২০ মে ২০২৬, বুধবার, ০৫:২০:৫৪ অপরাহ্ন


গ্রিনকার্ডধারীদের যাচাই-বাছাই ও বহিষ্কার
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০৫-২০২৬
গ্রিনকার্ডধারীদের যাচাই-বাছাই ও বহিষ্কার গ্রিনকার্ড


যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) সম্প্রতি একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করেছে, যার মূল কাজ হলো গ্রিনকার্ডধারীদের পুনরায় যাচাই বা ‘রিভেটিং’ করা এবং প্রয়োজন হলে তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের ব্যবস্থা নেওয়া। এ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে অভিবাসী সমাজে, বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে বসবাসরত স্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে।

অভ্যন্তরীণ নথির তথ্য অনুযায়ী, নতুন এ ইউনিটের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৮৯০টি মামলা পর্যালোচনা করা হয়েছে অথবা এখনো মূল্যায়নের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৫০ জন গ্রিনকার্ডধারীকে দেশ থেকে বহিষ্কারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও মোট পর্যালোচিত মামলার প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে আর কোনো পদক্ষেপ প্রয়োজন নেই বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, তবুও শত শত মানুষ এখনো তদন্তের আওতায় রয়েছেন।

আইনজীবীদের মতে, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির নতুন রূপ। অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পাশাপাশি এখন বৈধ স্থায়ী বাসিন্দাদেরও নতুনভাবে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা ও ভীতি বাড়ছে।

ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস)-এর অধীনে টেকটিক্যাল অপারেশনস ডিভিশন নামে একটি নতুন বিভাগ তৈরি করা হয়েছে। এ বিভাগের মধ্যেই রয়েছে এলপিআর অপারেশনস, ডিন্যাচারালাইজেশন এবং ‘রিফিউজি রিভেটিং ইউনিট। এখানে এলপিআর বলতে বোঝানো হয়েছে ল ফুল পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা।

অভ্যন্তরীণ ই-মেইলে এ ইউনিটকে এলপিআর রিমুভাল অ্যাপারাটাস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪০ জন ইমিগ্রেশন অফিসার গ্রিনকার্ডধারীদের অতীত রেকর্ড, আবেদনপত্র এবং অপরাধসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনার কাজ করছেন। ডিএইচএসের কর্মকর্তারা বলছেন, এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেসব ব্যক্তি মিথ্যা তথ্য দিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে গ্রিনকার্ড পেয়েছেন, তাদের শনাক্ত করা। একই সঙ্গে গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও এ কার্যক্রমের অংশ।

ইউএসসিআইএসের মুখপাত্র জ্যাক কাহলার এক বিবৃতিতে বলেন, আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা। এজন্য বিদেশিদের কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তিকে পুনঃমূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ যৌন নির্যাতন, গার্হস্থ সহিংসতা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ কিংবা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর মতো অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।

তবে সাবেক অভিবাসন কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক মামলা পুনরায় খতিয়ে দেখার পরও খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তিকে বহিষ্কারের উপযুক্ত হিসেবে পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, প্রশাসন হয়তো অত্যন্ত বিস্তৃত পরিসরে তদন্ত চালাচ্ছে, যার বড় অংশ শেষ পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

থার্ড ওয়ে থিংক ট্যাঙ্কের সামাজিক নীতি পরিচালক সারাহ পিয়ার্স বলেন, ইউএসসিআইএসে ইতোমধ্যেই লাখ লাখ আবেদন জমে আছে। সেখানে নতুন করে এই ধরনের বিশাল পরিসরের রিভেটিং কার্যক্রম কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউএসসিআইএসের কাছে বিভিন্ন ধরনের অভিবাসন সুবিধার জন্য জমা থাকা আবেদনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ। গত কয়েক বছরে এই জট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সীমিত জনবল ও সম্পদ এমন একটি কাজে ব্যয় করা হচ্ছে, যার ফল খুব সীমিত। ফলে নাগরিকত্ব, আশ্রয় বা পারিবারিক পুনর্মিলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আবেদন নিষ্পত্তিতে আরো বিলম্ব ঘটতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতেও গ্রিনকার্ডধারীদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে তা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিনির্ভর। সাধারণত কেউ নাগরিকত্বের আবেদন করলে, গ্রিনকার্ড নবায়ন করলে অথবা নতুন কোনো অভিবাসন সুবিধা চাইলে তার অপরাধমূলক রেকর্ড পুনরায় যাচাই করা হতো। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় সরকার নিজ উদ্যোগে বহু পুরোনো কেস আবার খুলে দেখছে। এ কারণে এটিকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমেরিকান ইমিগ্রেশন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা শারভারি দালাল-ধেইনি বলেন, এ মাত্রার রিভেটিং আগে দেখা যায়নি। এটি অভিবাসন ব্যবস্থার মধ্যে নতুন ধরনের কঠোরতা তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের কারণে একজন গ্রিনকার্ডধারী বহিষ্কারের মুখোমুখি হতে পারেন। যেমন: মাদক পাচার, হত্যা, গুরুতর সহিংস অপরাধ, প্রতারণার মাধ্যমে অভিবাসন সুবিধা গ্রহণ, জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী কর্মকাণ্ড। তবে সব অপরাধ একইভাবে বিবেচিত হয় না। উদাহরণস্বরূপ, প্রথমবারের মতো ডিইউআই (মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো) অপরাধ, যদি তাতে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটে, তাহলে সাধারণত তাৎক্ষণিক বহিষ্কারের কারণ হয় না।

আইন অনুযায়ী, গ্রিনকার্ডধারীকে সরাসরি বহিষ্কার করা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাকে ইমিগ্রেশন আদালতে নিজের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বিচারক শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত দেন। নতুন এই উদ্যোগের খবর প্রকাশের পর অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে যারা বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, কর দিচ্ছেন এবং পরিবার গড়ে তুলেছেন, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

অনেকের আশঙ্কা, অতীতের ছোটখাটো ভুল বা বহু পুরোনো মামলাও এখন নতুনভাবে সামনে আনা হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এই ধরনের অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, গ্রিনকার্ডধারীদের এখন আরো সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যেকোনো আইনি সমস্যা, এমনকি ছোটখাটো অপরাধও ভবিষ্যতে বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের পর ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি আরো শক্তিশালী হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, বাইডেন আমলে অভিবাসন যাচাই-বাছাই যথেষ্ট কঠোর ছিল না। ফলে এখন পুরোনো অনেক কেস পুনরায় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে এবং বৈধ অভিবাসীদের মধ্যেও ভয় সৃষ্টি করছে। তাদের মতে, এতে আমেরিকার দীর্ঘদিনের অভিবাসীবান্ধব ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বর্তমানে হাজার হাজার গ্রিনকার্ডধারীর তথ্য পুনর্মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে আরো বহিষ্কারের উদ্যোগ দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আইনি লড়াইও বাড়বে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসন অধিকারকর্মীরা ইতোমধ্যেই এ নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তারা মনে করছেন, বৈধ বাসিন্দাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সব মিলিয়ে, নতুন ‘রিমুভাল অ্যাপারাটাস’ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং বৈধ অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

শেয়ার করুন