হিজাব
এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে গত ৩০ এপ্রিল মুসলিম নারী বন্দির ধর্মীয় অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে হিজাব ছাড়া তোলা তার সব ছবি ধ্বংসের নির্দেশ দিয়েছে। আদালত বলেছে, একজন নারীকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থীভাবে হিজাব খুলে ছবি তুলতে বাধ্য করা সংবিধানসম্মত নয় এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন। এই রায়কে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুসলিম নারীদের অধিকার রক্ষায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন অধিকারকর্মীরা। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের ফেডারেল আদালতের বিচারক জেফ্রি ব্রায়ান, যিনি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মনোনীত বিচারক, এ রায়ে বলেন যে, মুনা জামা নামের ওই নারী বন্দির ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে তাকে হিজাব খুলে ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের পরিপন্থী।
মুনা জামা একজন সোমালি-আমেরিকান মুসলিম নারী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে তার ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলছেন। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, হিজাব পরা নারীদের জন্য শালীনতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে এমন পরিবেশে যেখানে পুরুষদের উপস্থিতি থাকে। জামা আদালতে জানান, তিনি পরিবারের বাইরে সবসময় হিজাব পরেন এবং এটি তার ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালে, যখন তাকে একটি ফেডারেল কারাগারে নেওয়া হয়। সে সময় কারা কর্তৃপক্ষ তাকে হিজাব খুলে ছবি তুলতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে সেই ছবি তার পরিচয়পত্র, লকার এবং বিভিন্ন অফিসিয়াল নথিতে ব্যবহার করা হয়। এর ফলে কারাগারের পুরুষ কর্মকর্তাদের সামনে তার মাথা, কান ও গলা উন্মুক্ত অবস্থায় বারবার প্রদর্শিত হতে থাকে, যা তার ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী। ২০২২ সালে জামা এই ঘটনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পর কারা কর্তৃপক্ষ তাকে হিজাবসহ নতুন ছবি তোলার সুযোগ দিলেও একই সঙ্গে আবারও একটি হিজাববিহীন ছবি তুলতে বাধ্য করে। পরে তিনি আদালতে মামলা করেন।
মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা জামার হিজাবসহ ছবি ব্যবহার করবে, তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে হিজাববিহীন ছবিটি সংরক্ষণ করবে এবং শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, তা ব্যবহার করা হবে। কিন্তু জামা যুক্তি দেন, ওই ছবির অস্তিত্বই তার ধর্মীয় অধিকারের লঙ্ঘন।
বিচারক জেফ্রি ব্রায়ান তার রায়ে বলেন, যেকোনো নীতিমালা যা একজন ব্যক্তিকে তার ধর্মীয় বিশ্বাস লঙ্ঘন করতে বাধ্য করে বা শাস্তির ভয়ে সেই বিশ্বাস ত্যাগ করতে বাধ্য করে, তা তার ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর গুরুতর বোঝা সৃষ্টি করে। তিনি আরো বলেন, জামাকে হিজাব খুলে ছবি তুলতে বাধ্য করা মানে তাকে দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা। শাস্তি কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস লঙ্ঘন।
এই মামলায় বিচারক যুক্তরাষ্ট্রের রিলিজিয়াস ফ্রিডম রেস্টোরেশন অ্যাক্ট (আরএফআরএ) আইনের উল্লেখ করেন, যা অনুযায়ী সরকার কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় অনুশীলনে হস্তক্ষেপ করতে পারে না, যদি না তা অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন হয় এবং তা সর্বনিম্ন সীমায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়।বিচারক ব্রায়ান বলেন, কারা কর্তৃপক্ষ যে যুক্তি দিয়েছে যে, হিজাববিহীন ছবি পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তা প্রমাণ করার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য তারা উপস্থাপন করতে পারেনি। বরং তিনি উল্লেখ করেন, জামার দৃঢ় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এমনকি পালিয়ে গেলেও তিনি হিজাব পরবেন, যা তার পরিচয় নির্ধারণে যথেষ্ট হবে।
তিনি আরো বলেন, কারাগারের বর্তমান নীতি বৈষম্যমূলক, কারণ অন্য ধর্মাবলম্বী বন্দিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ, অমুসলিম বন্দিদের হেডস্কার্ফ ছাড়া ছবি তুলতে বাধ্য করা হয় না, যা নীতির অসাম্যতা নির্দেশ করে।বিচারক তার রায়ে উল্লেখ করেন, যেকোনো ব্যক্তি ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে, এমনকি মাথায় স্কার্ফ পরেও পালিয়ে যেতে পারে। তাই শুধু মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম প্রয়োগ করা যৌক্তিক নয়।
এ মামলায় যুক্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মুসলিম অধিকার সংস্থাকাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার)। সংস্থাটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে জামার পক্ষে আইনি সহায়তা প্রদান শুরু করে। কেয়ারের আইনজীবী আয়া বেইদৌন এই রায়কে একটি বড় জয় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, এটি শুধু মিসেস জামার জন্য নয়, বরং দেশের সব মুসলিম নারী বন্দিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। এই রায় স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে, কারাগার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের ধর্মীয় অধিকার ও মর্যাদা উপেক্ষা করতে পারে না। তিনি আরো বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতে সারা দেশের বিভিন্ন কারাগারে নীতিমালা পরিবর্তনের জন্য কাজ করবেন, যাতে ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়।
কেয়ারের অভিযোগে বলা হয়, দেশের অনেক কারাগার ও সরকারি সংস্থা ইতোমধ্যেই হিজাবের ধর্মীয় গুরুত্ব স্বীকার করে এবং হিজাবসহ ছবি গ্রহণ করে থাকে, কোনো অতিরিক্ত হিজাববিহীন ছবি তোলার প্রয়োজন ছাড়াই। কিন্তু ফেডারেল ব্যুরো অব প্রিজনস (বিপিও) এক্ষেত্রে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কেন তাদের আলাদা নীতি প্রয়োজন।
এ মামলার ফলস্বরূপ, জামার পরিচয়পত্রসহ অন্যান্য নথিতে তার হিজাবসহ ছবি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, তার হিজাববিহীন সব ছবি স্থায়ীভাবে ধ্বংস করতে হবে।রায় ঘোষণার পর মুনা জামা তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, এটা স্বস্তির। এখনও এমন মানুষ আছেন যারা সংবিধান ও আমাদের অধিকার রক্ষা করেন। আমি বিচারকের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। তিনি সত্যটা দেখেছেন। এখন মনে হচ্ছে আমি স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারছি।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ রায় ভবিষ্যতে ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত মামলাগুলোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। এটি বিশেষ করে কারাগারের মতো সীমাবদ্ধ পরিবেশে বসবাসরত ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মীয় স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের একটি মৌলিক অধিকার। তবে বাস্তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা ও কারা ব্যবস্থায়, এই অধিকার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই রায় সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিমালা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রায়ের ফলে শুধু মুসলিম নারীদের নয়, অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, নিরাপত্তার অজুহাতে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা যাবে না, যদি না তা একান্ত প্রয়োজনীয় এবং প্রমাণসাপেক্ষ হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে এবং আশা প্রকাশ করেছে যে, ভবিষ্যতে কারা ব্যবস্থায় আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
সবশেষে বলা যায়, মুনা জামার এ আইনি লড়াই শুধু ব্যক্তিগত ন্যায়বিচার অর্জনের গল্প নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নের প্রতিফলন যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি সামনে এসেছে। এ রায় সে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।