২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ৩৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এর আগে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্মঞ্চায়নের লক্ষ্যে ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী মাসব্যাপী ‘জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
জামায়াত ইসলামী
ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে— ২ থেকে ৯ জুলাই রাজধানীতে জুলাইয়ের শহীদ, আহত ও পঙ্গু পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময়, স্মৃতিবিজড়িত স্থানে স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া; ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের উদ্যোগে আলোচনা সভা; ১৮ থেকে ৩১ জুলাই সারাদেশে শহীদ ও আহত পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময়, স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া; ১ আগস্ট মহানগরী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গণমিছিল; ২ থেকে ৪ আগস্ট শ্রমিক সংগঠনের কর্মসূচি এবং ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে রাজধানীসহ সারাদেশে সমাবেশ ও মিছিল। এছাড়া মহিলা বিভাগ, ছাত্র সংগঠন ও জুলাই যোদ্ধাদের বিভিন্ন ফোরামের উদ্যোগে পৃথক কর্মসূচিও পালন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, কয়েকটি সংবাদমাধ্যম একটি রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রের মতো আচরণ করছে। তিনি বলেন, যদি কোনও গণমাধ্যম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, তাহলে সেটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করা উচিত। একই সঙ্গে করপোরেট গণমাধ্যমগুলোর প্রতি সত্য সংবাদ প্রকাশ এবং হলুদ সাংবাদিকতা পরিহারের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে কিছু গণমাধ্যম ফ্যাসিবাদের প্রতিনিধিত্ব করেছিল, আর এখন তারা বিএনপি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছে।
বিএনপির সমালোচনা করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, যারা একসময় অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, বিএনপিই তাদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য বানিয়েছে। তাই স্বাধীনতার প্রশ্নে অন্যদের দায়ী করার আগে বিএনপিরই জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে জুলাই সনদ কার্যকর করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার গণহত্যার বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিএনপি পুরোনো ফ্যাসিবাদীদের ভাষায় কথা বলছে। তিনি দাবি করেন, জামায়াত কোনও অপরাধ করেনি, তাই তাদের ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ‘চব্বিশের ৩৬ জুলাই’-এর স্মরণে ৩৬ দিনের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন- এই তিন অঙ্গীকারের মধ্যে নির্বাচন হলেও বিচার ও সংস্কার হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের প্রতি গণহত্যার বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়েছে। ভবিষ্যতে আর কোনও অপশক্তিকে দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া হবে না।
ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, জুলাই শুধু একটি মাস নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক। জুলাইয়ের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ গঠন এবং জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনও আপস করা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এনসিপি
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্মঞ্চায়নের লক্ষ্যে আগামী ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী মাসব্যাপী ‘জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
সোমবার (২৯ জুন) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের প্রতিটি দিনই ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ আন্দোলনে শিক্ষার্থী, ছাত্র-জনতা, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, ধনী-গরিবসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন। হাসনাত বলেন, ‘নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে আমরা ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে ধাবিত হয়েছিলাম। সেই পুরো জুলাইকে পুনর্মঞ্চায়ন ও পুনরুজ্জীবিত করতে প্রতিটি দিনের জন্য বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, ১ জুলাই রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে কবর জিয়ারত, ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর সংহতি সভা এবং ‘জুলাই থেকে জনপদ’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিচার ও গণভোটের দাবিতে উপজেলা পর্যায়ে মাসব্যাপী পদযাত্রা শুরু হবে।
২ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে গ্রাফিতি, দেয়াল লিখন, ব্যানার ও ফেস্টুনের মাধ্যমে ‘জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচি চলবে। ৫ থেকে ৯ জুলাই আয়োজন করা হবে ‘জুলাই স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট’।
এ ছাড়া বিভিন্ন দিনে আলোচনা সভা, নারী সমাবেশ, কৃষক কর্মসূচি, শহীদদের কবর জিয়ারত, দেশব্যাপী দোয়া ও মোনাজাত, কফিন মিছিল, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্যান্স ডে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিকিৎসকদের কর্মসূচি, আহতদের নিয়ে স্মৃতিচারণ, যুব কনভেনশন, শ্রমিক সমাবেশ, চিত্র প্রদর্শনী, শিক্ষক ও লেখক-বুদ্ধিজীবীদের আলোচনা সভাসহ নানা আয়োজন থাকবে।
১ আগস্ট ‘দেশপ্রেমের ইউনিফর্ম’ এবং ‘সংবাদে গণঅভ্যুত্থান’ শীর্ষক কর্মসূচি আয়োজন করা হবে। এদিন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা সাংবাদিকদেরও স্মরণ করা হবে।
২ আগস্ট ‘জুলাইয়ের গৃহযাত্রা’, ‘গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ’ এবং ‘জুলাই স্মরণী প্রকাশ’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। ৩ আগস্ট ‘জনতার এক দফা’, ৪ আগস্ট আহত ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় এবং ৫ আগস্ট ‘বিজয়ের উল্লাস’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মাসব্যাপী আয়োজন শেষ হবে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণে পুরো মাসজুড়ে ‘প্রবাসে জুলাই’ কর্মসূচিও চলবে। তিনি বলেন, ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিনই বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। এসব বাস্তবায়নের জন্য ‘জুলাই পুনর্জাগরণ বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এর আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি এবং সদস্যসচিব হিসেবে থাকবেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ। প্রতিটি কর্মসূচির স্থান ও সময় সংশ্লিষ্ট উইং পৃথকভাবে ঘোষণা করবে।
এ ছাড়া কমিটিতে দলের বিভিন্ন পর্যায় ও অঙ্গসংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকেও একাধিক নেতা এতে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান হাসনাত আব্দুল্লাহ।