১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:১৬:৩৬ পূর্বাহ্ন


বিচারিক ভর্ৎসনার মুখে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি, আটকের সংখ্যা ৬৮ হাজার
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৮-০২-২০২৬
বিচারিক ভর্ৎসনার মুখে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি, আটকের সংখ্যা ৬৮ হাজার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ফেডারেল আদালতগুলো একের পর এক রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অভিবাসন আটক নীতিকে বেআইনি ঘোষণা করছে। তবু বাস্তবে গণআটক অভিযান থামেনি। আদালতের নথিগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত অক্টোবর থেকে অন্তত ৪ চার ৪২১টি মামলায় বিচারকরা রায় দিয়েছেন যে, ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) অভিবাসীদের অবৈধভাবে আটক রেখেছে। কিন্তু বহুক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও আটক অব্যাহত রয়েছে। একে প্রশাসনের বিরুদ্ধে এক বিস্তৃত ও নজিরবিহীন আইনি ভর্ৎসনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আটক অভিবাসীরা মুক্তির দাবিতে ২০ হাজারেরও বেশি মামলা দায়ের করেছেন। দেশের বিচারব্যবস্থায় নজিরবিহীন চাপ তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আদালতের একের পর এক রায়ে আটক বেআইনি ঘোষিত হওয়ার পরও আটক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ফলে হেবিয়াস করপাসসহ বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপের ঢল নেমেছে ফেডারেল আদালতগুলোতে। মামলার এ বিশাল পরিসর বিচারব্যবস্থাকে কার্যত জটের মুখে ফেলছে, কারণ হাজার হাজার পৃথক শুনানি, আদেশ ও আপিল একসঙ্গে পরিচালনা করতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষে এসব মামলায় লড়তে প্রায় ৭০০ জন বিচার বিভাগীয় আইনজীবীকে ইমিগ্রেশন সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে, ফলে বিচার ব্যাবস্থায় ফৌজদারি মামলাসহ অন্যান্য দায়িত্বেও প্রভাব ফেলছে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মনোনীত ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট জজ থমাস জনস্টন সম্প্রতি এক ভেনেজুয়েলান আটক ব্যক্তির মুক্তির নির্দেশ দিয়ে লিখেছেন, সরকার যেন স্পষ্ট আইনের ভাষা উপেক্ষা করে নতুন ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিতে চাইছে, যা চরম উদ্বেগজনক। অধিকাংশ রায়ের কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রায় তিন দশক ধরে চালু থাকা ফেডারেল আইনের ব্যাখ্যা থেকে প্রশাসনের সরে আসা। ওই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই বসবাসরত অভিবাসীরা তাদের ইমিগ্রেশন কোর্টে মামলা চলাকালে বন্ডে মুক্তির সুযোগ পেতেন। ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রথা কার্যত সীমিত করে ব্যাপক হারে বাধ্যতামূলক আটক নীতি প্রয়োগ করছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন দাবি করেছেন, প্রশাসন ফেডারেল অভিবাসন আইন আইনসম্মতভাবে প্রয়োগের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে কাজ করছে। ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মুখপাত্র ট্রিশিয়া ম্যাকলাফলিনও বলেন, অ্যাকটিভিস্ট বিচারকদের চ্যালেঞ্জের কারণে মামলার সংখ্যা বেড়েছে, এতে তারা বিস্মিত নন। তবে নির্দিষ্ট মামলাগুলোর তথ্য নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের জবাব দেয়নি সংস্থাটি।

ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর আইসিই হেফাজতে আটক ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬৮ হাজারে পৌঁছেছে। গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। এদিকে নিউ অরলিন্সভিত্তিক এক রক্ষণশীল আপিল আদালত সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়ে বলেছে, আগের প্রশাসনগুলো আইন পুরোপুরি প্রয়োগ না করলেও তা থেকে বর্তমান প্রশাসনের ক্ষমতা খর্ব হয় না। সার্কিট জজ এডিথ জোন্স দুই মেক্সিকান নাগরিকের মুক্তির পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল করেন, যদিও তাদের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী তারা আপাতত মুক্ত আছেন। অন্যান্য আপিল আদালতেও একই ইস্যুতে শুনানি আসন্ন।

ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২০ হাজার ২০০-এর বেশি ফেডারেল হেবিয়াস করপাস মামলা দায়ের হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় বিরল চাপ তৈরি করেছে। হেবিয়াস করপাস হলো ল্যাটিন শব্দ, যার অর্থ দেহ হাজির করো। আইনটি ১৩০০ দশকে ইংল্যান্ডে উদ্ভূত হয়ে পরে মার্কিন সংবিধানে সুরক্ষিত অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। বেআইনি আটকের বিরুদ্ধে এটি নাগরিকদের অন্যতম প্রধান আইনি আশ্রয়। আদালত ডকেট বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, ৪০০-এর বেশি ফেডারেল বিচারক অক্টোবরের শুরু থেকে হাজারো রায়ে আইসিইর আটককে অবৈধ বলেছেন; আরো বহু মামলা বিচারাধীন, খারিজ, বা অন্য জেলায় স্থানান্তরিত হয়েছে।

উইসকনসিনে ট্রাফিক স্টপে গ্রেফতার হওয়া ১৮ বছর বয়সী ভেনেজুয়েলান শিক্ষার্থী জোসেফ থমাস ও তার বাবা এলিয়াস থমাসের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। তারা ২০২৩ সালের আগস্টে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন এবং কাজের অনুমতিও ছিল। এক মাসের মধ্যে পৃথক দুই বিচারক তাদের মুক্তির নির্দেশ দেন। বুশ মনোনীত চিফ ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ প্যাট্রিক শিল্টজ বলেন, জোসেফ বাধ্যতামূলক আটকের আওতায় পড়েন না এবং গ্রেফতারের সময় আইসিইর কাছে পরোয়ানা ছিলএমন প্রমাণও নেই। ট্রাম্প মনোনীত আরেক বিচারক এরিক টস্ট্রুড এলিয়াসের জন্য বন্ড শুনানির যোগ্যতা স্বীকার করেন। মুক্তি পেলেও জোসেফ নিরাপত্তা শঙ্কায় এখন অনলাইনে পড়াশোনা করছে।

জানুয়ারিতে কয়েকদিনের ব্যবধানে দায়ের হওয়া হেবিয়াস মামলাগুলোর মধ্যে ছিল, মিনেসোটায় বাড়ির ড্রাইভওয়ে থেকে আটক পাঁচ বছর বয়সী এক ইকুয়েডরিয়ান শিশু, বৈধ মানবিক অস্থায়ী স্ট্যাটাসধারী এক ইউক্রেনীয় কর্মী, মার্কিন নাগরিকের স্বামী ও অটিস্টিক সন্তানের বাবা এক সালভাদোরীয়, শরণার্থী মর্যাদাপ্রাপ্ত এক এরিত্রিয়ান হাসপাতালকর্মী এবং স্কুলে মেয়েকে নামিয়ে ফেরার পথে আটক এক ভেনেজুয়েলান। কারো বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড ছিল না।

মামলার স্রোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে ফৌজদারি মামলার প্রসিকিউটরদের সরিয়ে হেবিয়াস মামলায় নিয়োজিত করতে হচ্ছে। আদালত ডকেট অনুযায়ী, ৭০০-এর বেশি জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট আইনজীবী ইমিগ্রেশন মামলায় সরকারের পক্ষে হাজির হয়েছেন; তাদের মধ্যে পাঁচজনের নাম ১ হাজারের বেশি হেবিয়াস মামলায় রয়েছে। মিনেসোটায় জজ শিল্টজ এক আদেশে বলেন, সরকার ৭৬টি মামলায় ৯৬টি মুক্তির আদেশ লঙ্ঘন করেছে। নিউইয়র্কে ডিস্ট্রিক্ট জজ নুসরাত চৌধুরী লিখেন, আইসিই দুটি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন আদালত আদেশ অমান্য করে এক ব্যক্তিকে নিউজার্সির বদলে নিউ মেক্সিকোতে পাঠিয়েছে এবং আদালতকে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। তবে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র নাটালি বালদাসারে দাবি করেছেন, প্রশাসন আদালতের আদেশ মেনে চলছে এবং আইন প্রয়োগ করছে।

নিউইয়র্কে ইমিগ্র্যান্ট অধিকারকর্মীরা ইমিগ্রেশন কোর্টের বাইরে অপেক্ষা করে আটক ব্যক্তিদের আইনজীবীর সঙ্গে তাৎক্ষণিক হেবিয়াস আবেদন করতে সহায়তা করছেন, যাতে অন্য রাজ্যে দ্রুত স্থানান্তর ঠেকানো যায়। জানুয়ারির মাঝামাঝি ডিস্ট্রিক্ট জজ জে পল ওটকেন এক ইকুয়েডরিয়ান ব্যক্তিকে নিউইয়র্কের বাইরে স্থানান্তর না করার জরুরি আদেশ দেন, পরে জজ অ্যান্ড্রু কার্টার তার তাৎক্ষণিক মুক্তির নির্দেশ দেন। তবু অনেক অভিবাসী এই আইনি সহায়তা পান না। কেউ জানেন না যে হেবিয়াস আবেদন করা যায়, কারো পক্ষে আইনজীবীর খরচ বহন করা সম্ভব নয়। টেক্সাসের ব্লুবনেট ডিটেনশন সেন্টারে আটকদের হেবিয়াস আবেদন করতে তাকে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত আইনি খরচ প্রয়োজনীয় যা অনেকের পক্ষে অসম্ভব। বিচারিক ভর্ৎসনা ও প্রশাসনিক অটলতার এ দ্বন্দ্ব যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিকে এক নতুন আইনি সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে আদালতের আদেশ, নির্বাহী ক্ষমতা এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

শেয়ার করুন