দুই ভাইয়ের ক্রিকেট খেলা
বিশ্বজুড়ে বইছে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ ‘বিশ্বকাপ ফুটবল’-এর উন্মাদনা। গত ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং সহ-আয়োজক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠেছে ৩৯ দিনব্যাপী এই ফুটবল মহাযজ্ঞের। রেকর্ড ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে এবারের বর্ধিত কলেবরের বিশ্বকাপকে ঘিরে পুরো বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা যখন বিভিন্ন দলে বিভক্ত, ঠিক তখনই জানা গেল দেশের সরকার প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পছন্দের দলের নাম। তিনি বিশ্বমঞ্চে ঐতিহ্যবাহী ‘থ্রি লায়ন্স’ খ্যাত ইংল্যান্ড ফুটবল দলকে সমর্থন করছেন।
গত ১৬ জুন মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই ইঙ্গিত দেন।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, “বিশ্বকাপ ফুটবল চলছে, এই বিশ্বকাপের জোয়ারে বাংলাদেশও ভাসছে। আপনি ব্যক্তিগতভাবে কোন দেশকে সমর্থন করেন?” এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কোনো দলের নাম মুখে উচ্চারণ না করে এক চিলতে হেসে কূটকৌশলী উত্তর দেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি দীর্ঘদিন একটি দেশে ছিলাম, বুঝতেই পারছেন।”
এরপর প্রশ্নকর্তা সাংবাদিকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘‘আপনি আপনার উত্তর পেয়েছেন তো?” প্রধানমন্ত্রীর এই ইঙ্গিতের পর উপস্থিত সাংবাদিকদের আর বুঝতে বাকি থাকেনি যে, দীর্ঘ প্রবাস জীবনের চাদরে মোড়ানো ইংল্যান্ডই হতে যাচ্ছে তাঁর এবারের বিশ্বকাপের প্রিয় দল।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যাসন্তান জাইমা রহমানকে নিয়ে লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর সেখানে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর, ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি সপরিবারে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। লন্ডনে দীর্ঘ প্রবাস জীবনই মূলত তাঁকে ইংল্যান্ড ফুটবল দলের প্রতি অনুরাগী করে তুলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্রীড়ামোদী পরিবার ও ক্রীড়াঙ্গনে অবদান
তারেক রহমানের এই ফুটবল প্রীতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, বরং তাঁর পুরো পরিবারই ক্রীড়াবান্ধব হিসেবে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী নিজে বাংলাদেশে থাকাকালীন তাঁর ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে সুযোগ পেলে ক্রিকেট খেলতেন। মরহুম আরাফাত রহমান কোকো বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে ক্রিকেটের উন্নয়নে একজন অত্যন্ত দক্ষ ও দূরদর্শী সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের মেয়াদকালে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ক্রিকেটের প্রসারে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর মধ্যে রয়েছে-
ক্রিকেট ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান: তিনি বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বা ক্রিকেট উন্নয়ন কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মেয়াদেই তৃণমূল পর্যায় থেকে তরুণ ক্রিকেটারদের খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
পাইপলাইন ও ঘরোয়া ক্রিকেট শক্তিশালীকরণ: অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৭ এবং অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট টুর্নামেন্টগুলোকে নিয়মিত ও শক্তিশালী করার পেছনে বিকেএসপির গুরুত্ব বাড়িয়ে সেখানে ক্রিকেট বোদ্ধাদের পরামর্শ নিয়ে ভবিষ্যতের ক্রিকেটার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। আজকের বাংলাদেশের ক্রিকেটের যে মজবুত পাইপলাইন, তার ভিত্তি তৈরিতে তিনি কাজ করেছিলেন।
আধুনিক সুযোগ-সুবিধা: ক্রিকেটকে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে এবং খেলোয়াড়দের জন্য উন্নত কোচিং ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি ক্রিকেটের ব্যাপ্তি বাড়াতে। সে সময় অর্থের অভাবে ক্রিকেটাররা দামী ক্রিকেট সরঞ্জাম তথা ও ম্যাচ প্রাকটিসের জন্য দামী ক্রিকেট বলও ব্যবহার সীমিত ছিল। কোকো অস্ট্রেলিয়া, পরবর্তিতে অন্যান্য উন্নত দেশ থেকে সে সব সরঞ্জাম ক্রয় ও বল নিয়ে এসে ক্রিকেটারদের খেলার মান বাড়াতে ভুমিকা রাখেন।
রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না হলেও একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে তিনি পর্দার আড়ালে থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছিলেন। তারেক রহমানও তাঁর রাজনৈতিক ব্যস্ততার বাইরে অবসর সময়ে ছোট ভাইয়ের ক্রিকেটীয় কার্যক্রমের খোঁজখবর রাখতেন এবং তাঁকে উৎসাহিত করতেন বলে জানা যায়।
পারিবারিক এই ক্রীড়ামোদ ছড়িয়ে পড়েছে পরবর্তী প্রজন্মেও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান লন্ডনে থাকাকালীন বিখ্যাত ইংলিশ ক্লাব ‘চেলসি’-এর স্কুল ফুটবল দলের একজন নিয়মিত সদস্য ছিলেন। ফলে পরিবারের অভ্যন্তরে ফুটবলের আবহ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া
মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও খেলাধুলার প্রতি বেশ আগ্রহী ছিলেন। যে কোনো পর্যায়ে বাংলাদেশ দলের সফলতায় তিনি দলের খেলোয়াড়দের মনবল যোগাতে উৎসাহ দিতেন, অভিনন্দন জানাতেন। তার মন্ত্রী পরিষদে ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিকে দ্বায়িত্ব দেন। এরমধ্যে মরহুম বীরমুক্তি যোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে ব্রার্দাস ইউনিয়ন ক্লাবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বলা হয় ব্রার্দাস ইউনিয়নের প্রাণপুরুষ সাদেক হোসেন খোকা। এ সংগঠককে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া। এরপর ফজলুর রহমান পটলকেও ওই দায়িত্বে তিনি এনেছিলেন।
এছাড়াও খালেদা জিয়া এক সময়ের দুর্দান্ত ফুটবল খেলোয়াড় বর্তমানে স্পিকার মেজর হাফিজ (অবঃ) কে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
তারেক রহমানের দূরদর্শীতা
অতীতে বাংলাদেশে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে অ-খেলোয়াড় বা অপেশাদার রাজনীতিকদের আধিপত্য বেশি দেখা গেছে। স্বাধীনতার পর মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের মতো কিংবদন্তি ফুটবলারের পর আমিনুল হকের মতো একজন আধুনিক যুগের সাবেক ফুটবল অধিনায়ককে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়াটা ফুটবল অঙ্গনের জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক। একই সঙ্গে তার আমলে একজন দক্ষ ক্রিকেটার তামিম ইকবালও বিসিবি’র সভাপতি, আরেক স্বনামধন্য ফুটবল সংগঠক তাবিথ আউয়াল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি হয়েছেন। যা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছিলেন একজন সভাপতি (নাজমুল হাসান পাপন) যার ক্রিকেট খেলার কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল না।