বাহলা ফোর্ট
সকালটা ছিল মাস্কাটের নীল জলরাশির মতো স্বচ্ছ। আমাদের যাত্রা শুরু হলো ওমানের রাজধানী মাস্কাট থেকে। গন্তব্য- ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, ওমানের ইতিহাসের প্রাচীন প্রহরী বাহলা ফোর্ট। মাস্কাট থেকে বাহলার দূরত্ব প্রায় দুই ঘণ্টার। মসৃণ হাইওয়ে ধরে যখন আমাদের গাড়ি ছুটছে, দুপাশে তখন রুক্ষ কিন্তু রাজকীয় হাজর পাহাড়ের সারি। আমার পাশে বসে গাড়ি চালাচ্ছে ট্যুর গাইড নূর। তার নামের মতোই সে আলোকিত, চোখে মরুভূমির গভীরতা, আর কণ্ঠে এক অদ্ভুত মায়া।
গাড়ি যখন মাস্কাট ছেড়ে সামনের দিকে এগোতে লাগলো, চারপাশের দৃশ্য পাল্টাতে লাগলো দ্রুত। পাথুরে পাহাড়, শুকনো উপত্যকা, আর দূরে কোথাও কোথাও খেজুর গাছের সবুজ রেখা। নূর জানালার বাইরে তাকিয়ে হালকা হাসলো। এ মরুভূমিই কিন্তু একসময় সভ্যতার জননী ছিল সে বললো। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম-তোমার মতোই রহস্যময়। সে হেসে চোখ নামিয়ে নিলো। নূর এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে তার বাদামি চুলগুলো সামলাচ্ছিল। আমি তাকাতেই ও মিষ্টি করে হেসে বললো-কী দেখছো? পাহাড় না আমাকে?
আমি বললাম-পাহাড় তো রোজ থাকে কিন্তু এ কড়া রোদে তোমার চোখের শীতলতা ওমানের মরুদ্যানের মতো। ও একটু লজ্জিত হয়ে বললো-বেশি বকবক না করে দুপুরের রোদে পোড়ার জন্য তৈরি হও। প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছালাম বাহলা শহরে-ওমানের প্রাচীনতম বসতিগুলোর একটি। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল বিশাল কাদামাটির প্রাচীর ঘেরা সে দুর্গ-বাহলা ফোর্ট। সূর্যের আলোয় সেটি যেন সোনালি রঙে ঝলমল করছে। বাহলা ফোর্টের বিশালাকার মাটির দেওয়ালগুলো যখন চোখের সামনে ভেসে উঠলে, মনে হলো যেন মরুভূমির বুক চিড়ে এক দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে। স্থাপত্যশৈলী এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো বাহলা ফোর্টকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।
নূর জানালো, বাহলা ফোর্ট ওমানের প্রাচীনতম দুর্গগুলোর একটি। এটি মূলত বনু নেভান জাতির দ্বারা ১২ থেকে ১৫ শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। দুর্গের বিশালাকার মাটির দেওয়ালগুলো যখন চোখের সামনে ভেসে উঠলো, মনে হলো যেন মরুভূমির বুক চিরে এক দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে। নূর আমাকে নিয়ে গেল ‘কাসবাহ’ বা দুর্গের মূল অংশে। ওখানকার খাড়া সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ও আমার হাতটা শক্ত করে ধরলো। বললো-জানো, এ ফোর্টটি পোড়া মাটি আর খড় দিয়ে তৈরি। আর একে ঘিরে থাকা সাত মাইল লম্বা দেওয়াল নাকি এক রাতে জিনেরা তৈরি করেছিল!
আমি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললাম-জিনদের জাদুর কথা জানি না, তবে তোমার গলার স্বরে যে জাদু আছে, তাতে আমি বন্দি হতে রাজি। দুর্গের ভেতরে ঢুকতেই এক ধরনের নীরবতা আমাকে ঘিরে ধরলো। মাটির তৈরি দেওয়াল, সরু পথ, আর উঁচু টাওয়ার-সবকিছুতেই এক অদ্ভুত প্রাচীন গাম্ভীর্য। এখানে দাঁড়িয়ে অনেক রাজা-বাদশাহ তাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করেছেন-নূর ফিসফিস করে বললো। আমি বললাম, আজ আমি আমার ভবিষ্যৎ ঠিক করছি। সে অবাক হয়ে তাকালো-কীভাবে? আমি মৃদু হেসে বললাম-এ যাত্রাটা যেন শেষ না হয়, আর তুমি যেন সবসময় পাশে থাকো।
নূরের চোখে তখন এক অচেনা আলো। হয়তো ইতিহাসের মতোই কিছু অনুভূতি কথার বাইরে থেকেই যায়। দুর্গের ইতিহাস আর জাদুকরী গল্পে কখন যে দুপুর গড়িয়েছে টেরই পাইনি। ক্লান্ত শরীরে আমরা স্থানীয় একটি ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলাম। আমাদের পাতে এল ওমানের বিখ্যাত ‘শুয়া’। এটি মূলত মসলা মাখানো মাংস, যা মাটির নিচের তন্দুরে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা হয়। নূর নিজের হাতে মাংসের একটা টুকরো ছিঁড়ে আমার পাতে দিয়ে বললো-ক্লান্ত পথিক, এ স্বাদ না নিলে ওমান ভ্রমণ অসম্পূর্ণ।
খাওয়ার পর আমরা গাড়ি নিয়ে একটু দূরে এক পাহাড়ি ঢালের ক্যাফেতে গিয়ে বসলাম। আমাদের সামনে এল ওমানের ঐতিহ্যবাহী ‘কাহওয়া’-লাচ আর জাফরান মেশানো কড়া কফি, সঙ্গে সোনালি রঙের রসালো খেজুর। ছোট্ট পেয়ালায় কফি ঢালতে ঢালতে নূর বললো-কফি মানে শুধু পানীয় নয়, এটা গল্প বলার সুযোগ। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম-তোমার এ গল্পের শেষ কোথায়? ও কফির কাপে চুমুক দিয়ে দূরে পাহাড়ের গায়ে অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে বললো-সব গল্পের শেষ থাকতে নেই, কিছু গল্প ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখা ভালো।
ফিরতি পথে সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আকাশ হয়ে উঠেছে কমলা লাল। গাড়ির জানালায় সেই আলো এসে পড়ছে নূরের মুখে। আমি তার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকলাম। ‘কি দেখছো?’ সে জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম-একটা গল্প, যা হয়তো কোনোদিন শেষ হবে না। নূর কিছু বললো না। শুধু হালকা হাসলো।
মাস্কাটে ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল আমি শুধু একটি ঐতিহাসিক দুর্গ দেখে ফিরছি না, বরং সঙ্গে করে নিয়ে আসছি কিছু অমলিন মুহূর্ত, কিছু নীরব অনুভূতি, আর এক টুকরো মরুভূমির ভালোবাসা। রাতের আলোয় মাস্কাট শহরটা তখন ঝিকমিক করছে। নূর বিদায় নেওয়ার সময় অস্ফুট স্বরে বললো-আবার এসো, তবে এবার ট্যুর গাইড হিসেবে নয়, শুধু আমার জন্য।