দিলমুন
বাহরাইনের রাজধানী মানামার রোদ সকালবেলাতেই একটু বেশি ঝাঁজালো হয়ে ওঠে। হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে সানগ্লাসটা চোখে চাপাতে চাপাতে ভাবছিল, বাহরাইনে এসে যদি দিলমুনের সমাধিক্ষেত্র না দেখি, তাহলে এ সফর অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এটি বিশ্বের প্রাচীন সমাধি ক্ষেত্র হিসাবে পরিচিত আর ইউনেসকো এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকাভুক্ত করেছে। ট্যুর কোম্পানি বলেছিল, গাইড ঠিক ৯টায় আসবে।
৯টা বাজতে না বাজতেই একটা সাদা ল্যান্ড ক্রুজার এসে থামল পোর্টিকোয়। দরজা খুলে যে নামল, তাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য ভুলেই গেলাম আজকের গন্তব্যের কথা। গাঢ় কাজলটানা চোখ, মাথায় হালকা ক্রিম রঙের শাল, হাতে একটা ছোট্ট ট্যাবলেট, মুখে সহজ একটা হাসি।
আসসালামু আলাইকুম। আমি লায়লা। আজ সারাদিনের জন্য তোমার গাইড। উচ্চারণে আরবির টান, কিন্তু বাংলাটা চমৎকার পরিষ্কার। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাংলা কোথায় শিখলে?’ হাসলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর ছিলাম। বিনিময় কার্যক্রমে। চলো রাস্তায় গল্প হবে। গাড়ি ছাড়লো। মানামার শহরতলি পেরোতে পেরোতে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, আধুনিক কাচের টাওয়ার ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছে, সামনে খুলছে চ্যাপ্টা মরুভূমির বিস্তার। লায়লা বলল, আমরা যাচ্ছি আলি এলাকার দিকে। মানামা থেকে প্রায় ঘণ্টাখানেকের পথ। রাস্তাটা সহজ, কিন্তু যা দেখবে তা সহজ নয়।
মানে? সে একটু থেমে বলল, মানে, চার হাজার বছর পুরোনো একটা শহর মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে। আর আমরা তার ছাদের ওপর দিয়ে হাঁটবো। এ কথাটা আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শিহরণ তুললো। গাড়ি যখন এগোচ্ছিল, তখন পাশে বসা গাইড লায়লার হাসি সেই সকালকে আরো উজ্জ্বল করে তুলেছিল। লায়লা হঠাৎ করেই বললো, সরি প্রথম দেখাতেই তুমি বলে ফেললাম। আজকের দিনটা আমরা কেবল গাইড আর পর্যটক নই, বরং বন্ধু হিসেবে কাটাব। তুমি করে বললে কি খুব সমস্যা হবে? আমি হেসে উত্তর দিলাম, একেবারেই না, লায়লা। বরং এতে ইতিহাসটা তোমার কাছ থেকে আরো সহজ করে শোনা যাবে।
রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে লায়লা বলতে লাগলো। আমি শুনতে লাগলাম। বাদামি রঙের মরুভূমির ওপর দিয়ে গাড়ি ছুটছে, আর তার কণ্ঠস্বর যেন সেই রোদেলা বাতাসে মিশে যাচ্ছে। দিলমুন কী জানো? লায়লা জিজ্ঞেস করলো। একটা প্রাচীন সভ্যতা। শুধু সভ্যতা না, সে সংশোধন করলো, একটু গর্বের সুরে। দিলমুন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালেরও আগে থেকে এখানকার মানুষ মেসোপটেমিয়া আর সিন্ধু উপত্যকার সঙ্গে জাহাজে মাল পাঠাতো। তামা, মুক্তো, কাপড়।
তাহলে এটা শুধু মরুভূমি ছিল না? একদম না। সুমেরীয় লেখায় দিলমুনকে বলা হয়েছে ‘পবিত্র ভূমি’, যেখান থেকে সূর্য ওঠে। কেউ কেউ বলেন এটাই ছিল বাইবেলের ইডেন গার্ডেন। জানালার বাইরে তাকালাম। এ শুষ্ক, মরুময় জমিকে স্বর্গ ভাবা কঠিন। কিন্তু লায়লার কণ্ঠে বিশ্বাসটা এতোটাই পরিষ্কার যে, মনে হলো হয়তো একসময় সত্যিই ছিল। পথের মাঝে লায়লা গাড়ি থামালো একটা ছোট্ট ক্যাফের সামনে। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ঢ়ুকতেই বুঝলাম, এটা স্থানীয়দের আড্ডার জায়গা। মাটির রঙের দেয়াল, পুরোনো বাহরাইনি জেলে নৌকার ছবি ঝোলানো, হালকা উদের সুগন্ধ। এখানে কার্দামম কফি পাবে-লায়লা বললো। বাহরাইনি স্টাইলে। চিনি ছাড়া, এলাচ দিয়ে। একটু তেতো, একটু সুগন্ধি। দুটো ছোট্ট হলুদ কাপ এলো। প্রথম চুমুকেই বুঝলাম, এটা শুধু কফি না, এটা একটা অভিজ্ঞতা। কেমন লাগছে? লায়লা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
অদ্ভুত সুন্দর। তোমার মতোই। কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে গেল হুট করে। একটু থামলাম। লায়লা একটু অবাক হলো, তারপর হাসলো, সেই হাসিতে না রাগ, না-সংকোচ। শুধু একটা উষ্ণতা। চলো সে বললো, মৃতরা অপেক্ষা করছে। এ কথাটাও অদ্ভুত সুন্দর লাগলো। গাড়ি থেকে নামতেই প্রথমে যা চোখে পড়লো, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। দিগন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট টিলা। একটা, দুটো, দশটা না, হাজার হাজার। মাটির রঙের, গোলাকার, শান্ত। যেন কেউ বিশাল মরুভূমির বুকে অসংখ্য নিঃশ্বাস ফেলে রেখে গেছে। এগুলো প্রতিটি একটি করে সমাধি? জিজ্ঞেস করলাম।
হ্যাঁ, লায়লা পাশে এসে দাঁড়ালো। এখানে মোট এগারো হাজারেরও বেশি burial mound আছে। খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ১৭৫০ সালের মধ্যে তৈরি। পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রগুলোর একটি। পায়ের নিচের মাটিটা হঠাৎ আলাদা মনে হলো। এ মাটি শুধু মাটি না, এর নিচে ঘুমিয়ে আছে হাজার হাজার মানুষ, চার হাজার বছর আগে যারা হাসতো, কাঁদতো, ভালোবাসতো। লায়লা বললো, দু’পাশে শুধু মাইলের পর মাইল ধূসর বালু আর ছোট ছোট টিলা। এটিই বিশ্বখ্যাত দিলমুন বিয়াল মাউন্ডস বা দিলমুন সমাধিক্ষেত্র। ২০১৯ সালে ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের মর্যাদা পাওয়া এ জায়গাটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র। গাড়ি থেকে নেমে লায়লার পাশে যখন দাঁড়ালাম, সে আলতো করে হাত উঁচিয়ে চারপাশটা দেখালো। প্রায় ১১ হাজারেরও বেশি মাউন্ড বা সমাধি টিলা ছড়িয়ে আছে এখানে। খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ১৭৫০ অব্দের এ সমাধিগুলো যেন সময়ের এক বিশাল ক্যানভাস। আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা বড় টিলার কাছে গেলাম। এগুলো কি সবার জন্য একরকম ছিল? জিজ্ঞেস করলাম। লায়লা মাথা নাড়াল। ‘না’। দিলমুন সমাজে শ্রেণিবিভাগ ছিল স্পষ্ট। বড় টিলাগুলো ছিল অভিজাত বা শাসক শ্রেণির। ছোট, সাদামাটা টিলাগুলো সাধারণ মানুষের। কবরে পাওয়া গেছে মৃৎপাত্র, তামার অস্ত্র, পুঁতির মালা। ধনীদের সমাধিতে ছিল সোনা, আমদানি করা পণ্য।
‘মৃত্যুর পরেও বৈষম্য?’ সে একটু থামল। মানুষ মৃত্যুকেও তাদের জীবনের মতো করে সাজাতে চেয়েছে। এটা দুঃখজনক, হয়তো। কিন্তু এটাই ইতিহাস। কথাটা মনে গেথে গেল। আর বিশ্বাস? জিজ্ঞেস করলাম। দিলমুনবাসীরা বিশ্বাস করতো পরজীবনে। মৃতদের সঙ্গে খাবার, পানীয়, অস্ত্র দেওয়া হতো, পরের জগতের যাত্রার জন্য। অনেকটা মিসরীয় বিশ্বাসের মতো, কিন্তু আলাদা সংস্কৃতিতে।
একটা টিলার ছায়ায় বসলাম দুজন। হাওয়া দিচ্ছিল মরুভূমির শুষ্ক, কিন্তু আশ্চর্যরকম আরামদায়ক। ‘তুমি প্রতিদিন এখানে আসো?’ জিজ্ঞেস করলাম। ‘প্রায়ই’। কিন্তু প্রতিদিন আলাদা লাগে। ‘কেন?’ লায়লা একটু ভেবে বললো, কারণ প্রতিদিন আলাদা মানুষ আসে। আর প্রতিটা মানুষ এ জায়গাটাকে আলাদাভাবে দেখে। কেউ দেখে ইতিহাস, কেউ দেখে রহস্য, কেউ দেখে শুধু পাথর আর মাটি।
আর তুমি কী দেখো? সে একটু চুপ থেকে বললো, আমি দেখি মানুষ কতটা ছোট আর কতটা বড়, একসঙ্গে। আমি তার দিকে তাকালাম। রোদের আলোয় তার কাজলটানা চোখে একটা গভীরতা। ‘লায়লা’, বললাম, তুমি শুধু গাইড না। সে হাসলো। বললো, আর তুমি শুধু পর্যটক না। আমরা দুজনে একসঙ্গে হেসে উঠলাম। এ মুহূর্তটা মরুভূমির নীরবতায়, হাজার বছরের পুরোনো সমাধির পাশে অদ্ভুত এক উষ্ণতায় ভরা ছিল। বিকালে ফেরার আগে লায়লা নিয়ে গেল আলি বাজারের কাছে একটা ছোট পারিবারিক রেস্তোরাঁয়। কোনো চকচকে সাইনবোর্ড নেই। ভেতরে কাঠের টেবিল, মেঝেতে পাটি, দেয়ালে পুরোনো ক্যালিগ্রাফি।
এখানে কী অর্ডার করবো? জিজ্ঞেস করলাম। আমার ওপর ছেড়ে দাও। লায়লা আরবিতে কিছু বললো। কিছুক্ষণের মধ্যে টেবিলে এলো- মাচবুস, বাহরাইনের জাতীয় খাবার। মসলাদার ভাতের ওপর রান্না করা মাংস, উপরে ভাজা পেঁয়াজ আর কিশমিশ। গন্ধেই পেট ভরে আসার উপক্রম। মুহাম্মার-মিষ্টি ভাত। খেজুরের শিরা দিয়ে রান্না, মাছের সঙ্গে খাওয়া হয়। ফাত্তুশ সালাদ-তাজা সবজি, রুটির টুকরো, লেবুর রস। উম্ম আলি, মিষ্টি ডেজার্ট। রুটি, দুধ, বাদাম, কিশমিশ দিয়ে তৈরি। মিষ্টি কিন্তু ভারী নয়। এটা খাও, লায়লা নিজে হাতে একটা রুটির টুকরো ছিঁড়ে মাচবুসের সঙ্গে দিলো। বাহরাইনে খাওয়া মানে শুধু পেট ভরানো না। এটা আতিথেয়তা।
প্রথম কামড়েই বুঝলাম, এ খাবার শুধু পেট না, আত্মাকেও পুষ্ট করে। খাওয়ার ফাঁকে লায়লা হাসতে হাসতে বললো, দিলমুনের মানুষেরা হয়তো এভাবেই আতিথেয়তা করতো। তুমি কি জানো, সেই যুগে বাহরাইনকে বলা হতো স্বর্গের উদ্যান? আমি পালটা রসিকতা করে বললাম, স্বর্গ কি না জানি না, তবে তোমার সঙ্গে এ সময়টা কাটানোটা স্বর্গের চেয়ে কম কিছু নয়। আমার কথায় লায়লার গাল দুটো আবির রাঙা হয়ে উঠলো। গাড়ি মানামার দিকে ফিরছে। আকাশে সূর্য নামছে কমলা, লাল, বেগুনি মিলিয়ে মরুভূমির ওপর অদ্ভুত এক রঙের খেলা। লায়লা গাড়ি চালাচ্ছে। রেডিওতে আরবি কোনো সুর ভেসে আসছে।
লায়লা, ডাকলাম। হুম?
আজকের দিনটার জন্য ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। এটা আমার কাজ। না, বললাম, কাজ আর যত্নের মধ্যে পার্থক্য আছে। তুমি যত্ন করে দেখালে। সেটা অনেক আলাদা। সে কিছু বললো না। কিন্তু গাড়ির আয়নায় দেখলাম, সে হাসছে। একটু পরে বললো, আবার এসো। তুমি গাইড হলে অবশ্যই। এবার সে হাসলো খোলাখুলি। মানামার আলো দূরে দেখা যাচ্ছে। আধুনিক শহর, কাচের টাওয়ার, কিন্তু মনের ভেতর এখনো সেই হাজার হাজার নীরব টিলা, চার হাজার বছরের ঘুম আর একটা উষ্ণ কণ্ঠস্বর।