১৩ মে ২০২৬, বুধবার, ০৬:৫৬:০৫ অপরাহ্ন


কার দিকে তীর আসিফ মাহমুদের- জামায়াত না বিএনপি?
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০৫-২০২৬
কার দিকে তীর আসিফ মাহমুদের- জামায়াত না বিএনপি? আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া


বিএনপির বর্তমান রাজনীতিতে অসন্তোষ বাড়ছে, যা তাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বিএনপির অনেক বড় নেতার সন্তানরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এমনকি স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সন্তানরাও জানাচ্ছেন, তাদের কাছে বর্তমান রাজনীতি গ্রহণযোগ্য নয়। ভবিষ্যতে তাদের কাউকে কাউকে এনসিপিতে দেখা যেতে পারে।

কথাগুলো শোনা গেলো জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)’র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মুখে। তিনি এ বক্তব্য দেন সম্প্রতি রাজধানীর বাংলামটরের রূপায়ণ টাওয়ারে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘রাজনীতিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকের যোগদান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে। ওই অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ড. মো. নাদিমুর রহমানসহ অনেকে এনসিপি যোগ দিয়েছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে আসিফ মাহমুদ সজীব রাজনীতির মাঠে এই বক্তব্য দেন।

আসিফের এই বক্তব্য আসলে কার বিরুদ্ধে

তবে তা এই বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার শেষ নেই। অনেকের প্রশ্ন তিনি কি এ-ই বার্তা বিএনপিকে দিলেন? না-কি তাদের অন্যতম জোটসঙ্গী জামায়াতকে দিলেন? বিশ্লেষকতের মতে, প্রথমে ধরে নেওয়া যাক আসিফ মাহমুদ সজীবের এই মন্তব্য করেছেন বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে। কেননা এর আগে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ও ঢাকা-৭ আসনের সাবেক স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসহাক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপি যোগ দিয়েছেন। গত ২৪ এপ্রিল রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অফ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে এক অনুষ্ঠানে তিনি এনসিপিতে যোগ দেন। তাই আসিফ মাহমুদ সজীবে বোঝাতে চেয়েছেন যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ক্রমে অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে। কেননা বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এসে অতীতের মতো দলটির নেতাকর্মীরা প্রশাসনের সহায়তায় চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের নিপীড়ন নির্যাতনের পরও বিএনপির নেতাকর্মীদের আচরন ঠিক হয়নি। তাই বিএনপির অনেক নেতাকর্মীরাই নয় দলটির শীর্ষদের সন্তানরা এনসিপির রাজনীতি পছন্দ করে। এজন্যই তারা এনসিপিকে যোগ দিচ্ছেন। 

জামায়াত নেতার সন্তান কেনো এনসিপিতে? 

এবার তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ক্ষমতায় গিয়ে যদি বিএনপি অতীতের মতো দেশ চালাচ্ছে বলে অভিযুক্তরা করা হয়, সেক্ষেত্রে দেশে বর্তমানে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত ইসলামীর ব্যাপারে তো আসিফ মাহমুদ সজীবদের কোনো বক্তব্য কি? ইতোমধ্যে একটি গণমাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জামায়াতীকরণের অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জামায়াত এনসিপি মিলে মিশে প্রশাসনের অত্যন্ত শক্তিশালী স্থানে তাদের রাজনৈতিক আর্দশের লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার বড়ো ধরনের অভিযোগের পাহাড় বিএনপি’র টেবিলে। গণমাধ্যমগুলিতে বিএনপির একজন দু’জন প্রভাবশালী নেতাদের শীর্ষ পদে বসিয়ে পুরো গণমাধ্যম অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দখল নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তারপরেও যেহেতু জামায়াতে ইসলামী এখন আসিফ মাহমুদ সজীবদের এনসিপি অন্যতম জোটসঙ্গী। তা-ই এখন হয়তো তাদের ব্যাপারে আসিফ মাহমুদ সজীবদের নিরবতা থাকাই স্বাভাবিক বলে অনেকে মনে করেন। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যাক জামায়াত ইসলামী সৎ মানুষের শাসন কায়েম করছে, তা-ই এনসিপির মতো তরুণদের প্রিয় দল। তাহলে জামায়াত নেতার সন্তানরা কেনো জামায়াতে যোগ দিচ্ছেন না? কেনো দলটির সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ড. মো. নাদিমুর রহমান এনসিপি যোগ দিলেন। তাহলে জামায়াত কি দলটির নেতাদের সন্তানদের প্রিয় দল না। আর ড. মো. নাদিমুর রহমান-তো জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীরের সন্তান। ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০১৬ সালের ১১ মে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাহলে কি ড. মো. নাদিমুর রহমানেরও পছন্দ না তার পিতার করা দল জামায়াত ইসলামী? এ বিষয়টির সাদামাটা উত্তর হয়তবা কেউ বলে পাওয়া যেতো এই ভাবে যে তার তো ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার-স্যাপার থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থাকবে কেননা ড. মো. নাদিমুর রহমান জামায়াত ইসলামীর অন্যতম নেতা আমির মতিউর রহমান নিজামীর সন্তান। 

এনসিপি ছেড়ে কেনো গণসংহতিতে

এদিকে এনসিপি’র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার যখন বিএনপি’র দিকে তীর ছুঁড়ে মারছেন তখন তার দলের নেতাকর্মীরা যোগ দিয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনে। রাঙামাটিতে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা ৩৫ নেতা-কর্মী যোগ দিয়েছেন গণসংহতিতে। রাঙামাটি জেলা শাখা এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব উজ্জ্বল চাকমা এ যোগদান কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। তিনি চলতি বছরের ৫ মার্চ এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন। আর এপ্রসঙ্গে অনুষ্ঠানে উজ্জ্বল চাকমা বলেন, ‘আমরা এনসিপির সাবেক ৩৫ নেতা-কর্মীসহ ১০ উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দুই শতাধিক লোক গণসংহতিতে যোগ দিয়েছি। মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ায় আমরা এনসিপি ছেড়ে গণসংহতি আন্দোলনে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তাহলে এনসিপিতে কেন পদত্যাগের হিড়িক

গত এবং চলতি বছরে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট, আদর্শিক বিচ্যুতি, অভ্যন্তরীণ অনিয়ম এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদায়নের অভিযোগে এনসিপি থেকে ব্যাপক পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ রাঙামাটি এবং এর আগে হাবিবগঞ্জ ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় দলটির বহু প্রভাবশালি নেতাকর্মী, এমনকি শীর্ষ নারী নেত্রীরাও পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগীরা দলের নীতিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন। 

শেষ কথা

এনসিপি হলো বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আত্মপ্রকাশ করা একটি নতুন রাজনৈতিক দল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে গঠিত এই দলটি গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। অন্যদিকে বিএনপি একটি বিশাল দল। সতের বছরের নিপীড়ন নির্যাতন পরেও দলের ঐক্য অটুট আছে। অন্য একটি দল থেকে রাগে অভিমানে কেউ কেউ দল বদলাতে পারে। হালুয়া রুটি না পাওয়ার ক্ষোভে এমন হতে পারে। কিন্তু জামায়াতের মতো একটি ক্যাডারভিত্তিক দলের দলটির সর্বস্তরের মতে ত্যাগি নেতার সন্তান কোনো এনসিপিতে যোগ দেবে? জামায়াতকে তার পছন্দ হয়নি? বা জামায়াতের কি আদর্শচ্যুতি ঘটেছে? তা না হলে জামায়াত ইসলামীর অন্যতম নেতা আমির মতিউর রহমান নিজামীর সন্তান ড. মো. নাদিমুর রহমান কেনো এনসিপিতে যাবে? তাহলে ধরে নেওয়া যায় কি আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আসলে তার ওই বক্তব্য জামায়াতেই উদ্দেশ্য করে বলেছেন? এমন পরিস্থিতি দেখতে আসলে বেশি সময় নেবে বলে অনেকে মনে করেন। 

শেয়ার করুন