০১ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ০৫:৪৬:০২ অপরাহ্ন


রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স আসার পেছনে হুন্ডি বন্ধে বড় ভূমিকা
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০১-০৭-২০২৬
রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স আসার পেছনে হুন্ডি বন্ধে বড় ভূমিকা প্রতীকী ছবি


চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ‘রেমিট্যান্স’ বা প্রবাসী আয়ে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৮ জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশে মোট ৩৫ দশমিক ৩৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

গত পাঁচ বছরের (২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬) রেমিট্যান্স প্রবাহের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মহামারি-উত্তর মন্দা, হুন্ডি চ্যানেলের দাপট এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক নানামুখী চ্যালেঞ্জ পার করে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স খাত একটি শক্তিশালী এবং টেকসই অবস্থানে ফিরে এসেছে।

চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ব্যাপক বৃদ্ধির নেপথ্যে 

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সের এ ‘কোয়ান্টাম লিপ’ বা বিশাল লাফ দেওয়ার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি কাজ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং হুন্ডি মার্কেটের সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলের রেটের ব্যবধান প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা। ফলে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলকে বেছে নিয়েছেন।

এছাড়াও প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স অ্যাপস এবং তাৎক্ষণিক বিকাশ/নগদ বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ প্রেরণের সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া। ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিজস্ব উৎস থেকে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বা প্রণোদনা দেওয়ার নমনীয়তা এ সেক্টরে বৈধ প্রক্রিয়ায় অর্থ প্রেরণে উৎসহ জুগিয়েছে।

তবে এর মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারের সম্প্রসারণ। গত দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিক প্রেরণের হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির কারণ। এর ফলে গত কয়েক বছর ধরে কমতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ অবস্থানে ফিরে এসেছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি পূরণে এটি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে এবং টাকার মানকে ডলারের বিপরীতে অবমূল্যায়ন থেকে রক্ষা করছে।

এ বিশাল অর্থপ্রবাহ সরাসরি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরবরাহ বাড়িয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও মানুষের অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় সচল রেখেছে। যদিও ৩৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এ অর্জন অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, তবুও এ

 ধারা বজায় রাখতে দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

১. দক্ষ মানবসম্পদ রফতানি: শুধু সাধারণ শ্রমিক না পাঠিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, নার্সিং ও প্রকৌশল খাতের মতো উচ্চ আয়ের পেশাজীবী তৈরি ও বিদেশে পাঠানো।

২. হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোরতা: প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়িয়ে অবৈধ অর্থপাচার ও হুন্ডি চক্র পুরোপুরি নির্মূল করা।

৩. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ যাতে কেবল ভোগব্যয় না হয়ে বন্ড, পুঁজিবাজার বা উৎপাদনশীল শিল্পে বিনিয়োগ হয়, সেজন্য বিশেষ কর ছাড় ও নীতি সহায়তা দেওয়া।

সবশেষ

বিগত পাঁচ বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রেমিট্যান্সের চিত্র সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক। সঠিক অর্থনৈতিক নীতি এবং রেট সমন্বয়ের মাধ্যমে যে হুন্ডি প্রতিরোধ করে বৈধ চ্যানেলে জোয়ার আনা সম্ভব-চলতি বছরের পরিসংখ্যান তারই অকাট্য প্রমাণ।

শেয়ার করুন