আচরণ আমার চেয়ে বেশি দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন করে। যারা রাজপথে লড়াই করেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, দলের ভেতরে সহনশীলতা থাকা খুব জরুরি। আমি অন্যায়ের বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
প্রশ্ন: আপনার সমালোচকরা বলছেন আপনি রাজপথে ছিলেন না বা জেল খাটেননি। এর জবাবে আপনি কী বলবেন?
কনকচাঁপা: ত্যাগ কি কেবল রাজপথে থাকা বা জেল খাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? বিগত দীর্ঘ সময় আমি গান গাইতে পারিনি। একজন শিল্পীর কাছে গান গাইতে না পারাটা কতটা যন্ত্রণার, তা কি কেউ অনুভব করতে পারেন? আমি মানসিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমি সবার ত্যাগকে সম্মান করি, কিন্তু আমার ক্যারিয়ার হারানো বা নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কি কোনো স্বীকৃতি নেই? আমি ২০১৩ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপ্রেরণায় রাজনীতিতে এসেছিলাম। তাঁর আদেশ শিরোধার্য মেনে ২০১৮ সালের নির্বাচনে কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলাম।
প্রশ্ন: আপনি নিজেকে একজন ‘রাজনৈতিক মনের মানুষ’ বলছেন কিন্তু ‘রাজনীতিবিদ’ নন। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যের কারণ কী?
কনকচাঁপা: আমি মূলত একজন শিল্পী। আমার মনটা শিল্পীর, যেখানে আবেগ আর দেশপ্রেম থাকে সবচেয়ে বেশি। রাজনীতিতে আমি এসেছি দেশনেত্রীর ডাকে এবং তাঁর আদর্শের প্রতি ভালোবাসা থেকে। একজন পেশাদার রাজনীতিবিদ যেভাবে প্যাঁচ-গোছ বোঝেন, আমি হয়তো সেভাবে পারি না; সেজন্যই বলেছি আমি পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ নই। তবে রাজনীতি মানে যদি হয় দেশের সেবা, তবে আমি সেই পথেই থাকব। নেত্রীর আদেশ পালন করাই ছিল আমার লক্ষ্য।
প্রশ্ন: আপনি লিখেছেন, দল হয়তো আপনাকে ‘ভাতের মাড়’ টাইপ মানুষ ভেবেছে। এই উপমা দিয়ে আপনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন?
কনকচাঁপা: (হাসি) আমি নিতান্তই সাদামাটা একজন মানুষ। হয়তো আমার নম্রতাকে দুর্বলতা ভাবা হয়েছে। কিন্তু আমি জানি, এই দেশের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা কতটুকু। গান ছাড়াও এ দেশকে দেওয়ার অনেক কিছু আমার বাকি আছে। আমি মরার পর মাটিতে মিশে গিয়েও এ দেশের মাটিকে উর্বর করতে চাই। আমি সুবিধাবাদী নই, আমি দেশের হয়ে, দশের হয়ে থাকতে চেয়েছি।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে আপনার রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে?
কনকচাঁপা: দলের প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই, তবে কতিপয় ব্যক্তির আচরণে আমি ব্যথিত। আমি নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য ফুল, লতা-পাতার ছবি আঁকা, পরিবার ও রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করি। ইনশাআল্লাহ, আমি আছি এবং থাকব দেশের হয়ে, দশের হয়ে। আপনারা যেভাবে ভালোবেসে আমার পাশে ছিলেন, আশা করি সেভাবেই থাকবেন।