কিয়েটোর ব্যাম্বো ফরেস্ট
রোববারের সকালটা কিয়োটোতে হয় আলাদা রকমের। শহর যেন একটু দেরিতে জাগে। আমরা কিয়োটো স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠি-গন্তব্য কোবে। সঙ্গে নিকিতা। কিয়োটোর মন্দির আর ঐতিহ্যের শান্ত পরিবেশ পেছনে ফেলে আমাদের ট্রেন যখন কোবের দিকে ছুটছিল, জানালার বাইরে দ্রুত বদলে যাচ্ছিল দৃশ্যপট। জানালার বাইরে পাহাড়, নদী আর ছোট ছোট শহর সরে যেতে থাকে। নিকিতা বলে-আজ পাহাড় ছেড়ে সমুদ্রের কাছে যাচ্ছি। শহর বদলাবে, মনও বদলাবে। হানকিউ-হানশিন লাইনের ট্রেন আমাদের নিয়ে যায় ধীরে ধীরে পশ্চিমে। কিয়োটোর ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য পেছনে ফেলে কোবের বাতাসে ঢ়ুকে পড়ে লবণের গন্ধ, বন্দরের ডাক।
কোবে পৌঁছতেই আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল মেরিকেন পার্ক। সাগরের নোনা বাতাস আর বিশাল খোলা চত্বর মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয়। ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত ‘পোর্ট টাওয়ার’। নিকিতা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো-জানো, ১৮৬৮ সালে এই বন্দরটি যখন প্রথম বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত হয়, তখন থেকেই কোবে তার নিজস্বতা হারিয়ে বৈশ্বিক হয়ে উঠেছিল। ঠিক যেমন মানুষ কাউকে ভালোবাসলে নিজের অজান্তেই বদলে যায়। ওর কথার গভীরতা মাপার আগেই আমরা পা বাড়ালাম হারবার ল্যান্ডের দিকে। বিশাল ফেরিস হুইল আর সাগরের পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা শপিং মলগুলোর জাঁকজমক অন্যরকম এক আমেজ তৈরি করে।
নিকিতা বলে, বিকেলের আলো গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে হারব্রোডল্যান্ড জীবন্ত হয়ে ওঠে। ক্যাফে, দোকান, রাস্তার সংগীত-সব মিলিয়ে একটা উৎসবের আমেজ শুরু হয়। সমুদ্রের জলে আলো ভেঙে পড়ে হাজার টুকরো হয়ে। কফি হাতে নিয়ে আমরা যখন সাগরের দিকে মুখ করে বসলাম, তখন নিকিতা বললো-সাগর মানুষকে উদার হতে শেখায়, আর এ শহর শেখায় হার না মেনে আবার বেঁচে উঠতে। নিকিতা বলে, ১৯৯৫ সালের ভয়াবহ হানশিন ভূমিকম্পের স্মৃতি এখানে এখনো সংরক্ষিত। ভাঙা পাথর আর ফাটলগুলো বলে দেয়, এ শহর কেবল সুন্দর নয়, সহনশীলও। নিকিতা ধীরে বলে, কোবে জানে কীভাবে ভেঙে আবার দাঁড়াতে হয়। আমি তাকিয়ে থাকি সমুদ্রের দিকে কিছু শহর মানুষকে শক্ত হতে শেখায়। কোবে কেবল সমুদ্রের নয়, পাহাড়েরও শহর। আমরা যখন কিতানো-চো (Kitano-cho) এলাকার পাহাড়ি গলিপথ দিয়ে হাঁটছিলাম, মনে হচ্ছিল জাপানের বুকে এক টুকরো ইউরোপ। উনিশ শতকে এখানে বিদেশি বণিকরা তাদের আবাসস্থল গড়ে তুলেছিল, যেগুলোকে বলা হয় ‘ইজিকান’ (Ijikan)। সরু গলিপথ দিয়ে ওপরে ওঠার সময় নিকিতা কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছিল। ওর হাতটা ধরতেই ও লাজুক হাসল। সেই পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে দাঁড়িয়ে ও শোনালো এক অদ্ভুত লোককথা। ওর স্নিগ্ধ কণ্ঠ আর পাহাড়ের নিস্তব্ধতা মিলে মিশে এক মায়াবী রোমান্টিকতা তৈরি হয়েছিল সেখানে।
স্বাদের তৃপ্তিতে কোবে ডাইনিং : ভ্রমণ আর খাবার-এ তো একে অপরের পরিপূরক। কোবেতে এসে বিখ্যাত কোবে বিফ (Kobe Beef) টেস্ট না করলে ভ্রমণটাই অপূর্ণ থেকে যেত। একটি স্থানীয় রেস্তোরাঁয় বসে যখন সেই নরম, মুখে মিলিয়ে যাওয়া বিফ উপভোগ করছিলাম, নিকিতা তখন জাপানিজ চপস্টিক ব্যবহারের নিপুণতা দেখাচ্ছিল। বিকালের নাশতায় আমরা খেলাম স্থানীয় ‘আকাশিয়াকি’ (এক ধরনের নরম অক্টোপাস বল)। খাবারের স্বাদের চেয়েও নিকিতার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া প্রতিটি মুহূর্ত ছিল বেশি সুস্বাদু। দিন শেষে যখন সূর্যটা কোবে সাগরের নীল জলে ডুব দিচ্ছিল, আমরা তখন পাহাড়ের ওপর থেকে পুরো শহরটা দেখছিলাম। নিকিতা ধীর স্বরে বললো-কিছু কিছু দিন আসে যা কোনোদিন শেষ না হলেই ভালো হতো। ওর কথার প্রতিধ্বনি আমার হৃদয়েও বাজছিল। কোবে কেবল একটি আধুনিক শহর নয়, এটি নিকিতার মতো এক স্মৃতির শহর হয়ে রইলো আমার কাছে।
কিঙ্কাকু-জি (কিয়েটোর সোনার মন্দির)
কিয়োটোর সকালটা যেন ইচ্ছে করেই ধীরে জাগে। শহরের প্রাচীন রাস্তায় তখনো রাতের নীরবতা পুরো কাটেনি। কফির উষ্ণ ধোঁয়ার মতো হালকা কুয়াশা ভাসছে বাতাসে। আমি আর নিকিতা কিয়োটো স্টেশন থেকে বাসে উঠলাম, গন্তব্য কিঙ্কাকু-জি, জাপানের সবচেয়ে পরিচিত অথচ বারবার নতুন মনে হওয়া সোনার মন্দির। বাসটা শহরের কেন্দ্র ছাড়িয়ে উত্তর-পশ্চিম কিয়োটোর দিকে এগোতে থাকল। জানালার বাইরে কখনো আধুনিক দোকানপাট, কখনো পুরোনো কাঠের বাড়ি, আবার কখনো হঠাৎই চোখে পড়ে শান্ত আবাসিক এলাকা। নিকিতা জানালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো-কিয়োটোর সৌন্দর্যটা ঠিক এমনই-চুপচাপ, কিন্তু গভীর।
আমি তার কথায় সায় দিয়ে মাথা নেড়ে বললাম, এই শহর শুধু দেখার নয়, অনুভবও করার। বাসের মৃদু দুলুনিতে নিকিতা আলতো করে আমার কাঁধে হাত রেখে ইশারায় দেখালো দূরের পাহাড়গুলো। মৃদু স্বরে বললো-জানো, কিয়োটোর মানুষ বিশ্বাস করে এই শহরটা তার আত্মাকে লুকিয়ে রাখে মন্দিরের শান্তিতে। আজ তুমি সেই আত্মার সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটি দেখতে যাচ্ছো। তার কণ্ঠের স্নিগ্ধতা আর বাসের জানলা দিয়ে আসা রোদে ভেজা কিয়োটোর রাস্তা-সব মিলিয়ে যাত্রাপথটা যেন এক রোমান্টিক সুরের মূর্ছনায় ভরে তুললো।
বাস থেকে নেমে খানিকটা হাঁটা পথ। পাইন গাছের সারির ভেতর দিয়ে এগোতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই জগৎবিখ্যাত দৃশ্য-কিঙ্কাকু-জি (Kinkaku-ji) বা গোল্ডেন প্যাভিলিয়ন।
নিকিতা বলে, এটি আসলে কোনো মন্দির হিসেবে নির্মিত হয়নি। ১৩৯৭ সালে শোগুন আশিকাগা ইয়োশিমিতসু তার অবসরের আবাস হিসেবে এটি তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার ইচ্ছানুযায়ী এটি জেন বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। এ মন্দিরটি কয়েকবার আগুনের গ্রাসে পড়লেও প্রতিবারই একে তার পূর্বের মহিমায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। নিকিতা বলে, পুকুরের স্থির টলটলে জলের ওপর যখন মন্দিরটির প্রতিফলন পড়ে, তখন মনে হয় যেন দুটো সোনার প্রাসাদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। মন্দিরের ওপরের দুটি তলা সম্পূর্ণ খাঁটি সোনার পাতে (Pure Gold Leaf) মোড়ানো। সূর্যের আলো যখন সেই সোনার গায়ে ঠিকরে পড়ে, চারপাশের সবুজ অরণ্য আর নীল আকাশকেও যেন ম্লান মনে হয়।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিলাম। নিকিতা আমার খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। তার গায়ের হালকা পারফিউমের ঘ্রাণ আর পাইন বনের সতেজতা মিলেমিশে একাকার। সে ফিসফিস করে বললো-এই সোনা শুধু আভিজাত্যের প্রতীক নয়, এটি মানুষের মনের ভেতরের মালিন্য দূর করে পবিত্রতাকে খুঁজে পাওয়ার প্রতীক। তাকিয়ে দেখো, বাইরের জগতটা কত কোলাহলপূর্ণ, অথচ এই প্রাসাদের ছায়ায় সব কেমন শান্ত। আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। মন্দিরের সোনালি আভা যেন ওর চোখেও প্রতিফলিত হচ্ছিল। আমি বললাম-নিকিতা, এই দৃশ্যটা সুন্দর, কিন্তু তোমার বর্ণনায় এটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ও মৃদু হাসল, সেই হাসিতে যেন কিয়োটোর হাজার বছরের স্নিগ্ধতা লুকিয়ে ছিল।
মন্দির চত্বর পেরিয়ে আমরা যখন পাহাড়ি পথ দিয়ে ওপরের দিকে উঠছিলাম, ছোট ছোট ঝরনা আর পাথুরে বাগানের শান্ত পরিবেশ আমাদের আরো কাছাকাছি নিয়ে এল। নিকিতা জাপানি লোকগাথা শোনাচ্ছিল, আর আমি ভাবছিলাম, পৃথিবীর সব পথ যদি এমন কোনো গাইড আর এমন কোনো গন্তব্যে শেষ হতো! নিকিতা বলছিল, মন্দিরের তিন তলার তিন রূপ : কিঙ্কাকু-জির প্রতিটি তলা ভিন্ন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত, যা জাপানি সংস্কৃতির বিবর্তনকে তুলে ধরে। প্রথম তলাটি শিনডেন শৈলীর (একাদশ শতাব্দীর অভিজাতদের স্টাইল), দ্বিতীয় তলাটি বুক বা সামুরাই যোদ্ধাদের শৈলীর এবং তৃতীয় তলাটি চীনের জেন বুদ্ধিজীবী শৈলীর। নিকিতা আমাকে বুঝিয়ে বলছিল, কীভাবে এই তিনটি ভিন্ন ধারা একটি ভবনে এসে শান্তিতে সহাবস্থান করছে।
নিকিতা বলে, মন্দিরের উপরের দুই তলায় যে সোনার প্রলেপ রয়েছে, তার ওজন কয়েক কেজি হতে পারে। ১৯৮৭ সালে যখন এটি সংস্কার করা হয়, তখন আগের চেয়েও পুরু সোনার পাত ব্যবহার করা হয়েছিল। নিকিতা দু’ুমি করে বলছিল-এই সোনা শুধু দেখার জন্য নয়, এটি সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে মন্দিরের কাঠকেও রক্ষা করে। নিকিতা বলে, ১৯৫০ সালে এক তরুণ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর হাতে এই মন্দিরটি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। সেই মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে বিখ্যাত লেখক ইউকিও মিশিমা তার ‘দ্য টেম্পল অফ দ্য গোল্ডেন প্যাভিলিয়ন’ উপন্যাসটি লিখেছিলেন। বর্তমান যে কাঠামোটি আমরা দেখছি, তা ১৯৫৫ সালে হুবহু আগের মতো করে পুনর্নির্মিত।
যাত্রার শেষে যখন আমরা জাপানিজ গ্রিন টি বা ‘মাচা’র কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম, তখন সূর্যাস্তের আলোয় কিঙ্কাকু-জি আরো একবার রক্তিম আভা ছড়ালো। এ ভ্রমণ শুধু ইতিহাসের পাতায় হাঁটা নয়, এটি ছিল প্রকৃতির সান্নিধ্যে এক রোমান্টিক হৃদয়ের স্পন্দন শোনা।
কীভাবে যাবেন : কিয়োটো স্টেশন থেকে সিটি বাস ২০৫ বা ১০১ ধরে সরাসরি কিঙ্কাকু-জি যাওয়া যায়। সময়: প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
কানাজাওয়ার কেনরোকুয়েন গার্ডেন
কিয়োটো স্টেশন থেকে যখন আমরা থান্ডারবার্ড এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠলাম, জানালার বাইরে তখন জাপানের গ্রাম্য নিসর্গ। নিকিতা আমার পাশের সিটে বসে নিবি’ মনে একটি মানচিত্র দেখছিল। হঠাৎ মুখ তুলে বললো-জানো, কানাজাওয়া মানে হলো ‘সোনার জলাভূমি’। আজ আমরা এমন এক বাগানে যাচ্ছি, যা কেবল ঘাস আর গাছের সমারোহ নয়, বরং মানুষের তৈরি প্রকৃতির এক নিখুঁত ব্যাকরণ। নিকিতার কণ্ঠের সেই গভীরতা আর ট্রেনের মৃদু দুলুনি আমাদের কানাজাওয়ার পথে এক রোমান্টিক আবহ তৈরি করে দিল। ট্রেন থেকে নেমে আমরা যখন কেনরোকুয়েন গার্ডেনের প্রধান ফটকে পৌঁছলাম, তখন দুপুরের রোদে গাছের পাতাগুলো ঝিকমিক করছে। এটি জাপানের অন্যতম সেরা তিনটি বাগানের মধ্যে একটি।
নিকিতা জানায়, ১৬৭৬ সাল থেকে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে কগা বংশের সামুরাই শাসকরা এই বাগানটি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন। এর নামের অর্থ হলো ‘ছয়টি বৈশিষ্ট্যের বাগান’। জেন দর্শন অনুযায়ী একটি নিখুঁত বাগানে ছয়টি গুণ থাকতে হয়-প্রশস্ততা, নির্জনতা, কৃত্রিমতা, প্রাচীনত্ব, প্রচুর জলরাশি এবং প্যানোরামিক দৃশ্য। নিকিতা হাসিমুখে বললো-এ বাগানে পা রাখা মানেই হলো একসঙ্গে এই ছয়টি অনুভূতিকে নিজের ভেতর ধারণ করা।
বাগানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘কাসুমি-গা-ইকে’ পুকুর। এর স্বচ্ছ জলে নীল আকাশ আর পাইন গাছের প্রতিফলন দেখে মনে হচ্ছিলোকোনো নিপুণ চিত্রকর ক্যানভাসে রঙের খেলা দেখিয়েছেন। আমরা যখন বিখ্যাত ‘কোতোজি-তোরো’ (পাথরের লণ্ঠন) এর সামনে দাঁড়ালাম, নিকিতা আলতো করে আমার হাত ছুঁয়ে বললো-জাপানিরা বিশ্বাস করে এই লণ্ঠনের দুটি পা যেন এক জোড়া মানুষের ভাগ্য, যা পাথরের ওপর দাঁড়িয়েও যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে। বাগান থেকে বের হতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো শুভ্র ও বিশাল কানাজাওয়া ক্যাসেল। নিকিতা জানায়, ১৫৮৩ সাল থেকে এটি ছিল শক্তিশালী মায়েদা বংশের দুর্গ। সাদা দেয়ালে মোড়ানো দুর্গটি আর তার বিশাল ‘ইশিকাওয়া-মন’ গেট যেন আজও সামুরাইদের শৌর্য-বীর্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
নিকিতা দুর্গের বিশাল পাথরের দেয়ালগুলো দেখিয়ে বললো-দেখো এই পাথরগুলো কত নিখুঁতভাবে বসানো, ঠিক যেন একটি পাজল। সামুরাইরা তাদের গোপন কৌশল এই দেয়ালের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রাখত। নিকিতা বলে, কানাজাওয়ার ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যাবে যদি এখানকার খাবারের স্বাদ না নেওয়া হয়। চলো খাওয়া যাক। কানাজাওয়া জাপানের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক খাবারের কেন্দ্র। নিকিতা আমাকে নিয়ে গেল ওমিচো মার্কেটে। সেখানে আমরা খেলাম বিখ্যাত ‘কাইসেন-দন’ (তাজা সামুদ্রিক মাছের স্লাইস দেওয়া ভাতের বাটি)। প্রতিটি টুকরো যেন সাগরের সতেজতা বয়ে আনছে।
তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল ডেজার্টে। নিকিতা বল্ল, আমরা ‘কিনপাকু আইসক্রিম’ খাব। এটি ভ্যানিলা আইসক্রিম, যার ওপরে আস্ত একটি পাতলা সোনার পাত (Gold Leaf) জড়িয়ে দেওয়া হয়। সোনার প্রলেপ লাগানো সেই আইসক্রিমে প্রথম কামড় দিয়ে আমি থমকে গেলাম। নিকিতা হাসতে হাসতে নিজের রুমাল দিয়ে আমার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা আইসক্রিম মুছে দিতে দিতে বললো-এখন তোমার ঠোঁটেও কানাজাওয়ার সোনা লেগে আছে! বিকালের শেষ আলো যখন কানাজাওয়ার আকাশকে আবির রঙে রাঙিয়ে দিলো, আমরা তখন হিগাসি চায়া ডিস্ট্রিক্টের সরু গলিগুলো ধরে হাঁটছি। কাঠের পুরোনো ঘরবাড়ি আর দূর থেকে ভেসে আসা শামিসেনের সুর-সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিলো যেন এক স্বপ্নের জগৎ। আমি মনে মনে ভাবলাম, কানাজাওয়ার সোনা বা কেনরোকুয়েনের সৌন্দর্য-সবই ম্লান হয়ে যেত যদি না আমার পাশে নিকিতার মতো একজন মায়াবী গাইড থাকত।
সাগানো ব্যাম্বো ফরেস্ট
জাপানের প্রাচীন রাজধানী কিয়েটো তার মন্দির, রাজকীয় ইতিহাস আর ঋতুভিত্তিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে শহরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সাগানো ব্যাম্বো ফরেস্ট এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার নাম-যেখানে স্থাপত্য নয়, প্রকৃতিই প্রধান চরিত্র। কিয়েটো স্টেশন থেকে জেআর সাগানো (San-in) লাইনে মাত্র ১৫-২০ মিনিটের যাত্রা। Saga-Arashiyama স্টেশনে নামার পর অল্প হাঁটলেই শুরু হয় বাঁশবনের রাজ্য। আমরা যাচ্ছি সেই বাঁশ বন দেখার জন্য সঙ্গে গাইড নিকিতা।
আমরা রওনা দিলাম কিয়েটো স্টেশন থেকে। জেআর সাগানো (San-in) লাইনের ট্রেনে বসে জানালার বাইরে তাকালে শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। মাত্র পনেরো-বিশ মিনিটের পথ, কিন্তু মনে হয় যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করছি। আরাশিয়ামা স্টেশনে নেমে নিকিতা হালকা হাসি দিয়ে বললো-কিয়েটোর অনেক মন্দির আছে। কিন্তু আজ আমরা এমন এক জায়গায় যাচ্ছি যেখানে দেবতা নেই, অথচ আত্মা আছে। সাগানো ব্যাম্বো ফরেস্ট, যা অনেকের কাছে আরাশিয়ামা ব্যাম্বো গ্রোভ নামেও পরিচিত-কিয়েটোর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এখানে ঢোকার মুহূর্তেই শব্দ বদলে যায়। মানুষের কথা, পায়ের শব্দ-সবকিছু যেন বাঁশের উঁচু কাণ্ডে আটকে নরম হয়ে ফিরে আসে। সাগানো ব্যাম্বো ফরেস্ট মূলত লম্বা ও ঘন বাঁশগাছের প্রাকৃতিক পথ। শত শত বাঁশ আকাশের দিকে সোজা উঠে গিয়ে তৈরি করেছে সবুজ করিডর। সূর্যের আলো এখানে সরাসরি পড়ে না; আলো ভেঙে নেমে আসে, ছায়া আর সবুজের মিশেলে এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করে। বাতাস বইলেই বাঁশের কাণ্ডগুলো পরস্পরের গায়ে ঘষা খেয়ে যে শব্দ তোলে, তা জাপানে প্রাকৃতিক সাউন্ডস্কেপ হিসেবে স্বীকৃত। এ শব্দকে জাপানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সংরক্ষণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে-কারণ এটি শুধু শব্দ নয়, এটি মানসিক প্রশান্তির অংশ।
আকাশ ছুঁয়ে থাকা শত শত মোটা বাঁশ একে অপরের গায়ে হেলে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস বইলে তারা একসঙ্গে দুলে ওঠে, মনে হয় যেনএকটি প্রাকৃতিক সিম্ফনি। জাপানের সংস্কৃতিতে এই বাঁশের শব্দকে বলা হয় ‘শুদ্ধতার ধ্বনি’। ইউনেসকো পর্যন্ত এই শব্দকে জাপানের সংরক্ষিত প্রাকৃতিক শব্দের তালিকায় রেখেছে। নিকিতা ফিসফিস করে বললো-শোনো, মনে হয় না যেন বাঁশেরা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে?
আমি হেসে উত্তর দিলাম-হয়তো আমাদের কথাই বলছে।
নিকিতা বলে, এই ব্যাম্বো ফরেস্ট শুধু প্রকৃতির নয়, ইতিহাসেরও অংশ। হেইয়ান যুগে (৮ম-১২শ শতক) কিয়েটো ছিল জাপানের রাজকীয় রাজধানী। সেই সময় অভিজাত পরিবার, কবি ও জেন সাধকেরা এখানে আসতেন ধ্যান আর নির্জনতার খোঁজে। পাশেই অবস্থিত তেনর্যু-জি মন্দির-একটি জেন বৌদ্ধ মন্দির, যা এই বনভূমির গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বাঁশবনের ভেতরের পথ সমতল ও পরিচ্ছন্ন। নিকিতা বলে ভোরবেলা বা বিকেলের শেষ দিকে এলে পর্যটকের চাপ কম থাকে। হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায়-এটি শুধু ছবি তোলার জায়গা নয়; এটি ধীরে হাঁটার, থেমে দাঁড়ানোর, ভাবনার জায়গা।
জাপানি সংস্কৃতিতে বাঁশ শক্তি ও নমনীয়তার প্রতীক। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁশ সহজে ভেঙে পড়ে না, বরং নুয়ে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। সেই দর্শনই যেন এই বনভূমির প্রতিটি গাছে লেখা। আমরা বাঁশ বনের মধ্য দিয়ে হাজ্ঞটকে থাকি। এক সময় পথ সরু হয়ে আসে। পর্যটকের ভিড় একটু কমে গেলে নিকিতা থেমে দাঁড়ায়। সবুজ আলোয় তার চোখের রঙ বদলে যায়।
তুমি এখানে কতবার এসেছ? আমি জিজ্ঞেস করি। - অনেক, সে বলে, কিন্তু প্রতিবার আলাদা লাগে। জায়গা বদলায় না, কিন্তু মানুষ বদলায়। ফিরতি পথে সূর্য হেলে পড়ে। বাঁশবন পেছনে রেখে আমরা যখন আরাশিয়ামার ছোট রাস্তায় হাঁটছি, নিকিতা হঠাৎ বললো-কিয়েটোর সৌন্দর্য সবসময় চোখে ধরা পড়ে না। কখনো কখনো সেটা নীরবতায় লুকিয়ে থাকে। সাগানো ব্যাম্বো ফরেস্ট সেই নীরব সৌন্দর্যেরই একটি স্থায়ী ঠিকানা।
সাগানো ব্যাম্বো ফরেস্টের সবুজ ছায়া পেছনে রেখে আমরা ধীরে হাঁটতে থাকি আরাশিয়ামার দিকে। দিনের আলো তখন নরম হতে শুরু করেছে। নিকিতা বলে, কিয়েটোর সন্ধ্যা হঠাৎ নামে না-এখানে সন্ধ্যা আসে, থেমে থেমে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিলে আরাশিয়ামা ব্রিজ-তোগেতসুক্যো। এ নামের অর্থ ‘চাঁদ পার হওয়া সেতু’। হেইয়ান যুগে সম্রাট কামেয়ামা নাকি পূর্ণিমার রাতে এই সেতু দেখে বলেছিলেন, চাঁদ যেন সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সেই থেকেই নামটি থেকে গেছে। নিকিতা বলে, বর্তমান তোগেতসুক্যো ব্রিজ আধুনিক কাঠ ও কংক্রিটে নির্মিত হলেও এর ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরোনো। প্রথম সেতুটি তৈরি হয়েছিল নবম শতকে। বহুবার বন্যা ও সময়ের আঘাতে ভেঙেছে, আবার তৈরি হয়েছে, ঠিক কিয়েটোর মতোই, ভেঙে আবার দাঁড়ানো শহর। আমি সেতুর রেলিংয়ে হাত রাখি। নিকিতা পাশে এসে দাঁড়ায়। বলে, এই নদীটা কিয়েটোর মেজাজ জানে। শীতকালে চুপ, বসন্তে কোমল, আর শরতে গম্ভীর। সন্ধ্যা ঘনালে কাতসুরা নদীর রঙ বদলাতে থাকে। নীল থেকে ধূসর, ধূসর থেকে হালকা রুপালি। দূরের পাহাড়ের ছায়া জলে পড়ে একধরনের জলরঙের ছবি তৈরি করে। আমরা দুজন সামনে হাটতে থাকি।
ফুশিমি ইনারীর শিন্তো মন্দির
জাপানের প্রাচীন রাজধানী কিয়েটোর আকাশে তখন শরতের সোনা রোদ। ট্রেনের জানালা দিয়ে দ্রুতবেগে সরে যাচ্ছে জাপানি স্থাপত্যের ছাদগুলো। আমাদের গন্তব্য- ফুশিমি ইনারী-তাইশা। আমার পাশে বসে গাইড নিকিতা, যার চোখের মণি জাপানের সমুদ্রের মতোই গভীর। সে এক মনে দেখছিল ট্রেনের জানালার বাইরে। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী হাসিতে বললো, জানো, ফুশিমি ইনারীর এই লাল তোরণগুলো আসলে মানুষের বিশ্বাসের রঙ। হয়তো আজ সেই রঙে আমাদের দিনটাও রাঙিয়ে দিবে।
আমি হাসলাম।
জেআর ইনারী স্টেশনে নামতেই চোখে পড়ল বিশাল এক লাল ‘তোরি গেট’। ভিড় ঠেলে আমরা যখন মূল মন্দিরের সামনে দাঁড়ালাম, নিকিতা বুঝিয়ে দিল এর মাহাত্ম্য। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই মন্দিরটি মূলত শস্য ও সমৃদ্ধির দেবতা ‘ইনারী’র আবাসস্থল। মন্দিরের যত্রতত্র পাথরের শেয়াল বা ‘কিটসুন’ (Kitsune) মূর্তিগুলো যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে। জাপানি বিশ্বাসে এই শেয়ালরাই দেবতার বার্তাবাহক। নিকিতা তার কিমোনোর আঁচল সামলে নিয়ে বললো-এ শেয়ালগুলোর মুখে যে চাবিটা দেখছ, ওটা হলো শস্যভান্ডারের চাবি। মানুষের ভাগ্য আর সমৃদ্ধি আসলে তাদের নিজের পরিশ্রম আর বিশ্বাসের মধ্যেই লুকানো থাকে। নিকিতা বলে, শিন্তো বিশ্বাসে প্রকৃতি আর দেবতা আলাদা নয়। পাহাড়, গাছ, বাতাস-সবকিছুর মধ্যেই দেবতার উপস্থিতি। তাই ফুশিমি ইনারি শুধু একটি স্থাপনা নয়, পুরো পাহাড়টাই একটি মন্দির। সে আরো বলে, এখানে মানুষ শুধু প্রার্থনা করতে আসে না। নিজের ভয়, আশা, ব্যর্থতা-সবকিছু রেখে যেতে আসে।
মন্দিরের মূল আকর্ষণ ‘সেনবোন তোরি’ বা হাজার তোরণ। পাহাড়ের ওপর দিকে উঠে যাওয়া এই পথটি যেন এক মায়াবী সুড়ঙ্গ। হাজার হাজার উজ্জ্বল কমলা-লাল রঙের তোরণ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। নিকিতার হাত ধরে যখন সেই সুড়ঙ্গে প্রবেশ করলাম, মনে হলো আমরা সময়ের কোনো এক অজানা বাঁশে হারিয়ে গেছি। ভিতরের আলো-ছায়ার খেলা আমাদের দুজনের মুখেই অদ্ভুত এক আভা তৈরি করছিল। নিকিতা থামল। একটি বড় তোরণের গায়ে খোদাই করা জাপানি হরফগুলো ছুঁয়ে দেখে বললো-এ প্রতিটি তোরণ কারো না কারো প্রার্থনা বা কৃতজ্ঞতার প্রতীক।
এ গেটগুলো কোনো রাজা বা সম্রাট বানাননি। এগুলো এসেছে মানুষের কাছ থেকে-ব্যবসায়ী, পরিবার, প্রতিষ্ঠান-যারা সফলতার আশায় বা কৃতজ্ঞতায় একটি করে গেট দান করেছেন। প্রতিটি গেটের পেছনে লেখা আছে দাতার নাম আর সময়কাল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তৈরি হয়েছে এই লাল নদী। পাহাড়ের যত উপরে উঠছিলাম, পর্যটকদের কোলাহল ততই কমে আসছিল। এক সময় আমরা পৌঁছলাম ‘ইওতসুজি’ ইন্টারসেকশনে। সেখান থেকে পুরো কিয়েটো শহরটাকে মনে হচ্ছিল শিল্পীর আঁকা কোনো ছোট ক্যানভাস। সূর্যাস্তের শেষ রশ্মিটা যখন শহরের গায়ে আছড়ে পড়ছে।
সে ফিসফিস করে বললো-জাপানিরা বিশ্বাস করে পাহাড়ের এই চূড়ায় এসে কোনো ইচ্ছা করলে তা কখনো বৃথা যায় না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী চাইলে? সে মৃদু হেসে বললো-সব কথা মুখে বলতে হয় না। কিছু কথা লাল তোরণের নিস্তব্ধতায় মিশে থাকাই সুন্দর। নামার পথে নিকিতা একটি কাঠের ইমা কিনলো। বললো-এটা প্রার্থনার ফলক। এখানে মানুষ নিজের আশা, স্বপ্ন, ভয় লিখে রেখে যায়। নিকিতা কিছুক্ষণ চুপ করে লিখল। আমি জিজ্ঞেস করলাম কী লিখেছো?
ও বললো-তোমাকে না। কিছু কথা না হয় দেবতারাই জানুক। নিচে নামার সময় আমরা স্থানীয় ‘ইনারী সুশি’র স্বাদ নিলাম। মিষ্টি ভাজা তোফুর আবরণে মোড়ানো এই ভাত নাকি দেবতা ইনারীর খুব প্রিয়। বিকেলের আলোয় টোরি গেটগুলো আরো গাঢ় লাল হয়ে উঠেছে। মনে হলো, পাহাড় নিজেই আমাদের বিদায় জানাচ্ছে। ট্রেন ছাড়ল। জানালার বাইরে ফুশিমি ইনারির শেষ লাল দরজাটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আমরা ফিরে এলাম কিয়েটো শহরে। আর ফুশিমি ইনারি রয়ে গেল বিশ্বাস, নীরবতা আর হাজার দরজার স্মৃতিতে।
নিযো ক্যাসেলে একদিন
কিয়োটোর সকালটা আজ ছিল একটু অন্যরকম। কুয়াশাভেজা বাতাসের সঙ্গে মিশে ছিল নাম না জানা কোনো বুনো ফুলের ঘ্রাণ। আজ আমাদের গন্তব্য-ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, নিযো ক্যাসেল। সঙ্গে গাইড নিকিতা, যার হাসিতে জাপানের বসন্ত খেলা করে। ট্রেন থেকে নেমে শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে আমরা এগোই নিযো ক্যাসেলের দিকে। সাবওয়ে থেকে উঠে প্রশস্ত রাস্তা ধরে হাঁটতেই দূরে ভেসে ওঠে উঁচু পাথরের দেয়াল আর খালের জল। নিকিতা বলে-এই পথটাই একসময় সামুরাইদের চলার রাস্তা ছিল।
নিযো ক্যাসেল: ক্ষমতার প্রতীক থেকে বিশ্ব ঐতিহ্য: নিকিতা বলে, ১৬০৩ সালে টোকুগাওয়া শোগুনাতের প্রতিষ্ঠাতা টোকুগাওয়া ইয়েয়াসু নিযো ক্যাসেল নির্মাণ করেন। এটি ছিল শোগুনের কিয়োটো বাসভবন-সম্রাটের শহরে সামরিক ক্ষমতার নিঃশব্দ ঘোষণা। ১৮৬৭ সালে এখানেই শেষ শোগুন টোকুগাওয়া ইয়োশিনোবু ক্ষমতা সম্রাটের হাতে ফিরিয়ে দেন জাপানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। আজ নিযো ক্যাসেল ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-ক্ষমতা, শিল্প আর রাজনীতির এক অনন্য দলিল। নিযো ক্যাসেলের পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু দুইজন মানুষ নই আমাদের সঙ্গে হাঁটছে চারশো বছরের ইতিহাস।
নাইটিংগেল ফ্লোর : মেঝের হৃদস্পন্দন : নিনোমারি প্রাসাদের ভেতরে ঢ়ুকতেই মেঝে কথা বলে উঠলো।
চিঁ-চিঁ-চিঁ-চিঁ-
নিকিতা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে বললো-শুনছো? এটা নাইটিংগেল ফ্লোর। কেউ লুকিয়ে ঢ়ুকলে মেঝেই তাকে ধরিয়ে দিতো। আমি হাঁটি সাবধানে। মনে হলো, মেঝেটা শুধু গুপ্তচর নয়, আমাদের অনুভূতিও টের পাচ্ছে। এই মেঝে কি প্রেমিকদের কথাও বলে দেয়? আমি হাসতে হাসতে বললাম। নিকিতা চোখ নামিয়ে উত্তর দিলো-প্রেম লুকানো যায় না-কাঠও জানে।
নিনোমারি প্রাসাদ : শিল্পে মোড়া রাজনীতি : নিনোমারি প্রাসাদে শোগুন বসে প্রশাসনিক কাজ চালাতেন। সোনালি পাতায় আঁকা বাঘ, পাইন গাছ, আর রাজকীয় পর্দা-সবই ক্ষমতার ভাষা। বাঘের চোখে চোখ রেখে নিকিতা বলে, শিল্প এখানে শুধু সৌন্দর্য নয়, ভয়ের বার্তাও।
হোনমারু প্রাসাদ : নিকিতা বলে, হোনমারু ছিল দুর্গের কেন্দ্র-আগুনে পুড়ে বহুবার পুনর্নির্মিত। আজও তার ভিত্তি আর প্রহরার কাঠামো বলে দেয় প্রতিরক্ষার গল্প। এখানে দাঁড়িয়ে নিকিতা ধীরে বলে-সব ক্ষমতারই একদিন অবসান হয়, কিন্তু স্মৃতি থাকে।
হোনমারু প্রাসাদ ও নয়নাভিরাম বাগান
এরপর আমরা এগোলাম হোনমারু প্রাসাদের (Honmaru Palace) দিকে। যদিও এটি মূল দুর্গের ভেতরের অংশ, কিন্তু এর রাজকীয় ভাব গাম্ভীর্য এখনো অম্লান। এর চারপাশে থাকা বাগানটি যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। নিকিতা জানালো, এ বাগানের নকশা করা হয়েছে এমনভাবে যাতে কোনো ঋতুতেই এর সৌন্দর্য ফিকে না হয়। পুকুরের জলে মাছের খেলা দেখতে দেখতে নিকিতা হঠাৎ করেই বলে উঠলো, জীবনটাও কি এই বাগানের মতো নয়? কখনো পাতা ঝরে যায়, আবার কখনো নতুন কুঁড়ি গজায়।
বিকেলের আলো ফিকে হয়ে এলে আমরা বেরিয়ে আসি ক্যাসেল থেকে। খালের জলে নিযো ক্যাসেলের ছায়া কাঁপে। নিকিতা বলে-আজ তুমি শুধু একটি দুর্গ দেখোনি-একটা যুগ ছুঁয়ে এলে। আমি হাসি। কিয়োটোর পথে হাঁটতে হাঁটতে বুঝি-ভ্রমণ মানে কেবল জায়গা বদল নয়, সময়ের সঙ্গে একটু কথা বলা।