১৩ মে ২০২৬, বুধবার, ০৯:০৪:৫৬ অপরাহ্ন


যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১২ জনের নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০৫-২০২৬
যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১২ জনের নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ সার্টিফিকেট অব সিটিজেনশিপ


ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (ডিওজে) এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ১২ জন স্বাভাবিকীকৃত মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব বাতিল বা ডিন্যাচারালাইজেশন মামলা ফেডারেল আদালতে দায়ের করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সহায়তা, যুদ্ধাপরাধ, গুপ্তচরবৃত্তি, অভিবাসন জালিয়াতি, অস্ত্র পাচার, আর্থিক প্রতারণা এবং শিশু যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে এবং বিষয়টি ইতোমধ্যে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন বা মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কারো বিরুদ্ধে অতীতের অপরাধ লুকানোর অভিযোগ রয়েছে, আবার কারো ক্ষেত্রে অভিযোগ করা হয়েছে, নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তারা সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রতি সমর্থন দেখিয়েছেন। প্রশাসনের দাবি, এসব ব্যক্তি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার যোগ্য ছিলেন না।

মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী, কেউ যদি প্রতারণা, তথ্য গোপন বা ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভ করেন, তাহলে আদালতের মাধ্যমে সেই নাগরিকত্ব বাতিল করা যেতে পারে। ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, যারা যৌন নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত, সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে অথবা প্রতারণার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছে, তাদের কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া উচিত ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন ব্যবস্থার এই গুরুতর অপব্যবহার সংশোধনে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ডিওজের সিভিল ডিভিশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রেট এ শুমেট বলেন, আমরা রেকর্ড গতিতে ডিন্যাচারালাইজেশন মামলা করছি, যাতে নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ার সততা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব বাতিল বা ডিন্যাচারালাইজেশন একটি বিরল প্রক্রিয়া, যদিও এটি আইনি কাঠামোর মধ্যে অনুমোদিত। সাধারণত যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে নাগরিকত্ব নিয়েছে বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছে, তাহলে ফেডারেল সরকার আদালতের মাধ্যমে নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রমাণের মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর, যেখানে সরকারকে স্পষ্ট ও সন্দেহাতীত প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়। এ প্রক্রিয়া তদারকি করে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস।

আল কায়েদা সংশ্লিষ্টতা ও হত্যার অভিযোগ

সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলোর একটি হলো ইরাকের নাগরিক আলি ইউসিফ আহমেদ আল-নুরির বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বলছে, তিনি ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় দাবি করেছিলেন যে আল কায়েদা তাকে ও তার পরিবারকে আক্রমণ করেছিল। কিন্তু পরে ইরাক সরকার তাকে ২০০৬ সালে দুই ইরাকি পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়।ইরাকের দাবি, আল-নুরি আল কায়েদার একজন নেতা হিসেবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র আরো জানতে পারে, তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় নিজের অপরাধমূলক ও পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে শপথ করে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন।

শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ধর্মযাজক

কলম্বিয়ার নাগরিক ও ক্যাথলিক পুরোহিত অস্কার আলবের্তো পেলায়েজের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ভয়াবহ শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে তিনি ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে একাধিকবার যৌন নির্যাতন করেন।

২০০২ সালে তিনি শিশু যৌন নির্যাতনের ১৩টি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। বিচার বিভাগ বলছে, নাগরিকত্ব আবেদনের সময় তিনি এসব অপরাধ গোপন করেছিলেন এবং নিজেকে ‘সৎ চরিত্রের’ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।

আল-কায়েদাকে অর্থ সহায়তা

মরক্কোর নাগরিক খালিদ ওয়াজ্জানির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার আগেই আল-কায়েদাকে সহায়তার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন। পরে তিনি হাজার হাজার ডলার আল কায়েদাকে পাঠান এবং ২০০৮ সালে সংগঠনটির প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন। ২০১০ সালে তিনি ব্যাংক জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং আল-কায়েদাকে সহায়তার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। ডিওজে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেওয়ার সময় তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন।

আল-শাবাবে যোগদানের অভিযোগ

সোমালিয়ার নাগরিক সালাহ ওসমান আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০০৭ সালে নাগরিকত্ব পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি সোমালিয়ায় গিয়ে জঙ্গি সংগঠন আল-শাবাবে যোগ দেন। তিনি পরে সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, নাগরিকত্ব গ্রহণের সময় তিনি প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি অনুগত ছিলেন না।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ

গাম্বিয়ার সাবেক সামরিক পুলিশ কর্মকর্তা বাবুকার এমবুবের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধে অংশ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে তিনি আরো ১৫ সেনাসদস্যের সঙ্গে ছয়জন সামরিক কর্মকর্তাকে বিচার ছাড়াই হত্যা করেন। পরে গাম্বিয়ার ট্রুথ, রিকনসিলিয়েশন অ্যান্ড রিপারেশনস কমিশনের শুনানিতে তিনি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। সরকার বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও নাগরিকত্ব নেওয়ার সময় তিনি নিজের সামরিক অতীত গোপন করেছিলেন।

অস্ত্র পাচার ও মাদক সহিংসতা

বলিভিয়ার নাগরিক কেভিন রবিন সুয়ারেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দক্ষিণ ফ্লোরিডা থেকে বলিভিয়াসহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অস্ত্র পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট সরকারের অভিযোগ, তিনি ভুয়া ক্রেতাদের মাধ্যমে অস্ত্র কিনে তা পাচার করতেন এবং এসব অস্ত্র পরে মাদক পাচারকারী সংগঠনগুলোর হাতে পৌঁছাতো।

ভুয়া বিয়ে ও অভিবাসন জালিয়াতি

উজবেকিস্তানের নাগরিক আবদুভোসিত রাজিকভের বিরুদ্ধে একাধিক ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে গ্রিনকার্ড ও অভিবাসন সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিওজে বলছে, তিনি প্রথমে নিজে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে ভুয়া বিয়ে করেন, পরে নিজের সঙ্গীকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য আরেকটি ভুয়া বিয়ের ব্যবস্থা করেন।

মেরিন সদস্যের বিরুদ্ধে অশ্লীল ছবি রাখার অভিযোগ

কেনিয়ার নাগরিক আবদাল্লাহ ওসমান শেখের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মার্কিন মেরিনে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের অশ্লীল ডিজিটাল ছবি সংরক্ষণ ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। বিচার বিভাগ জানায়, তিনি সামরিক সেবার ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পেলেও পরে অসদাচরণের কারণে অনারেবল নয় এমন অব্যাহতি পান।

ভারতীয় বংশোদ্ভূতের বিরুদ্ধে বিনিয়োগ জালিয়াতি

ভারতের নাগরিক দেবাশিস ঘোষের বিরুদ্ধে ২৫ লাখ ডলারের বিনিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। সরকার বলছে, তিনি একটি বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের নামে বিনিয়োগকারীদের প্রতারণা করেন এবং নাগরিকত্ব আবেদনের সময় দাবি করেন যে, তিনি কখনো অপরাধ করেননি।

ভুয়া পরিচয়ে নাগরিকত্ব

চীনের নাগরিক পিন হের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি পূর্বে বহিষ্কৃত হওয়ার পর নতুন পরিচয়ে আবার অভিবাসন সুবিধা নেন এবং পরে নাগরিকত্ব অর্জন করেন। একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে নাইজেরিয়ার নাগরিক জর্জ ওইয়াখিরের বিরুদ্ধেও। সরকার বলছে, তিনি ভুয়া নাম ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে নাগরিকত্ব পান।

কিউবার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি

সবচেয়ে উচ্চপ্রোফাইল মামলাগুলোর একটি হলো কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ভিক্টর ম্যানুয়েল রোচার বিরুদ্ধে।তিনি কিউবার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ১৯৭৩ সাল থেকেই তিনি কিউবার হয়ে কাজ করছিলেন, অথচ ১৯৭৮ সালে নাগরিকত্বের আবেদন করার সময় তিনি এসব তথ্য গোপন করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এ ডিন্যাচারালাইজেশন উদ্যোগ দেশটির অভিবাসন ও নাগরিকত্ব নীতি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন বরাবরই অবৈধ অভিবাসন, নাগরিকত্ব জালিয়াতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের পক্ষে কথা বলে এসেছে।

সরকারের সমর্থকদের দাবি, প্রতারণা বা অপরাধমূলক তথ্য গোপন করে যারা নাগরিকত্ব অর্জন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য জরুরি। অন্যদিকে অভিবাসন অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে অপব্যবহৃত হলে তা অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়াতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে কাউকেই দোষী হিসেবে গণ্য করা হবে না।

শেয়ার করুন