২৭ মে ২০২৬, বুধবার, ১০:৫৫:৫৭ অপরাহ্ন


বৈধ অভিবাসনেও কড়াকড়ি
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কঠিন করছে ট্রাম্প প্রশাসন
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৭-০৫-২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কঠিন করছে ট্রাম্প প্রশাসন ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস


যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর পর এবার বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাকেও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের দিকে এগোচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন নীতি, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ভিসা কার্যক্রম স্থগিত এবং গ্রিনকার্ড আবেদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, শুধু সীমান্ত দিয়ে অবৈধ প্রবেশ নয়, বরং আইনি উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসা বা সেখানে দীর্ঘমেয়াদে থাকার পথও সংকুচিত করতে চাইছে প্রশাসন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈধ অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অভিবাসন আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবসায়িক মহলের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি খাত, স্বাস্থ্যসেবা ও শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। 

সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন শিকাগো ও মিনিয়াপোলিসের মতো শহরগুলোতে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চালানো আগ্রাসী অভিযান কিছুটা কমিয়ে আনে। জনমত জরিপে দেখা যায়, অবৈধ অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান নিয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল। বিশেষ করে ফেডারেল অভিযানের সময় সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠার পর প্রশাসনের কৌশলে পরিবর্তনের আভাস দেখা যায়। এরপর প্রশাসন বৈধ অভিবাসনের ওপর আরো কঠোর নজরদারি ও সীমাবদ্ধতা আরোপের দিকে মনোযোগ দেয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর ইমিগ্রেশন রিফর্ম পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য অভিবাসনের সামগ্রিক হার কমিয়ে আনা। 

এ নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে গত শুক্রবার মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ঘোষণা দেয়, গ্রিনকার্ডের আবেদনকারী অধিকাংশ অভিবাসীকে আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। অর্থাৎ যারা বর্তমানে অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার আবেদন করছেন, তাদের আর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে অপেক্ষা করার সুযোগ থাকবে না। এ সিদ্ধান্তের ফলে বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ গ্রিনকার্ডের আবেদন নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় মাস বা বছরেরও বেশি সময় লাগে। ফলে একজন আবেদনকারীকে দীর্ঘ সময় নিজ দেশে অবস্থান করতে হতে পারে, যখন তার স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাবেন। 

গ্রিনকার্ডধারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং পরবর্তী সময়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। এতোদিন অনেক আবেদনকারী অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেই আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু নতুন নীতিতে সেই সুযোগ ব্যাপকভাবে সীমিত করা হচ্ছে। 

অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস ছিল এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বৈধ ভিসাধারীরা যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ না করেই তাদের অস্থায়ী অবস্থানকে স্থায়ী বসবাসে রূপান্তর করতে পারতেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী যদি মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করতেন, অথবা কোনো দক্ষ বিদেশি কর্মী কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে গ্রিনকার্ডের জন্য যোগ্য হতেন, তাহলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারতেন। এই পদ্ধতিকে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ও মানবিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে আসছিলেন। কারণ আবেদনকারীকে পরিবার, চাকরি বা পড়াশোনা ছেড়ে দেশ ছাড়তে হতো না। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাজও তুলনামূলক সহজে সম্পন্ন করা যেত। এ ঘোষণার পরপরই অভিবাসন আইনজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। তারা নতুন নীতির পরিধি এবং এর বাস্তব প্রভাব বোঝার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে ইতোমধ্যে যাদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। 

অনেক আইনজীবী বলছেন, তারা দিনভর উদ্বিগ্ন অভিবাসীদের ফোন ও ই-মেইল পাচ্ছেন। কেউ জানতে চাইছেন, তাকে কি অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে? কেউ আবার জানতে চাইছেন, আবেদন চলাকালে তার চাকরি বা শিক্ষাজীবনের কী হবে?

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে ৩৫টির বেশি দেশের নাগরিকদের ভ্রমণের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৫০ হাজারের বেশি ভিসা দেওয়ার সুযোগ থাকা একটি লটারি প্রোগ্রামও স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া ৭৫টি দেশের নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসী ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিক যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, তাদের অভিবাসন আবেদনও স্থগিত করা হয়েছে। ফলে তাদের জন্য অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সুযোগ আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। 

এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি নীতির ওপর কাজ করছে, যার মাধ্যমে সরকারি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে-এমন ব্যক্তিদের গ্রিনকার্ড পাওয়াও কঠিন করা হবে। অর্থাৎ আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় আনা হবে। 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের নীতি নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে। কারণ অনেক নতুন অভিবাসী প্রথমদিকে আর্থিকভাবে সংগ্রামের মধ্যে থাকেন। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা পরিচালক ডেভিড জে বিয়ার বলেন, তারা বৈধ ও অবৈধ অভিবাসনকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখছে না। বৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান মূলত অবৈধ অভিবাসনবিরোধী নীতিরই সম্প্রসারণ। তার মতে, প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কমিয়ে আনা। 

তবে হোয়াইট হাউস বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো আমেরিকানদের স্বার্থরক্ষা করা এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন বলেন, আমেরিকানদের জন্য ভালো বেতনের চাকরি নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানোই প্রেসিডেন্টের অগ্রাধিকার। জনগণ তাকে এ সাধারণ ও বাস্তবমুখী নীতি বাস্তবায়নের জন্যই নির্বাচিত করেছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, বর্তমান অভিবাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক জালিয়াতি, ভিসার অপব্যবহার এবং আইনগত ফাঁকফোকর রয়েছে। তারা বলছেন, অনেক মানুষ অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে পরে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করেন, যা মূল ভিসা ব্যবস্থার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে বৈধ অভিবাসনের পক্ষে বক্তব্যও দিয়েছেন। ২০১৯ সালের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে তিনি বলেছিলেন, বৈধ অভিবাসীরা আমাদের জাতিকে সমৃদ্ধ করে এবং সমাজকে শক্তিশালী করে। আমি চাই মানুষ বৈধভাবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রে আসুক। 

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ থেকে পাস করা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ডিগ্রির সঙ্গে গ্রিনকার্ড দেওয়ার বিষয়টি তিনি সমর্থন করেন। তবে বাস্তবে তার প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো বৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সমালোচকদের মতে, প্রশাসনের বক্তব্য এবং বাস্তব নীতির মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বরাবরই সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। প্রশাসন অবৈধ অভিবাসীদের গণহারে বহিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কিন্তু এবার বৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি বাড়ানোয় সমালোচনা আরো তীব্র হয়েছে। 

বাইডেন প্রশাসনের সাবেক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কর্মকর্তা আমান্ডা বারান বলেন, অবৈধ অভিবাসনের ওপর জোর দেওয়া আসলে একটি বিভ্রান্তিকর কৌশল ছিল। এখন আমরা দেখছি, তাদের প্রকৃত লক্ষ্য হলো সব ধরনের অভিবাসন কমিয়ে আনা। তিনি বলেন, এ নীতির ফলে শুধু বিদেশিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং মার্কিন অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাও ক্ষতির মুখে পড়বে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষা খাত বহু বছর ধরে বিদেশি মেধা ও দক্ষকর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশের কর্মীই বিদেশি দক্ষ পেশাজীবী। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি এবং গবেষণার ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈধ অভিবাসনের পথ সংকুচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক ও একাডেমিক সংকটে পড়তে পারে। তবে কঠোর অভিবাসননীতির সমর্থকরা বলছেন, বর্তমান অভিবাসন ব্যবস্থায় অনেক দুর্বলতা রয়েছে এবং সেগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। 

সেন্টার ফর ইমিগ্রেশন স্টাডিজের প্রধান মার্ক ক্রিকোরিয়ান বলেন, জনগণ সাধারণভাবে বৈধ অভিবাসনকে সমর্থন করে। কিন্তু ব্যবস্থায় এত ফাঁকফোকর রয়েছে যে মানুষ সেগুলো বন্ধ এবং জালিয়াতি ঠেকানোর উদ্যোগকে সমর্থন করবে। গত সেপ্টেম্বরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও এনওআরসি পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন বৈধ অভিবাসীরা দেশের অর্থনীতির জন্য উপকারী। প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা মনে করেন, তারা মার্কিন কোম্পানিগুলোতে বিশেষ দক্ষতা নিয়ে আসেন। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতিগুলো কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ এসব খাত বহু বছর ধরে বিদেশি শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। এর প্রভাব শুধু বিদেশি অভিবাসীদের জীবনেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, শিক্ষা ও শ্রমবাজারেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। 

শেয়ার করুন